কেউ খুঁজতে আসে না। কোনও স্বজন নেই, নেই দাবিদার। মর্গের ফ্রিজে দিনের পর দিন অপেক্ষার পর একসময় তারা হয়ে যায় ‘বেওয়ারিশ’। রাজধানীতে এমন পরিচয়হীন মরদেহের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীতে অজ্ঞাতনামা এক কিশোরীর খণ্ডিত মরদেহ এবং জাতীয় ঈদগাহ ও হাইকোর্ট মাজার এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর পেছনে যেমন রয়েছে দুর্ঘটনা ও ভাসমান মানুষের মৃত্যু, তেমনি রয়েছে হত্যাকাণ্ডের শিকার বহু পরিচয়হীন মানুষের নিঃশব্দ পরিণতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারত্বের ঘাটতি, সমন্বিত তথ্যভান্ডারের অভাব, অপরাধপ্রবণ এলাকায় প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, সোর্স নেটওয়ার্কের দুর্বলতা, আধুনিক ডিএনএ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অভাবে অনেক মরদেহ স্বজনদের কাছে ফিরতে পারছে না।
বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা বাড়ছে
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ২ হাজার ১০৪টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
বছরভিত্তিক হিসাবে, ২০২৩ সালে ৪৯০টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি, ২০২৫ সালে ৬৪৪টি এবং ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানে গত কয়েক বছরে বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফন সেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ সোমবার সকালে ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে যথাযথ কাগজপত্রসহ মরদেহ গ্রহণ করি এবং কবরস্থানে পৌঁছে দিই।’ এসব মরদেহের বেশিরভাগই জুরাইন ও রায়েরবাজার বধ্যভূমি কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় জুরাইন কবরস্থান এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ-সংলগ্ন কবরস্থানে বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হচ্ছে। লাশ দাফনের জায়গা নিয়ে একসময় জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এর ফলে অনেক বেওয়ারিশ লাশ দীর্ঘদিন মর্গে পড়ে ছিল।
এ বিষয়ে কামরুল আহমেদ বলেন, জায়গা-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন লাশ দাফনে সমস্যা হয়েছে। এখন সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে।
এক দিনে তিন মরদেহ উদ্ধার
১২ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে তিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রাজধানীর আদাবরের হাক্কারপাড় খালে ভেসে আসা একটি স্কুলব্যাগ থেকে খণ্ডিত অবস্থায় এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিনে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও হাইকোর্ট মাজারের কাছে ফুটপাত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের একজনের বয়স আনুমানিক ৬৫ এবং অন্যজনের ৪৫ বছর।
আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, শনিবার বিকেল ৫টার দিকে ওই খাল থেকে একটি স্কুলব্যাগে কিশোরীর মরদেহের চারটি খণ্ড উদ্ধার করা হয়। এর প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর তার দুটি পা উদ্ধার করা হয়। নিহত কিশোরীর বয়স ১৪ থেকে ১৬ বছর। এখনও তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
ওসি বলেন, নিহত কিশোরীর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সার্ভারে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়। তবে তার এনআইডি না থাকায় আঙুলের ছাপের সঙ্গে মেলানোর মতো কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। খণ্ডিত মরদেহটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আদাবর থানায় হত্যা মামলা করেছে।
অপরদিকে একই দিনে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও হাইকোর্ট মাজারের কাছে ফুটপাত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান সোমবার বিকালে ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, পথচারীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাইকোর্ট মাজার ও জাতীয় ঈদগাহের কাছে ফুটপাত থেকে দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে একজনের পরিচয় জানা গেছে। তার নাম জুয়েল, বাড়ি লালবাগ। অন্যজনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।
কী বলছে পুলিশ
পুলিশ জানায়, অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে তা স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে মর্গে রাখা হয়। এসব ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় পুলিশ।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. আকতার হোসেন সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেওয়ারিশ লাশ বেড়েছে, এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। আপনারা যে তথ্য পেয়েছেন, সেটা আপনাদের বিশ্লেষণ। তবে বেড়েছে কিনা, সেটি আমাদেরও জানা প্রয়োজন।’
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটি দেশে বেওয়ারিশ লাশ তখনই বাড়বে, যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই বলে ধরে নিতে হবে। অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা ও পেশাদারত্বের ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে। তারা বুঝতে পেরেছে, অপরাধ করে পার পাওয়া যায়। ফলে বেওয়ারিশ লাশ বাড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘অপরাধীরা হত্যার পর লাশ টুকরো করছে, ব্যাগে ভরে পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। এতে মরদেহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবে হত্যা ছাড়াও বিভিন্ন কারণে বেওয়ারিশ লাশ বাড়ছে। এসব নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কোনও দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারেনি।’
এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘প্রথমত, পুলিশের যে ঘাটতি রয়েছে, তা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকার করার মানসিকতা থাকতে হবে। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং পুলিশের সোর্স নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে হবে। তাহলে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা সহজ হবে। পাশাপাশি তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ কমবে।’