জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে দুজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তারা হলেন মো. খোকন (৩৫) ও মো. রাজিব মাতুব্বর (৩৬)। তারা ওই ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেছে ডিবি।
তবে এ ঘটনায় গত ৩০ আগস্ট র্যাব-২ এর হাতে তিন জন গ্রেফতার হয়েছিলেন। ডিবির তদন্তে তাদের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। র্যাবের হাতে গ্রেফতার রাকিব, পনি ও সেড্রিক রিমান্ড শেষে কারাগারে রয়েছেন।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে নতুন দুজনকে গ্রেফতারের তথ্য দেন ডিএমপির (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম।
গত ২৯ আগস্ট শেরেবাংলা নগর থানাধীন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পূর্ব প্রান্তে জাতীয় সংসদ ভবনের ১২ নম্বর গেটের পর খেজুর বাগানের মুখে রনজিলা ছিনতাইয়ের শিকার হন। ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় রনজিলার স্বামী মোহাম্মদ আবদুল মতিন শেরে বাংলা নগর থানায় অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
যেভাবে শনাক্ত নতুন দুই আসামি
ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ছিনতাইকারীদের শনাক্তের চেষ্টা শুরু হয়। পরে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) মিরপুরের মনিপুর পশ্চিমপাড়া থেকে ওই দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার সময় মোটরসাইকেলের পেছনে বসে রনজিলার ব্যাগে হ্যাঁচকা টান দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
খোকনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরপুরের বড়বাগ এলাকা থেকে রনজিলার ছিনতাই হওয়া ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ওই ব্যাগে তার ব্যবহৃত পোশাক, টিকিটের অংশ, চশমার খাপ ও কিছু ওষুধ ছিল। পরে মিরপুর-১ এলাকা থেকে রনজিলার মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়।
এরপর ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে রাজীব মাতব্বরকে বিরুলিয়া থেকে গ্রেফতার করা হয়। ঘটনার সময় রাজীবই মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছে ডিবি।
রাজীবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। তার কাছ থেকে ৬২২ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবি জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, দস্যুতা, চুরি, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনের মামলাসহ আটটি মামলা রয়েছে। আর খোকনের বিরুদ্ধে মাদকের তিনটি মামলা রয়েছে।
র্যাবের গ্রেফতারকৃতদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি
শফিকুল ইসলাম বলেন, র্যাবের হাতে গ্রেফতার তিন জনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরবর্তী তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, র্যাব যে ব্যক্তিদের গ্রেফতার করেছিল, তাদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা ছিল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। পরে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, তারা রনজিলা হত্যার ঘটনায় জড়িত নন। সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে খোকন ও রাজীবকে শনাক্ত করা হয়েছে।
ডিবি বলছে, সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার সময় মোটরসাইকেলে দুজনকে দেখা গেছে। রাজীব মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন এবং খোকন পেছনে ছিলেন।
ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি রাজীবের নিজের। এটি ভাড়া করা হয়নি। মোটরসাইকেলের পাশাপাশি খোকনের পরনের শার্ট, হাতে থাকা ঘড়ি ও মাথার ক্যাপও উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ডিবি।
র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেল নিয়ে অমিল
রনজিলা হত্যার তদন্তে র্যাব ও ডিবির বক্তব্যে মোটরসাইকেল নিয়েও পার্থক্য উঠে এসেছে। ডিবি প্রধান শফিকুল বলেন, র্যাব তখন ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল। তবে সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে সেটি মিলিয়ে দেখার পর পার্থক্য পাওয়া যায়। ফুটেজে যে মোটরসাইকেল দেখা গেছে, তার রং এবং র্যাব যে মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছিল, তার রং ভিন্ন।
র্যাবের হাতে আগে গ্রেফতার ব্যক্তিদের সঙ্গে খোকন ও রাজীবের কোনও যোগাযোগ আছে কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, তদন্তে তাদের মধ্যে কোনও যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, নতুন করে গ্রেফতার হওয়া দুজন পশ্চিম মনিপুর এলাকায় থাকেন। আর র্যাবের হাতে গ্রেফতার ব্যক্তিরা তেজতুরীপাড়া এলাকার। এরা দুটি ভিন্ন গ্রুপ।
আগে গ্রেফতার ব্যক্তিদের এই মামলায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া না গেলে তাদের মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে উল্লেখ করে শফিকুল ইসলাম বলেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনও মামলা থাকলে সেসব মামলায় আইনি প্রক্রিয়া চলবে।
যেভাবে শনাক্ত অভিযুক্ত খোকন
ডিবি বলছে, রনজিলার স্বামী ঘটনার সময় ছিনতাইকারীকে এক ঝলক দেখেছিলেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তার মনে থাকা সেই চেহারার বর্ণনা তদন্তকারীদের জানান। পরে পেছনে থাকা খোকনকে শনাক্ত করা হয়।
শফিকুল ইসলাম বলেন, রনজিলার ব্যাগ, মোবাইল ফোন, পরনের পোশাক, ওষুধ ও টিকিটের অংশসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত ও ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে আপনারাও বিষয়টি বুঝতে পারবেন।
এদিকে র্যাবের হাতে গ্রেফতার বাইকের মালিক হিসেবে পরিচিত রাকিব হোসেন ওরফে রাকিব বেপারির স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম বলেন, এখন তো প্রমাণ হয়েই গেল প্রকৃত আসামি কে। অপরাধ না করেও যারা গ্রেফতার হয়ে জেলে গেল, রিমান্ড খাটলো, এটার কী হবে? এই হেনস্তার প্রতিকার কী?
একই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোশাররফ হোসেন পনি গাজী ওরফে প্যারা পনির বড় ভাই রনি। তিনি বলেন, ঘটনায় জড়িত না হয়েও আমার ভাইসহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হলো। আমাদের হেনস্তা করলো র্যাব। আমরা র্যাবের সেই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবো।
এদিকে রনজিলার ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির মালিক রাজীব উল্লেখ করে তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার পর দিন-রাত অভিযান চালিয়ে খোকন ও রাজীবকে শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব জানিয়েছেন, মোটরসাইকেলটি তার নিজের এবং বিভিন্ন সময়ে ছিনতাই করে পাওয়া টাকা দিয়ে তিনি সেটি কিনেছেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের সাধারণ অপরাধীর কাছে ২৫০ সিসির বাইক, এটা ভাবা যায় না। তারা যদি এই বাইক দিয়ে ছিনতাই করে টান দিয়ে পালায়, তাদের তাৎক্ষণিক ধরটা দূরহ ব্যাপার।