কম্বোডিয়াভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশি তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন— কম্বোডিয়া ফেরত চক্রের অন্যতম মূল হোতা মো. মেহেদী হাসান ওরফে সোহাগ (২৭), তার সহযোগী আবুল হাসান ওরফে নাঈম (২৪) এবং সুমাইয়া খাতুন ওরফে শান্তা (২৪)। খুলনা জেলার বিভিন্ন থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
সংস্থাটি বলছে, বিমানের টিকিট কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রির ভুয়া প্রলোভন ও বিনিয়োগের নামে রাজধানীর এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৬ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তাদের গ্রেফতার করা হয়।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ঢাকা মেট্রো (উত্তর) পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।
তিনি বলেন, “মামলার বাদী এন সায়েম উদ্দিন আহমেদ (৬২) নামের এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে টেলিগ্রামের মাধ্যমে চক্রটির পরিচয় হয়। তারা নিজেদের এয়ারপোর্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন এবং বিমানের আন্ডাররেটেড টিকিট ১ থেকে ৫ স্টার রেটিং দিয়ে মূল্যায়নের পর বেশি দামে বিক্রি করে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখান।”
পিবিআই কর্মকর্তা বলেন, “প্রতারকদের প্রলোভনে পড়ে গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথম বিনিয়োগ শুরু করেন ভুক্তভোগী। শুরুতে ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫১ টাকা জমা দিলে লাভসহ ১১ লাখ ৬৯ হাজার ২৫০ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়। তবে সেই টাকা তুলতে গেলে নিয়মকানুন, সিকিউরিটি মানি, ভিআইপি চ্যানেল খোলা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কেওয়াইসি ক্লিয়ারেন্সের অজুহাতে ধাপে ধাপে আরও লাখ লাখ টাকা দাবি করা হয়।”
একপর্যায়ে ধাপে ধাপে মোট ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ২৮৬ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিকাশ নম্বরে পাঠিয়ে প্রতারিত হন তিনি। এ ঘটনায় রাজধানীর দারুস সালাম থানায় একটি মামলা করেন।
তদন্তে পাওয়া তথ্য জানিয়ে এনায়েত হোসেন বলেন, “কম্বোডিয়ায় অবস্থানকালে আসামি মেহেদী হাসান প্রেমে ফেলে সুমাইয়া খাতুনকে দিয়ে দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলায়। এরপর প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত লাখ লাখ টাকা সুমাইয়ার অ্যাকাউন্টে জমা করে। পরে সেই টাকা মেহেদী ও নাঈমের পরিচালিত বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেওয়া হয়। সুমাইয়ার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে মাত্র এক মাসেই বিপুল অঙ্কের সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।”
জিজ্ঞাসাবাদের পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, “কম্বোডিয়াভিত্তিক এই প্রতারক চক্রে বেশ কয়েকটি দল পৃথক ডেস্কে কাজ করে। ফেসবুকে সুন্দর মেয়েদের ছবি দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে ছেলেদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো হতো। ফ্রেন্ড হওয়ার পর তিনদিনের পূর্ব-প্রস্তুতকৃত নির্ধারিত ‘স্ক্রিপ্ট’ অনুযায়ী চ্যাট করে টার্গেট করা ব্যক্তির হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর সংগ্রহ করা হতো। পরে সরাসরি কল বা ভিডিও কলে প্রলুব্ধ করে অনলাইন ব্যবসায় বিনিয়োগের ফাঁদে ফেলা হতো।”
অভিযানের সময় আসামিদের কাছ থেকে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের তিনটি এটিএম ও ডেবিট কার্ড, ভুয়া টেলিগ্রাম গ্রুপের স্ক্রিনশট, পাসপোর্টের কপি, কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর), ব্যাংক লেনদেনের বিবরণীসহ নানান আলামত জব্দ করা হয়েছে।
পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেফতার তিন জনই আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এই চক্রের সঙ্গে দেশি-বিদেশি আর কারা জড়িত এবং আত্মসাৎ করা অর্থ কোথায় পাচার করা হয়েছে, তা জানতে তদন্ত চলছে।