প্রথমে আসে একটি ফোন। ওপাশ থেকে বলা হয়, ছেলে মাদকসহ গ্রেফতার হয়েছে। তার বিরুদ্ধে এখন মামলা হবে, তাকে আদালতে পাঠানো হবে। পরিবার যদি তাকে ছাড়াতে চায়, তাহলে দ্রুত টাকা পাঠাতে হবে। পরিবার কিছু বুঝে ওঠার আগেই আসে আরেকটি ফোন। এবার ওপাশে শোনা যায় ছেলের মতো একটি কণ্ঠ। কণ্ঠে আতঙ্ক, অসহায়ত্ব। দ্রুত টাকা পাঠানোর আকুতি।
নিজের সন্তানের এমন ‘অসহায় পরিস্থিতির’ কথা শুনে অনেক অভিভাবকই চাহিদামতো টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছেন, হচ্ছে প্রতারণার শিকার। আবার অনেকেই একটু খোঁজ-খবর জানতে পারছে, ছেলে নিরাপদেই আছে। পুরো ঘটনাটিই ভুয়া।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন শিক্ষার্থীর পরিবার এমন প্রতারণার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রতারকেরা নিজেদের পুলিশ বা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। আবার কোথাও বলা হয়েছে, শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েছেন কিংবা জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। এরপর পরিবারের ভয় ও বিভ্রান্তিকে কাজে লাগিয়ে টাকা দাবি করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থীর পরিবারও একই কৌশলের শিকার হয়। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষার্থীর পরিবারকে ফোন করে বলা হয়, কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে তাকে মাদকসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। তার ফোন ও মানিব্যাগ জব্দ করা হয়েছে এবং তিনি পুলিশ হেফাজতে আছেন বলেও জানানো হয়। মামলা না করার জন্য পরিবারের কাছে চাওয়া হয় সাড়ে ৩ লাখ টাকা। শুরুতে পরিবারের সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু একপর্যায়ে প্রতারকেরা এমন একটি কণ্ঠ শোনায়, যা ওই শিক্ষার্থীর কণ্ঠের মতো। এতে পরিবারের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
পরে পরিবার সরাসরি ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়, তিনি নিরাপদে আছেন এবং ফোনগুলো যখন করা হয়েছিল, তখন তিনি কর্মস্থলেই ছিলেন। ওই শিক্ষার্থী জানান, প্রতারকেরা তার ব্যক্তিগত কিছু তথ্যও জানতো।
তিনি বলেন, ‘তারা আমার প্রয়াত বাবার কর্মস্থলের কথা বলেছিল। প্রথম বর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ফরমে আমি এই তথ্য দিয়েছিলাম।’ তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও নথি থেকে তথ্যটি ফাঁস হয়েছে; এমন কোনও প্রমাণ নেই। তথ্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পুরোনো কোনও ডেটাবেস, অনলাইন ফরম, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কোনও উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে কিনা, সেটিও স্পষ্ট নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোস্তফা আরিফুজ্জামান আরিফের পরিবারও একই ধরনের প্রতারণার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে। মে মাসে তার বাবা একটি ফোন পান। বলা হয়, আরিফকে মাদকসহ গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাকে আদালতে পাঠানো হবে। ফোনকারী নিজেকে ডিবির কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন।
একপর্যায়ে ফোনকারী এমন একটি কণ্ঠ শোনান, যা আরিফের কণ্ঠের মতো। পরিবারের ভাষ্য, কণ্ঠটি কান্নাজড়িত ছিল এবং সেখানে আরিফকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করার জন্য আকুতি জানানো হচ্ছিল। ছেলেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আরিফের বাবা প্রথমে ১ লাখ টাকা এবং পরে আরও ৫০ হাজার টাকা পাঠান। পরে পরিবার আরিফের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারে, তিনি নিরাপদে আছেন এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। এরপর সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
আরেকটি ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুদাচ্ছির আবিরের পরিবারের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তার মা একটি ফোন পান। বলা হয়, তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস করাতে আবিরের মতো একটি কণ্ঠ ব্যবহার করা হয়।
মাস্টারদা সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থী নেছার উদ্দিন জিহাদের পরিবারকেও বলা হয়, দুই বন্ধুর সঙ্গে তাকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে ছাড়ানোর জন্য চাওয়া হয় ৩০ হাজার টাকা। তবে পরিবার দ্রুত জিহাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হওয়ায় টাকা পাঠানোর আগেই প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ে।
আগস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ২০টির বেশি পরিবারের এমন অভিযোগের কথাও উঠে আসে। এসব ঘটনায় ফোন করে কখনও বলা হয়েছে শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, কখনও দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন, আবার কখনও অন্য কোনও জরুরি পরিস্থিতির কথা বলে টাকা চাওয়া হয়েছে।
প্রতারণার এই কৌশল শুধু ভুয়া গ্রেফতার কিংবা মাদক-সংক্রান্ত গল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনার গল্প সাজিয়েও পরিবারকে আতঙ্কিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি মোহাম্মদ রাকিব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে তার বাবা একটি ফোন পান। ফোনকারী বলেন, ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় রাকিব গুরুতর আহত হয়েছেন। বলা হয়, প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে, অবস্থা সংকটাপন্ন এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য টাকা প্রয়োজন। পরে রাকিব নিজেই বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, তিনি নিরাপদে আছেন।
রাকিব ওই প্রতারককে ফোন করে বিষয়টি জানতে চাইলে, তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি বলেন, “পিজি হাসপাতালে আসেন, মর্গে জিজ্ঞেস করেন। আমার মনে হয় না সে বাঁচবে।”
ঘটনাগুলো সামনে আসার পর বারবার একটি প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষার্থীদের এত নির্দিষ্ট তথ্য প্রতারকেরা পাচ্ছে কীভাবে? ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি ঘটনায় ফোনকারীরা শিক্ষার্থীর নাম বা ফোন নম্বরের চেয়েও বেশি তথ্য জানতো। তারা শিক্ষার্থীর বিভাগ, বন্ধু, পরিবার এমনকি অবস্থান সম্পর্কেও জানতো বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব তথ্য কোথা থেকে এসেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনও প্রমাণ নেই।
জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার সহকারী পরিচালক অনিন্দ্য ভট্টাচার্য বলেন, ব্যক্তিগত তথ্য হাতে থাকলে প্রতারকেরা ফোনে নিজেদের পরিচয় ও সাজানো গল্পকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।
তিনি বলেন, ‘প্রতারকেরা প্রথমে কিছু তথ্য নিশ্চিত করে নিতে পারে। এরপর গ্রেফতার, দুর্ঘটনা কিংবা চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতির গল্প তৈরি করে পরিবারের ওপর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করতে পারে।’ এসব প্রতারণা ঠেকাতে তথ্যের উৎস শনাক্ত করা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অভিযোগ পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানায়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও পর্যালোচনা করা দরকার, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য কোথায় কোথায় সংরক্ষিত আছে এবং কারা এসব তথ্যে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন, তা দেখা প্রয়োজন।’
প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে প্রতারকদের হাতে পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে নয়। পরিবারের সদস্যের মতো শোনানো কণ্ঠের ব্যবহারও ঝুঁকির আরেকটি স্তর তৈরি করছে। বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, প্রতারকেরা তাদের সন্তান বা পরিচিতজনের মতো শোনানো কণ্ঠ ব্যবহার করেছে। এতে ফোনের ওপাশে সত্যিই পরিবারের সদস্য রয়েছেন, এমন বিশ্বাস আরও সহজে তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশেও সম্প্রতি একই ধরনের একটি ঘটনার কথা জানা গেছে। লক্ষ্মীপুরে প্রতারকেরা এক ব্যক্তির বাবাকে ফোন করে নিজেদের গোয়েন্দা শাখার সদস্য পরিচয় দেয় এবং জানায়, তার ছেলেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে ছেলের মতো শোনানো একটি কণ্ঠ শোনানো হয়। প্রতারণার বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই পরিবারটি টাকা পাঠিয়ে দেয়।
তবে ওই ঘটনায় ব্যবহৃত কণ্ঠ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি হয়েছিল কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কণ্ঠটি কৃত্রিমভাবে তৈরি, এমন কোনও ফরেনসিক পরীক্ষার ফলও নেই। তবে ভয়েস-ক্লোনিং প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ায় এর অপব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৩ সালে ম্যাকাফির এক গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র তিন সেকেন্ডের অডিও ব্যবহার করেও কোনও ব্যক্তির কণ্ঠের সঙ্গে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত মিল থাকা একটি কণ্ঠ তৈরি করা সম্ভব। আরও বেশি অডিও ও প্রশিক্ষণ ব্যবহার করলে এই মিল ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়।
ভিডিও, সাক্ষাৎকার, রিলস এবং অনলাইনে থাকা অন্যান্য কনটেন্টে ব্যবহৃত কণ্ঠের নমুনাও এ ধরনের কণ্ঠসাদৃশ্য তৈরিতে অপব্যবহার করা হতে পারে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম) মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, অল্প সময়ের অডিও নমুনা ব্যবহার করেও বর্তমান প্রযুক্তির সাহায্যে কোনও ব্যক্তির কণ্ঠের বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘শুধু শুনে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় কোনও অডিও এআই দিয়ে তৈরি কিনা। মূল অডিও, কলের তথ্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ করতে হবে।’ ভয়েস-ক্লোনিং ব্যবহার করে প্রতারণার ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৩ সালে ৭ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর ম্যাকাফির করা এক জরিপে প্রায় প্রতি চারজনের একজন জানিয়েছেন, তারা এআই ভয়েস-ক্লোনিং প্রতারণার শিকার হয়েছেন অথবা এমন কারও কথা জানেন, যিনি এর শিকার হয়েছেন। এ ধরনের প্রতারণার মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ অর্থ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রতারণা নিয়ে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। ১০ সেপ্টেম্বর প্রধান হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংসদ সদস্যদের মোবাইল ফোন হ্যাকিং, ভয়েস ক্লোনিং ও জাল নথি ব্যবহার করে প্রতারণার বিষয়ে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন নম্বর থেকে টাকা চেয়ে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
শামসুল হক বলেন, প্রতারকদের মূল লক্ষ্য হলো ভুক্তভোগীকে দ্রুত টাকা পাঠাতে বাধ্য করা। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলকারীর নম্বর, অডিও রেকর্ডিং, বার্তা ও লেনদেনের তথ্যসহ সব ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্য প্রতারণার সঙ্গে জড়িত চক্র শনাক্ত করতে তদন্তকারীদের সহায়তা করতে পারে। এই প্রতারণায় শুধু প্রযুক্তিই ব্যবহৃত হচ্ছে না। প্রতারকেরা ভয়, তাড়াহুড়া আর পরিবারের পারস্পরিক বিশ্বাসকে একসঙ্গে কাজে লাগাচ্ছে।
সন্তান গ্রেফতার হয়েছে, দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে কিংবা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে; এমন খবর শুনলে মা-বাবার স্বাভাবিক প্রবৃত্তিই হলো যত দ্রুত সম্ভব তাকে সাহায্য করা। প্রতারকেরা সেই আবেগকেই কাজে লাগায়, যাতে তথ্য যাচাই করার মতো সময়টুকুও পরিবার না পায়। পরিচিত কণ্ঠের মতো শোনানো একটি আওয়াজ সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘কোনও পরিবারের সদস্য গ্রেফতার হয়েছেন বা দুর্ঘটনায় পড়েছেন; এমন ফোন পেলে প্রথমেই পরিচিত নম্বরে সরাসরি ওই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে হবে। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা উচিত। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট থানায় বা হাসপাতালে সরাসরি যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘ফোনের ওপাশে পরিচিত কণ্ঠ শুনলেও সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাঠানো উচিত নয়।’