বিমান যেন ‘স্বর্ণের খনি’

২২ সেপ্টেম্বর বিকালে শুল্ক গোয়েন্দার কাছে খবর আসে, সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ পাচার হচ্ছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারি বাড়ায় শুল্ক গোয়েন্দা। সন্ধ্যা ৬টায় ফ্লাইটটি অবতরণের পরপরই তল্লাশি শুরু করেন কর্মকর্তারা। প্রায় চার ঘণ্টা তল্লাশির পর বিমানের টয়লেটের একটি বিশেষ স্থানে লুকানো ৫০টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়। যার বাজারমূল্য ১১ কোটি টাকা।

এর আগে ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট থেকে ১৮ কেজি ওজনের ১৫৩টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়।

শুধু এই দুটি ঘটনা নয়, মাঝে মধ্যেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভেতরের এমন সংরক্ষিত স্থান ব্যবহার করে স্বর্ণ পাচারের ঘটনা ঘটছে, যেখানে সাধারণত যাত্রীর যাওয়ার কথা নয়। এর মধ্যে কিছু ঘটনা ধরা পড়ছে। এমনকি বিমানের কর্মী আটকের ঘটনাও ঘটছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মজা করে বলছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যেন ‘স্বর্ণের খনি’ হয়ে উঠেছে।

কেউ কেউ ধারণা করছেন, প্রায়ই স্বর্ণ ধরা পড়ার অর্থ হলো তথ্য না থাকলে সেগুলো হ্যাঙ্গারে নিয়ে কৌশলে খালাস করে বাইরে নেওয়া হচ্ছে।

জানা যায়, ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট থেকে ১৮ কেজি ওজনের ১৫৩টি স্বর্ণবার উদ্ধারের ঘটনার পর গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপরও স্বর্ণ পাচারের ঘটনা থামছে না।

১৪ কেজি স্বর্ণ নিয়ে পালানোর সময় বিমানকর্মী আটক

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৪ কেজি স্বর্ণসহ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক কর্মীকে আটক করা হয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আসা একটি ফ্লাইটে তল্লাশি চালিয়ে তাকে আটক করে কাস্টমস ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।

আটক মোহাম্মদ সোয়েব গাজী সজিব বিমানে টেকনিক্যাল হেলপার (কারিগরি সহকারী) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার কাছ থেকে মোট ১২০টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়, যার ওজন ১৩ কেজি ৯৯২ গ্রাম, প্রায় ১৪ কেজি। জব্দ করা স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সজিব স্বর্ণের বারগুলো একটি প্যাকেটে ভরে নিজের শরীরের বেল্টের ভেতর বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে বিমানবন্দর পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তল্লাশির সময় সন্দেহজনক আচরণ করায় তাকে চ্যালেঞ্জ করা হলে তিনি প্যাকেটটি ছুড়ে ফেলে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় তাকে আটক করা হয়।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিরাপত্তা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মেজর ফারহান তানভির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বৃদ্ধির করার ফলেই কিন্তু এসব স্বর্ণ উদ্ধার ও আটক হচ্ছে। কিন্তু মাঝে মধ্যেই এসব ঘটনা ঘটছে।’

তিনি বলেন, ‘যারা চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ত, আমরা কিন্তু কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। কেউ পাচারে যুক্ত হলে এর দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না, তাকেই নিতে হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কেন রোধ করা যাচ্ছে না, এটা তো বলা মুশকিল। হয়তো চোরাকারবারিরা তাদের ওইভাবে মোটিভেট করে ফেলে। তখন টাকার লোভে পড়ে তারা এগুলো করে। কিন্তু আমাদের যে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, তা কিন্তু কমেনি। আমরা ধরছি বলেই আপনারা জানতে পারছেন।’

সূত্রমতে, পূর্বে উড়োজাহাজের অভ্যন্তরে বিশেষ কায়দায় কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বড় বড় স্বর্ণের চালান নিয়ে এসেছে চোরাকারবারি চক্র। শুল্ক, শুল্ক গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় এগুলো উদঘাটিত হয়েছে। গ্রেফতারও হয়েছেন উড়োজাহাজের পাইলট, কেবিন ক্রু থেকে শুরু করে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কর্মকর্তা। সম্প্রতি এই প্রবণতা কমে গেলেও আবারও একটি চক্র উড়োজাহাজ ব্যবহার করে স্বর্ণের চালান নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

সূত্র জানায়, উড়োজাহাজের এমন কিছু লুকায়িত স্থান, যা সচরাচর তল্লাশির আওতায় আসবে না বলে ধারণা করা হয়, সেগুলোকে স্বর্ণের চালান রাখার স্থান হিসেবে বেছে নেয় চোরাকারবারিরা। উড়োজাহাজের একশ্রেণির কর্মকর্তা, পাইলট, কেবিন ক্রু, এমনকি লোডারদের ম্যানেজ করে বড় বড় স্বর্ণের চালান নিয়ে আসে তারা। এর মধ্যে কিছু চালান ধরা পড়লেও বেশিরভাগ চালান বাইরে চলে গেছে বলে ধারণা করা হয়েছে।

চোরাচালানে বিমানের যেসব স্থান ব্যবহার করা হয়


উড়োজাহাজের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা মনে করা হয় কার্গো হোলের অন্তর্মুখী পার্শ্বের প্যানেল বক্সকে। এখানে ১২টি পর্যন্ত প্যানেল বক্স থাকে। এগুলোর কাভার প্লেট স্ক্রু দিয়ে আঁটা থাকে। এর অভ্যন্তরে উড়োজাহাজের যাবতীয় ইউটিলিটি পাইপ ও অন্যান্য সংবেদনশীল কানেক্টিভিটি আউটলেট থাকে, যেখানে টেকনিশিয়ান ছাড়া অন্যদের যাওয়ার কথা নয়। ডিসি-১০ মডেলের মতো এই জাতীয় উড়োজাহাজের এই স্থানটি খুবই নিরাপদ জায়গা বলে মনে করা হয়।

এ ছাড়া নিরাপদ জায়গা মনে করা হয় উড়োজাহাজের ওয়াশরুমকেও। এর পাশাপাশি ইংলিশ কমোডের পার্শ্ববর্তী স্থান, লুকিং গ্লাসের পেছনের স্থান, গ্যাস মাস্ক সকেট ও যাত্রী আসনের নিচেও স্বর্ণ লুকানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যানেল বক্স থেকে মালামাল নামানোর সময় একাধিক সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করতে হবে। পাশাপাশি উড়োজাহাজ হ্যাঙ্গারে নিয়ে আসার সময় একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার উপস্থিতিতে সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পূর্বে দেশের ইতিহাসে ১২৪ কেজি স্বর্ণের চালান প্যানেল বক্সের ভেতর করে নিয়ে আসা হয়েছিল। পরে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ও কাস্টমস যৌথ অভিযান চালিয়ে স্বর্ণের চালানটি উদ্ধার করে। এ ছাড়া সিটের পেছনে, গ্যাস মাস্ক সকেট ও কমোডের ভেতরে বিশেষ কায়দায় রাখা অবস্থায়ও স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিপুল অর্থের লোভ দেখিয়ে একশ্রেণির কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চোরাকারবারিরা নিরাপদে এই প্রক্রিয়ায় স্বর্ণ পাচার করে থাকে। আবার ওই চক্রটি এই পাঁয়তারা করছে। তবে আমরা সতর্ক রয়েছি। এবং উড়োজাহাজের ওই সকল স্থানগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার জন্য আমরা বলেছি।’

তিনি বলেন, ‘এখন থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে আবারও বড় বড় চালান নিয়ে আসবে চোরাচালান চক্র।’

সিন্ডিকেট ভাঙে না, শুধু কৌশল পাল্টায়

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানের এক ক্রু এই চোরাচালানের ভেতরের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতির শিকার হয়ে কেউ কেউ এ ধরনের কাজে জড়িয়ে পড়েন, আবার কেউ লোভে পড়ে যুক্ত হন। তবে স্বর্ণ চোরাচালানের সিন্ডিকেটের শিকড় অনেক গভীরে। একবার কেউ জড়ালে সহজে বের হতে পারেন না। কেউ বিপদে পড়লে তাকে উদ্ধার করতেও সিন্ডিকেট কাজ করে।’

তার ভাষায়, ‘সিন্ডিকেট কখনও ভাঙে না। তবে তারা বেশভূষা ও কৌশল পাল্টায়, এমনকি নামও পাল্টায়।’ বিমানবন্দর থেকে দেশের ভেতরে স্বর্ণ পৌঁছে দেওয়ার কাজেও দুই পাশে সিন্ডিকেটের লোকজন সক্রিয় থাকে বলে জানান তিনি।

উদ্ধার ১,৯০৬ কেজি, ৬৪৭ মামলা নিষ্পত্তি


দেশে স্বর্ণ চোরাচালানের ব্যাপকতা বোঝা যায় জব্দের পরিসংখ্যান দেখলেই। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে অন্তত ১,৯০৬ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে বড় চালানগুলোর কয়েকটি এসেছে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১২৪ কেজি ও ১০৫ কেজি এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে ১০৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের বড় ঘটনাগুলো এরই প্রমাণ।

বিমানবন্দর থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছরে স্বর্ণ চোরাচালান-সংক্রান্ত ৬৯৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪৭টি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং ৫০টি তদন্তাধীন। তবে এই ‘নিষ্পত্তি’ হওয়া মানেই যে আসামির সাজা হয়েছে, তা নয়। অনেক পরিত্যক্ত চালানের প্রকৃত মালিক বা মূল হোতাকে কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী পরিচালক কাজী আল মাসুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের নজরদারি কমেনি। এই নজরদারির কারণেই কিন্তু বড় বড় চালান ধরতে সমর্থ হয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘অন্যান্য এয়ারলাইন্সের চাইতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনা বেশি ঘটে। এর কর্মীরাও আটক হন। এ বিষয়ে বিমানকে আমরা বারবার সতর্ক করেছি। আমার জানা মতে, অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকেও সতর্ক করা হয়েছে। তারপরও তারা আনছেন, ধরাও পড়ছেন। তারা নিজেরা সতর্ক না হলে এটি রোধ করা সম্ভব না। তারা জানেন, এটি নিয়ে গেলে ধরা পড়ার সম্ভাবনাই শতকরা ৯০ ভাগ। তাহলে তারা এটি করছেন কেন? সামান্য কিছু টাকার জন্য একদিকে তারা যেমন বিপদে পড়ছেন, অন্যদিকে বিমানকেও প্রশ্নের মধ্যে ফেলছেন।’

ঢাকা কাস্টমস হাউজের কমিশনার রইছ উদ্দীন বলেন, ‘আমাদের সর্বত্র নজরদারি রয়েছে। চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে আমাদের আগের চেয়ে নজরদারি বাড়ানো রয়েছে। শুধু বাংলাদেশ বিমান নয়, যে এয়ারলাইন্সেই অবৈধ পণ্য আসবে, আমরা সেখানে অভিযান পরিচালনা করবো।’