আখতারুজ্জামানের জামিন শুনানিতে হট্টগোল-ধাক্কাধাক্কি, এজলাস ছাড়েন বিচারক

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের জামিন শুনানিতে হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। বিএনপিপন্থী ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন।

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলমের আদালতে রবিবার (৪ অক্টোবর) এ ঘটনা ঘটে। পরে এজলাস ত্যাগ করেন বিচারক।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মামলায় শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। শনিবার (৩ অক্টোবর) তার এক দিনের রিমান্ড দেয় আদালত।

রিমান্ড শেষে রবিবার তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন   মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার এসআই মাজেদুল ইসলাম। শুনানি শুরুর আগে ২টা ৩৮ মিনিটের দিকে  আখতারুজ্জামানকে মাথায় হেলমেট ও হাতে হাতকড়া পড়িয়ে এজলাসে তোলা হয়। এরআগে এজলাস কক্ষ দুই পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আখতারুজ্জামানকে এজলাসে তোলার মিনিট দুয়েক পর ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম এজলাসে ওঠেন। তখন এজলাসে দাঁড়ানো নিয়ে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল শুরু হয়। পরে তারা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। এ অবস্থায় ২টা ৪১ মিনিটের দিকে ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী এবং আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাকের হস্তাক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। মিনিট দুয়েক পর পুনরায় এজলাসে আসেন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম।

এসময় হাত তুলে বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আখতারুজ্জামান বলেন,‘আমার পক্ষে ১০ জন আইনজীবী কথা বলবেন। ১০ জনের হেয়ারিং করা অনুমতি প্রার্থণা করছি।’

এরপর আব্দুর রাজ্জাক জামিন শুনানি শুরু করে বলেন,‘তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সবকিছুর সিটিটিভি ফুটেজ আছে। শুধু মারধর করার দৃশ্য নাই। মূল ব্যাপার হলো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড। তিনি নতুন দলে যোগদান করেছেন। এজন্য তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনি অসুস্থ, ৭৩ বছর বয়স্ক লোক। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। তার জামিন প্রার্থণা করছি।’

এসময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আখতারুজ্জামান কথা বলতে চান। তখন বিচারক বলেন,‘সবাই এক সাথে কথা বললে তো শুনতে পাবো না। একজন একজন করে বলেন।’

প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধিতা করেন। মামলার বিষয়বস্তু তুলে ধরেন। তিনি বলেন,‘প্রতিবাদ করার ধরন আছে। ধরন যদি ঠিক না থাকে, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। তাদের (জামায়াতে ইসলামী) একটা কাজ হচ্ছে উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ না করে দেশকে অস্থিতিশীল করা যায় কিভাবে, সেটা করা।’

ওমর ফারুক বলেন,‘বিএনপি বহুদলের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ নিমক খেয়ে ভুলে যায়। অন্য দলে যোগদানের জন্য মামলা দিতে হবে এমনটা বিএনপি করে না। জামায়াতে ইসলামের আইনজীবীদের উদ্দেশ করে বলেন,‘আমাদের মধু খেয়ে বেঁচে ছিলেন।’

এ কথার বিরোধিতা করেন জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবীরা। তখন এজলাস কক্ষে কিছুটা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

তখন ওমর ফারুক বলেন,‘আপনারা রাজনীতি না আনলে আমিও আনতাম না। এমন মানসিকতা আমাদের নেই যে, অন্য দলে কেউ যোগ দিলে মামলা দিতে হবে। তবে শালীনভাবে প্রতিবাদ করতে হবে। তারা ফেসবুক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে যাকে ইচ্ছে যা- তা বলেন। উনি যে কাজ করেছেন তা অপরাধ। মামলা জামিন অযোগ্য ধারায়। প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। জামিন পেলে মামলার তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাবেন। জামিনের বিরোধিতা করছি। আর তুচ্ছ ঘটনা থেকে এমন কিছু না, আরও রহস্য আছে।’

ওমর ফারুকের বক্তব্যের বিষয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আব্দুর রাজ্জাক বলেন,‘দায়িত্বশীল পদে থেকে তার এ ধরনের বক্তব্য আশা করি না।’ তিনি ‘বাতিল মাল’ বলে আসামিকে মন্তব্য করেন। এসময়ও আদালতে উত্তেজনাজনক পরিবেশ তৈরি হয়।

আব্দুর রাজ্জাক বলেন,‘ওনাদের ভূমিকা পজিটিভ হওয়া দরকার। তিনি জামিন পাওয়ার হকদার। তার জামিন প্রার্থনা করছি।’

তখন ওমর ফারুক বলেন,‘আখতারুজ্জামান ফ্যাসিস্টের পক্ষে গিয়ে নির্বাচন করেছেন। জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, এর ভিডিও আছে। নিজেকে বাঁচাতে জামায়াতে আশ্রয় নিয়েছেন। জামায়াতে ইসলাম তাকে আশ্রয় দিয়েছে আমাদের গালাগালি করতে।’

পরে আদালত  জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

আখতারুজ্জামানকে হাজির করা হবে জেনে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা আদালতপাড়ায় ভিড় করেন। তাকে নিয়ে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। শুনানি শেষে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা আদালতের নিচে এসে তাদের  আদালত থেকে বের করে দিতে যান। কয়েকজন আইনজীবীর সাথে তারা তর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরে কয়েকজনকে প্রহার করে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। এদিকে নিচে এসে জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা তাদের (নেতাকর্মীদের) রক্ষা করতে যান। এসময় দুই পক্ষের আইনজীবীরা ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়েন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।