স্ক্যাম সেন্টার কী 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জঙ্গলঘেরা সীমান্তে গড়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর সব প্রতারণার কারখানা— নাম  স্ক্যাম সেন্টার। বাইরে থেকে দেখতে বড় হোটেল বা ক্যাসিনো মনে হলেও ভেতরে চলছে মানবপাচার, নির্যাতন আর বিশ্বজুড়ে অনলাইন প্রতারণার বিলিয়ন ডলারের কারবার।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই সেন্টারগুলো মূলত মিয়ানমারের শোয়ে কোকো, মিয়াওয়াদির কেকে পার্ক, কম্বোডিয়ার সিহানুকভিল, নমপেন এবং লাওসে অবস্থিত।এগুলো সাধারণ কোনও কল সেন্টার নয়— এগুলো দেয়াল ঘেরা, সশস্ত্র পাহারায় থাকা কম্পাউন্ড, যা আন্তর্জাতিক অপরাধীরা পরিচালনা করে থাকে।

কাদের রাখা হয় সেখানে?

পুলিশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, সেখানে যারা কাজ করেন তারা অপরাধী নয়, তারা নিজেরাই পাচারের শিকার। ফেসবুক ও টিকটকে চটকদার বিজ্ঞাপন, যেমন-  ‘থাইল্যান্ডে কল সেন্টারে চাকরি, বেতন ১২০০ ডলার, থাকা-খাওয়া ফ্রি’। এই লোভে পা দিচ্ছেন বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ভিয়েতনাম, আফ্রিকাসহ কয়েক ডজন দেশের তরুণ-তরুণীরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, থাইল্যান্ডে নামার পর তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে মিয়ানমার বা কম্বোডিয়ার সীমান্তে অবস্থিত স্ক্যাম সেন্টারে ঢোকানো হয়। সেখানে তাদের দিন কাটে চরম অনিশ্চয়তায়।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু মিয়ানমারেই অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ এভাবে আটক রয়েছেন। অনেকের পরিবার দেশে থেকে মুক্তিপণ দাবির খবর পাচ্ছেন। বাংলাদেশ থেকেও এই চক্রে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা বাড়ছে। কম্বোডিয়া ও মিয়ানমার থেকে ফিরে এসে দেশেই নতুন করে স্ক্যাম সেন্টার গড়ার চেষ্টার খবরও তদন্ত করছে পুলিশ।

কেন রাখা হয়, কী করানো হয়?

তাদের দিয়ে বিশ্বের সাধারণ মানুষকে অনলাইনে ঠকানো হয়। টার্গেট পূরণ না করলে চলে ভয়াবহ নির্যাতন। জাতিসংঘ বলছে, এই সেন্টারগুলোতে মানবপাচার, দাসত্ব এবং অর্থ পাচার একসাথে চলে।

সুন্দরী নারী বা ধনী পুরুষ সেজে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করে ক্রিপ্টো বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া। সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে রোমান্স, বিনিয়োগ ও ব্যবসার নামে এই প্রতারণা চলে আসছে।

এছাড়া ‘ঘরে বসে লাইক দিলেই ৫০০ টাকা’ বা ‘আপনি লটারি জিতেছেন’—এমন মেসেজ পাঠিয়ে বিকাশ/নগদের মতো মোবাইল ফিনান্সিয়াল সেবা ব্যবহার করে টাকা নেওয়া হয়।

আবার ব্যাংক বা অনলাইন শপের কর্মকর্তা সেজে ওটিপি হাতিয়ে নেওয়া হয়। এরপর সেই অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ চুরি করা হয়। এই অর্থ পরে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে অচেনা কোম্পানির চাকরির প্রস্তাবে যাচাই ছাড়া পা না দেওয়া এবং দূতাবাসের মাধ্যমে ভিসা ও কোম্পানি যাচাই করাই এই নরক থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।

স্ক্যাম সেন্টারে প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফেরত আসা শাহিনুর রহমান (ছদ্মনাম) জানান, বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বৈধ প্রক্রিয়ায় তাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশি দালাল চক্রের মাধ্যমে তাদের অর্থের বিনিময়ে চীনা নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে নেওয়া হয়।

ফেরত আসা ভুক্তভোগীরা জানান, এসব কম্পাউন্ডে তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার স্ক্যাম কার্যক্রমে অংশ নিতে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতো। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো।

সাম্প্রতিক সময়ে কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ফলে কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে এই বাংলাদেশিদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

এর আগে একইভাবে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। তাদেরও ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা মায়েসট হয়ে জোরপূর্বক মিয়ানমারে প্রবেশ করানো হয়।

সেখানে পৌঁছানোর পরই তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বিদেশের মাটিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। ভয়াবহ নির্যাতন করে নানা ধরনের সাইবার জালিয়াতির কাজ করানো হতো।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, সাইবার স্ক্যাম মানবপাচারের ভয়াবহ একটা ধরন। কম্পিউটার অপারেটর, টাইপিস্ট, কলসেন্টার অপারেটরসহ বিভিন্ন পদে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দিয়ে নিয়োগের লক্ষ্যে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে (ভুয়া ওয়েবসাইট, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ইত্যাদি) প্রচার চলে।

তিনি জানান, এরপর তাদের সুকৌশলে স্ক্যাম সেন্টারের ভেতরে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক জিম্মি করে স্ক্যামের কাজে নিয়োজিত করা হয়। এ কারণেই সরকার এবং ব্র্যাকের পক্ষ থেকে একাধিকবার থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যাওয়ার বিষয়ে সচেতন হতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

শরিফুল হাসান বলেন, আমরা সবাইকে ফের সতর্ক করছি। এসব বিষয়ে বিদেশগামীসহ সবার সচেতনতা প্রয়োজন। সরকারেরও এসব দেশে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে অনুমোদন দেওয়ার আগে আরও ভালো করে যাচাই-বাছাই করা উচিত। বিশেষ করে বিদেশগামী কর্মীদের চাকরি যাচাই, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণ এবং সাইবার স্ক্যাম বন্ধে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করতে হবে।