তাহসিফের মৃত্যু

দফায় দফায় রিমান্ডে আসামিরা, কী তথ্য খুঁজছে পুলিশ

বারে বান্ধবীর রহস্যজনক আচরণ। গভীর রাতে জুনিয়র বন্ধুর সঙ্গে মাদকপ্রবণ এলাকায় যাত্রা। এরপর নিখোঁজ। পরদিন নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার। সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর আগে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ। দফায় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে দুই আসামিকে।

তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ক্লু মিললেও এখনও নিশ্চিত হয়নি মৃত্যুর নেপথ্যের ঘটনা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কী এমন তথ্য পাওয়া গেছে, যার সত্যতা যাচাই করতে বারবার রিমান্ডের প্রয়োজন হচ্ছে? আর কী গোপন রহস্য উদঘাটন করছেন তদন্তকারীরা?

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের নজরে রয়েছে ঘটনার দিন দিশার আচরণ, দীপের দেওয়া তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং মোবাইল ফোনের যোগাযোগের বিবরণ। বিশেষ করে উত্তরার একটি বার থেকে দিশার দ্রুত চলে যাওয়ার কারণ, গভীর রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে তাহসিফের যাওয়ার উদ্দেশ্য এবং সেখানে পৌঁছানোর পর কী ঘটেছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য। তবে এসব ঘটনার মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনও বলছে না পুলিশ।

নৌ পুলিশের তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর দীপ ও দিশার সঙ্গে তার বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা, মোটরসাইকেলের গ্যারেজে যাওয়া এবং উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে। একপর্যায়ে দিশা চলে যান। পরে গভীর রাতে দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান তাহসিফ। সেখান থেকে আর জীবিত ফেরেননি তিনি।

বার থেকে দিশার তড়িঘড়ি চলে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন

তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে উত্তরার নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে তাহসিফ ও দিশার অবস্থানকালের ঘটনাপ্রবাহ। ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, সেখানে একসঙ্গে মদ্যপানের একপর্যায়ে দিশা চলে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন। দ্রুত নিচে নেমে চলে যেতে চাইলে তাহসিফ তাকে থামান। পরে মোটরসাইকেলে করে দিয়াবাড়ির রুয়াপ কমপ্লেক্স এলাকার কাছে নামিয়ে দেন। কিন্তু হঠাৎ কেন চলে যেতে চেয়েছিলেন দিশা? তাদের মধ্যে এমন কী ঘটেছিল, যার কারণে তিনি আর সেখানে থাকতে চাইছিলেন না? শুধু ব্যক্তিগত মনোমালিন্য, নাকি অন্য কোনও পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল?

তদন্ত কর্মকর্তাদের দিশার দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, মদ্যপানের সময় তাদের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল। অভিমান করেই তিনি সেখান থেকে চলে যেতে চেয়েছিলেন। তবে এ ব্যাখ্যার বিস্তারিত যাচাই করতে চাইছেন তদন্তকারীরা।

আদালতে দাখিল করা রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা জানতে চেয়েছেন, সেদিন রুয়াপ কমপ্লেক্সের একটি খাবারের দোকান কিংবা নেস্ট বারে তাহসিফ ও দিশার মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়েছিল কি না। ঘটনার আগে তাদের সম্পর্কে কোনও টানাপোড়েন চলছিল কি না, সেটিও যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, ঘটনার আগে ও পরে দিশার সঙ্গে তাহসিফের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ। কললিস্টে একাধিকবার যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করেছে পুলিশ। এসব যোগাযোগের সময়, বিষয়বস্তু এবং ঘটনার সঙ্গে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু দীপকে ঘিরেও তদন্তকারীদের একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। ঘটনার দিন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তিনি তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন। ফলে মৃত্যুর আগে তাহসিফের গতিবিধি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তার কাছ থেকে পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ।

তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে উত্তরার নেস্ট বারে অবস্থানের সময় দীপের প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য অন্যত্র সরে যাওয়ার বিষয়টি। ওই সময় তিনি কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং কেন আলাদা হয়েছিলেন, এসব তথ্য যাচাইয়ের কথা দ্বিতীয় দফার রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি দীপের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), সিসিটিভি ফুটেজ এবং তার দেওয়া বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। গভীর রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যাওয়ার কারণটিও জানতে চাইছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে তারা টঙ্গীর মাজার বস্তিতে পৌঁছান। সেখান থেকে তুরাগ নদের তীরবর্তী একটি মাঠে যান। ওই এলাকায় কয়েকজনকে দেখে তারা আলাদা হয়ে যান বলে দীপের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, পুলিশের পোশাক পরা কয়েকজনের ধাওয়ার মুখে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তবে ধাওয়ার ঘটনাটি সত্য কি না, ধাওয়াকারীদের পরিচয় কী এবং তাহসিফ কীভাবে নদীতে পড়েছিলেন, সেসব বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা।

তিন দফা রিমান্ডে আসলে কী খুঁজছে পুলিশ

তাহসিফ হত্যা মামলায় গত ৩১ অক্টোবর প্রথম দফায় দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এরপর ৩ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় তিন দিন এবং সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) তৃতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। অন্যদিকে দিশাকে ১ নভেম্বর প্রথম দফায় চার দিন এবং ৪ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।

তৃতীয় দফায় দীপকে রিমান্ডে নিতে পাঁচটি কারণ তুলে ধরে পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে হত্যার উদ্দেশ্য নির্ধারণ, আলামত উদ্ধার, সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী ও সহযোগীদের শনাক্ত, প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে বক্তব্য মিলিয়ে দেখা এবং অপরাধ সংঘটনের পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ। বিশেষ করে ব্যক্তিগত বিরোধ, আর্থিক লেনদেন, পূর্বশত্রুতা কিংবা অন্য কোনও কারণ এই মৃত্যুর পেছনে কাজ করেছে কি না, তা নিশ্চিত হতে চাইছেন তদন্তকারীরা। একইসঙ্গে ঘটনায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তার মোটরসাইকেল উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছিল, নাকি অন্য কোনও পরিস্থিতিতে তিনি নদীতে পড়েছিলেন, তা নিশ্চিত হতে চাইছে পুলিশ।

মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তদন্তে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ক্লু পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্যই সংশ্লিষ্টদের রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো হবে।

শেষ মুহূর্তের ঘটনাপ্রবাহই এখন মূল রহস্য

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ করে আলোচনায় এসেছিলেন সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন। পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মেসেঞ্জারে মায়ের কাছে পাঠানো একটি ভয়েস মেসেজে বাড়ি ফেরার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর ফেরেননি তাহসিফ। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকালে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। পরে তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা করেন।

কারাগারের দিশা, দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির লাশ উদ্ধারের ঘটনায় করা হত্যা মামলায় তার বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে দিশা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন মর্মে আদালতকে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন দু’দফা রিমান্ড শেষে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দিশাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই সাইফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আসামির পক্ষে জামিন আবেদন ছিল না।’

কারাগারে আটক রাখার আবেদনে বলা হয়, মামলার ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য দিশাকে ব্যাপকভাবে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে দিশা জানান, তাহসিফ সাউরির সঙ্গে ঘটনার আগে ২৭ অক্টোবর রাতের বেলা উত্তরা ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ যান।

এর আগে সন্ধ্যায় একাধিকবার ‘সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকস’ খায়। মোটরসাইকেল গ্যারেজে তাহসিফ সাউরি ও দিশা একসঙ্গে যায়। দিশা ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ একসঙ্গে ছিলেন এবং বিভিন্ন জায়গায় তাহসিফের সঙ্গে বাইকে ঘোরাঘুরি করেছেন বলে জানান।

এছাড়াও তদন্তে সন্দেহজনক আসামি দিশা মামলার ঘটনা সম্পর্কে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন, যা তদন্তের স্বার্থে গোপন রেখে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে জানিয়ে তদন্তকর্তা আবেদনে বলেন, আসামি অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির হওয়ায় একাধিক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে যান এবং নীরবতা পালন করেন।