নিজের মাকেই নকল মানুষ মনে হয়, আছে এমন মানসিক রোগ

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে একজন ব্যক্তি তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি দেখতে আমার মায়ের মতো, কিন্তু আপনি আমার আসল মা নন। কেউ তার জায়গায় আপনাকে পাঠিয়েছে।”

শুনতে সিনেমার গল্প মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন একটি বিরল মানসিক-স্নায়ুবিক অবস্থা রয়েছে। এর নাম ক্যাপগ্রাস সিনড্রোম। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি তার সবচেয়ে কাছের মানুষ—মা, বাবা, স্বামী, স্ত্রী কিংবা সন্তানকে দেখতে ঠিক আগের মতোই দেখেন, কিন্তু বিশ্বাস করেন, তারা আসল নন; বরং দেখতে হুবহু একই রকম একজন ‘প্রতারক’ বা ‘নকল’ মানুষ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সাধারণ ভুল বোঝাবুঝি নয়; বরং মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের একটি বিরল সমস্যার ফল।

কী এই ক্যাপগ্রাস সিনড্রোম?

ক্যাপগ্রাস সিনড্রোম এমন একটি বিভ্রমজনিত (ডিলিউশন) অবস্থা, যেখানে রোগী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, তার পরিচিত কাউকে গোপনে অন্য একজন দিয়ে বদলে দেওয়া হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রোগী সাধারণত মুখ চিনতে পারেন। অর্থাৎ তিনি বুঝতে পারেন, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি দেখতে তার মায়ের মতোই। কিন্তু তার মনে হয়, এই মানুষটি আসল মা নন।

এই বিশ্বাসকে যুক্তি দিয়ে ভাঙা খুব কঠিন, কারণ রোগীর কাছে সেটিই বাস্তব মনে হয়।

কেন এমন হয়?

স্নায়ুবিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের মস্তিষ্কে মুখ চেনা এবং সেই মুখের সঙ্গে আবেগগত পরিচিতি অনুভব করার জন্য আলাদা আলাদা স্নায়ুপথ কাজ করে।

ক্যাপগ্রাস সিনড্রোমে মুখ শনাক্ত করার ক্ষমতা সাধারণত ঠিক থাকে। কিন্তু পরিচিত মুখ দেখলে যে আবেগগত ‘পরিচিতির অনুভূতি’ তৈরি হওয়ার কথা, সেটি দুর্বল হয়ে যায় বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ফলে মস্তিষ্ক এক ধরনের অসামঞ্জস্যের মুখে পড়ে। চোখ বলছে, “এটা আমার মা”, কিন্তু আবেগ বলছে, “এমন অনুভূতি তো হচ্ছে না।” এই অসামঞ্জস্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়েই মস্তিষ্ক ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছায়—“তাহলে তিনি নিশ্চয়ই আসল মানুষ নন।”

কারা আক্রান্ত হতে পারেন?

এই সমস্যা অত্যন্ত বিরল। এটি একক কোনও রোগ নয়; বরং বিভিন্ন মানসিক বা স্নায়ুবিক রোগের অংশ হিসেবে দেখা দিতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এটি দেখা যেতে পারে— সিজোফ্রেনিয়ার কিছু রোগীর মধ্যে; আলঝাইমার রোগ বা অন্যান্য ডিমেনশিয়ায়; মস্তিষ্কে আঘাতের পর; বিরল ক্ষেত্রে অন্য কিছু স্নায়ুবিক রোগেও।

অর্থাৎ ক্যাপগ্রাস সিনড্রোম নিজে একটি আলাদা অভিজ্ঞতা হলেও, এর পেছনে অন্য কোনও শারীরিক বা মানসিক কারণ থাকতে পারে।

শুধু মাকেই নয়

যদিও সবচেয়ে বেশি আলোচিত উদাহরণ হলো মা বা বাবাকে ‘নকল’ মনে হওয়া, বাস্তবে এই বিভ্রম স্বামী, স্ত্রী, সন্তান, ভাইবোন, বন্ধু কিংবা পোষা প্রাণীকেও ঘিরে তৈরি হতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে রোগী এমনও বিশ্বাস করেন যে, একই ব্যক্তি বিভিন্ন ছদ্মবেশে তার আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

এটি কি বিপজ্জনক?

সব রোগী আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন না। তবে যদি রোগী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে তার পরিবারের সদস্য আসলে একজন প্রতারক, তাহলে ভয়, উদ্বেগ বা আত্মরক্ষামূলক আচরণ দেখা দিতে পারে। এ কারণে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসা কী?

ক্যাপগ্রাস সিনড্রোমের চিকিৎসা মূলত এর অন্তর্নিহিত কারণের ওপর নির্ভর করে। যদি এটি সিজোফ্রেনিয়ার অংশ হয়, তাহলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ এবং মনোসামাজিক চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। আবার যদি ডিমেনশিয়া বা অন্য কোনো স্নায়ুবিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে সেই রোগের চিকিৎসাই প্রধান গুরুত্ব পায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগীর সঙ্গে তর্ক করে তাকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা না করে, শান্তভাবে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

কেন বিষয়টি জানা জরুরি?

ক্যাপগ্রাস সিনড্রোম বিরল হলেও এটি আমাদের মস্তিষ্ক সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়। আমরা শুধু চোখ দিয়ে মানুষকে চিনি না; পরিচিত মানুষের প্রতি আবেগ, স্মৃতি ও অনুভূতির সমন্বয়েই তৈরি হয় ‘আপনজন’কে চিনে নেওয়ার অভিজ্ঞতা।

এই জটিল ব্যবস্থার কোথাও সমস্যা হলে, চোখ ঠিকই পরিচিত মুখ দেখে, কিন্তু মস্তিষ্ক তাকে আর ‘আপনজন’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। তখনই জন্ম নিতে পারে এমন এক বিভ্রম, যেখানে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকেও মনে হয়—তিনি আসল নন।