সন্তান জন্মের পর একজন মায়ের জীবনে অনেক কিছুই বদলে যায়। আনন্দের পাশাপাশি আসে ঘুমের ঘাটতি, শারীরিক ক্লান্তি, শিশুর কান্না, বুকের দুধ খাওয়ানোর চাপ, নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তি—কখনও কখনও তীব্র মানসিক চাপও। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে অনেক মা তখন কঠিন সময় পার করেন।
সমস্যা হলো, নতুন মায়ের যত্ন বলতে আমরা বেশিরভাগ সময় তার শারীরিক সুস্থতা আর শিশুর যত্নকেই বুঝি। মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। অথচ প্রসবের পর বিষণ্নতা, উদ্বেগ কিংবা আরও গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মায়ের জন্য সময়মতো সহায়তা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি এন নিবন্ধে মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ভ্যানেসা লোবু লিখেছেন, নতুন মায়েদের শুধু ‘শক্ত থাকতে’ বললেই হবে না; এমন পরিবেশও তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রয়োজনের সময় তারা বিশ্রাম, বাস্তব সহায়তা ও মানসিক সমর্থন পাবেন।
মন খারাপ আর বিষণ্নতা এক নয়
সন্তান জন্মের পর মেজাজ খারাপ হওয়া বা অকারণে কান্না পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ নারীর মধ্যে এমন সাময়িক উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যাকে ‘বেবি ব্লুজ’ বলা হয়। সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই এসব উপসর্গ কমে আসে।
কিন্তু মন খারাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিষয়টি ভিন্ন। প্রায় সাতজনের একজন নারী প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারেন। তখন শুধু মন খারাপ নয়, কোনও কিছুতে আনন্দ না পাওয়া, নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া, অতিরিক্ত উদ্বেগ, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা কিংবা সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার মতো অনুভূতিও দেখা দিতে পারে।
আরও বিরল হলেও প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিস অত্যন্ত গুরুতর একটি অবস্থা। এতে বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতায় সমস্যা হতে পারে, আচরণ ও মেজাজে দ্রুত পরিবর্তন আসতে পারে, অস্বাভাবিক বিশ্বাস তৈরি হতে পারে কিংবা এমন কিছু দেখা বা শোনা যেতে পারে, যা বাস্তবে নেই।
তাই সন্তান জন্মের পর মায়ের আচরণ বা অনুভূতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে শুধু ‘নতুন মা হওয়ার চাপ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
নতুন মায়ের সবচেয়ে বেশি দরকার কী?
অনেক সময় নতুন মাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘বাচ্চা কেমন আছে?’ কিন্তু খুব কমই জানতে চাওয়া হয়, ‘তুমি কেমন আছ?’
এই ছোট্ট পার্থক্যটাই গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন মায়ের হয়তো কয়েক ঘণ্টা একটানা ঘুম দরকার। হয়তো কেউ কিছুক্ষণের জন্য শিশুটিকে দেখবে, যাতে তিনি গোসল করতে পারেন, খেতে পারেন কিংবা শুধু একটু চুপচাপ বসে থাকতে পারেন। কখনও হয়তো তার প্রয়োজন নিজের অনুভূতির কথা কাউকে বলা।
অর্থাৎ সহায়তা মানেই শুধু ‘কিছু একটা করে দেওয়া’ নয়। একজন মাকে বোঝানোও গুরুত্বপূর্ণ যে, সবকিছু তাকে একা সামলাতে হবে না।
নিবন্ধের লেখক নিজের মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দেখিয়েছেন, সন্তান জন্মের পর শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি একা সবকিছু সামলানোর চাপও কতটা কঠিন হতে পারে। শিশুর যত্নের মধ্যে নিজের জন্য সময় বের করার সুযোগ না থাকলে ক্লান্তি ও মানসিক চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।
মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাব পড়ে শিশুর ওপরও
মায়ের মানসিক সুস্থতার বিষয়টি শুধু মায়ের নিজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; শিশুর বিকাশের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্নতা বা উদ্বেগে ভোগা বাবা-মায়ের সন্তানদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ঘুম, খাওয়া, সামাজিক যোগাযোগ এবং সম্পর্ক তৈরিতে কিছু সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর অর্থ এই নয় যে এমন মায়ের সন্তানদের এসব সমস্যা হবেই। বরং মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া হলে শিশুর জন্যও একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়।
তাই ‘ভালো মা’ হওয়ার চাপ বাড়ানোর বদলে নতুন মাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু মাকে নয়, পুরো ব্যবস্থাকেই বদলাতে হবে
নতুন মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শুধু ব্যক্তিগত শক্তি বা দুর্বলতার কথা বললে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। একজন মা যদি সারাদিন শিশুর যত্ন নেন, রাতে ঘুমাতে না পারেন, ঘরের কাজও সামলান এবং সাহায্য করার মতো কাউকে না পান, তাহলে তার ওপর চাপ তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
এ কারণে পরিবার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা—সব জায়গায় নতুন মায়েদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা থাকা দরকার। বেতনসহ অভিভাবকত্বকালীন ছুটি, সাশ্রয়ী শিশুযত্ন, সহজে পাওয়া যায় এমন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবারের বাস্তব সহায়তা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় কথা, সন্তান জন্মের পর শুধু শিশুটির দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। যে মানুষটি শিশুটিকে জন্ম দিয়েছেন, তারও তখন যত্ন দরকার।
নতুন মাকে শুধু ‘বাচ্চার মা’ হিসেবে না দেখে একজন মানুষ হিসেবেও দেখার প্রয়োজন আছে—যার ক্লান্তি আছে, ভয় আছে, বিশ্রামের প্রয়োজন আছে এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়ার অধিকারও আছে।

শিশুর শরীরে নীলচে দাগ, ‘মঙ্গোলিয়ান স্পট’ আসলে কী?







