পকেটে টান, তবু থামে না ছোট ছোট বিলাসিতা! কী এই ‘লিপস্টিক ইফেক্ট’?

মাসের শেষ। খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে মাথায় হাত। বাজারের দাম বেড়েছে, বাড়িভাড়া বেড়েছে, সঞ্চয়ও ঠিকমতো হচ্ছে না। তবু অফিসে যাওয়ার পথে ৪০০ টাকার এক কাপ কফি, প্রিয় ব্র্যান্ডের একটি লিপস্টিক, সুগন্ধি মোমবাতি বা দামি চকলেট কিনতে মন চাইছে।

এমনটা কি শুধু আপনার সঙ্গেই হয়?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মোটেও না। অর্থনৈতিক চাপের সময় ছোট ছোট বিলাসিতার প্রতি মানুষের এই আকর্ষণের একটি নামও আছে—‘লিপস্টিক ইফেক্ট’।

কী এই ‘লিপস্টিক ইফেক্ট’?

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দার সময় একটি মজার বিষয় নজরে আসে প্রসাধনী প্রতিষ্ঠান এস্তে লডার-এর তৎকালীন চেয়ারম্যান লিওনার্ড লডার-এর।

তিনি দেখেন, দামি ব্যাগ, কোট বা বিলাসী পণ্যের বিক্রি কমলেও লিপস্টিকের বিক্রি কমছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা বেড়েই চলেছে।

সেখান থেকেই আসে ‘লিপস্টিক ইফেক্ট’ ধারণা। অর্থাৎ, বড় বিলাসিতা কেনার সামর্থ্য না থাকলে মানুষ তুলনামূলক কম দামের বিলাসী পণ্য কিনে নিজেকে একটু ভালো রাখার চেষ্টা করে।

আজ এই ধারণা শুধু লিপস্টিকে সীমাবদ্ধ নয়। দামি কফি, বিশেষ ধরনের চা, সুগন্ধি, প্রসাধনী, মোমবাতি, এমনকি ছোট ছোট ফ্যাশন অনুষঙ্গও একই প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কেন এমন হয়?

অর্থনৈতিক সংকটে মানুষ প্রথমেই বড় খরচ কমিয়ে দেয়। নতুন গাড়ি, বাড়ি, দামি মোবাইল বা বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। কিন্তু আনন্দ পাওয়ার ইচ্ছা তো আর হারিয়ে যায় না।

তাই অনেকেই বড় স্বপ্নের বদলে ছোট ছোট আনন্দ বেছে নেন। একটি প্রিয় কফি, পরিচিত ব্র্যান্ডের ছোট্ট একটি পণ্য বা নিজের জন্য কেনা সামান্য উপহার তখন মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়।

মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটি অনেকটা নিজের জন্য ছোট্ট একটি পুরস্কারের মতো কাজ করে।

গবেষণায় যা পাওয়া গেছে

২০২০ সালে গবেষক ম্যাকডোনাল্ড ও দিলদার যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেন, অর্থনৈতিক মন্দার সময় বিশেষ করে তরুণ নারীদের প্রসাধনী কেনার ব্যয় বেড়েছিল। একই সময়ে পোশাকের পেছনে ব্যয় কিছুটা কমেছে।

অর্থাৎ, মানুষ খরচ বন্ধ করেনি; বরং বড় কেনাকাটার পরিবর্তে ছোট বিলাসিতার দিকে ঝুঁকেছে।

এর আগে ২০১২ সালে গবেষক হিল ও তার সহকর্মীদের গবেষণায়ও দেখা যায়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় সৌন্দর্যচর্চার পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে। তবে এর কারণ নিয়ে এখনও গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।

কারও মতে, এটি কঠিন সময়ে নিজের প্রতি আস্থা ধরে রাখার চেষ্টা। আবার কেউ মনে করেন, অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ ছোট ছোট আনন্দ খুঁজে নিতে চায়।

শুধু মন্দার সময় নয়

একসময় ধারণা ছিল, অর্থনৈতিক সংকট কেটে গেলে এই প্রবণতাও কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।

ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি, বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অনিশ্চিত অর্থনীতির কারণে বড় কেনাকাটা এখন অনেকের কাছেই দূরের স্বপ্ন।

ফলে বিশেষ করে মিলেনিয়াল ও জেনারেশন জেড-এর মধ্যে ছোট ছোট বিলাসিতা এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠছে।

২০২৫ সালে গবেষক বাতামিরোভা ও থ্রাসু দেখিয়েছেন, এই দুই প্রজন্ম বড় বিলাসবহুল পণ্যের বদলে তুলনামূলক কম দামের কিন্তু পরিচিত ব্র্যান্ডের পণ্য কেনার দিকেই বেশি ঝুঁকছে।

ছোট খরচ, বড় স্বস্তি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ শুধু প্রয়োজনের জন্য কেনাকাটা করে না; অনেক সময় কেনাকাটা আবেগও নিয়ন্ত্রণ করে।

চাপ, উদ্বেগ বা অনিশ্চয়তার সময় নিজের জন্য কেনা ছোট্ট একটি জিনিস সাময়িকভাবে ভালো অনুভূতি তৈরি করতে পারে। এ কারণেই অর্থকষ্টের সময়ও অনেকেই ছোট ছোট বিলাসিতা ছাড়তে পারেন না।

তবে এই অভ্যাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে মাস শেষে অজান্তেই বড় অঙ্কের অর্থ খরচ হয়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শেষ কথা

অর্থনৈতিক চাপের সময় মানুষ বিলাসিতা পুরোপুরি ত্যাগ করে না, বরং তার ধরন বদলে ফেলে। হয়তো এখনই নতুন গাড়ি বা বাড়ি কেনা সম্ভব নয়। কিন্তু এক কাপ প্রিয় কফি, একটি লিপস্টিক, একটি সুগন্ধি মোমবাতি বা ছোট্ট কোনো পছন্দের জিনিস অনেকের কাছে কঠিন সময়ে একটু ভালো থাকার অনুভূতি এনে দেয়।

হয়তো এ কারণেই পকেটে টান থাকলেও ছোট ছোট বিলাসিতা থেকে মানুষ এত সহজে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না।