বিয়ের দাওয়াত পেয়েছেন। কিন্তু নিমন্ত্রণপত্রে আপনার সঙ্গে যাওয়ার মতো ‘প্লাস ওয়ান’ নেই। বন্ধুরা কেউ সঙ্গী নিয়ে আসবেন, কেউ স্বামী বা স্ত্রীকে নিয়ে। আর আপনাকে যেতে হবে একাই।
এমন পরিস্থিতিতে আনন্দের পাশাপাশি অস্বস্তি, একাকিত্ব কিংবা সামাজিক উদ্বেগ কাজ করাটা অস্বাভাবিক নয়। অনুষ্ঠানে গিয়ে কার সঙ্গে বসবেন, কাদের সঙ্গে কথা বলবেন, পরিচিত কেউ থাকবেন কিনা—এসব ভাবতে ভাবতেই মনে হতে পারে, ‘একাই না গেলেই কি ভালো হতো?’
তার ওপর চারপাশে যখন জোড়ায় জোড়ায় মানুষ, তখন নিজের একাকিত্বটাও যেন একটু বেশি চোখে পড়ে।
তবে সঙ্গী ছাড়া বিয়েতে যাওয়া মানেই পুরো সন্ধ্যা অস্বস্তিতে কাটানো নয়। বরং কিছু বিষয় মাথায় রাখলে একাই গিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করা, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া কিংবা পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দারুণ সময় কাটানো সম্ভব।
একইসঙ্গে খুশি ও মন খারাপ—দুটিই স্বাভাবিক
বন্ধুর বিয়ে দেখে আপনি সত্যিই খুশি। আবার একই সময়ে নিজের সম্পর্কের অবস্থা নিয়ে একটু মন খারাপও হতে পারে। বিয়ে নিয়ে আপনার নিজের দ্বিধা থাকতে পারে, ভবিষ্যৎ সঙ্গী নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে।
এসব অনুভূতি একসঙ্গে থাকা অস্বাভাবিক নয়।
মনোবিদদের মতে, নিজের অনুভূতিকে জোর করে চাপা দেওয়ার বদলে সেটি স্বীকার করাই ভালো। নিজেকে বলতে পারেন—‘হ্যাঁ, একা আসাটা আমার একটু খারাপ লাগছে। কিন্তু পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে, ভালো সময়ও কাটতে পারে।’
অর্থাৎ একটি অনুভূতি থাকলেই অন্য অনুভূতিটি মিথ্যা হয়ে যায় না
‘যেতেই হবে’ না ভেবে ‘সুযোগ’ হিসেবে দেখুন
বিয়েতে যাওয়াকে শুধু সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। বরং এটিকে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখতে পারেন।
যে দম্পতি আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, তাদের বন্ধুদের অনেকেই হয়তো আপনার জন্যও নতুন পরিচিত হতে পারেন। অনলাইন পরিচয়ের বাইরে সরাসরি মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্যও এমন অনুষ্ঠান বেশ স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করে।
অবশ্য বিয়েতে গিয়ে প্রেমের মানুষ খুঁজতেই হবে—এমন কোনও কথা নেই। নতুন বন্ধু পাওয়া, মজার কারও সঙ্গে পরিচিত হওয়া কিংবা কয়েকজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে গল্প করাও যথেষ্ট।
আগে থেকেই একজন পরিচিতকে খুঁজে নিন
অনুষ্ঠানে গিয়ে একেবারে একা হয়ে পড়ার ভয় থাকলে আগে থেকেই খোঁজ নিন, আপনার পরিচিত আর কে যাচ্ছেন।
খুব ঘনিষ্ঠ হতে হবে এমন নয়। পরিচিত একজনের সঙ্গে একসঙ্গে যাওয়া, অনুষ্ঠানে পাশাপাশি বসা কিংবা শুরুতে কয়েক মিনিট কথা বলাই অস্বস্তি অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে।
আর যদি কাউকেই না চেনেন? অনুষ্ঠানে খেয়াল করুন, আর কেউ একা দাঁড়িয়ে আছেন কিনা। তিনিও হয়তো আপনার মতোই কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগ খুঁজছেন।
কথা শুরু করার কয়েকটি প্রশ্ন মাথায় রাখুন
অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়—কী বলব?
এই চিন্তাতেই অনেকের অস্বস্তি বাড়ে। তাই কয়েকটি সহজ প্রশ্ন আগে থেকেই মাথায় রাখতে পারেন—
‘বর-কনের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে?’
‘আপনি কি এখানকার, নাকি বাইরে থেকে এসেছেন?’
‘এ বছর আর কোনও বিয়েতে গিয়েছেন?’
‘জায়গাটা কেমন লাগছে?’
প্রথম কথোপকথন দীর্ঘ করতেই হবে এমন নয়। লক্ষ্য শুধু বরফটা গলানো। এরপর কথা জমলে এমনিতেই এগোবে।
পোশাকের প্রশংসা দিয়েও শুরু হতে পারে আলাপ
কারও পোশাক, জুতা বা ব্যাগ সত্যিই ভালো লাগলে আন্তরিকভাবে প্রশংসা করতে পারেন।
‘আপনার পোশাকটা বেশ সুন্দর’—এরপর ‘কোথা থেকে নিয়েছেন?’—এমন একটি প্রশ্নই কথাবার্তার দরজা খুলে দিতে পারে।
তবে প্রশংসাটা যেন স্বাভাবিক ও আন্তরিক হয়। শুধু কথা বলার অজুহাতে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত মন্তব্য করলে পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে যেতে পারে।
ফোনে ডুবে থাকবেন না
অচেনা জায়গায় অস্বস্তি হলে ফোন বের করে স্ক্রল করতে ইচ্ছে করতেই পারে। ফোন তখন একধরনের ‘নিরাপদ আশ্রয়’ মনে হয়।
কিন্তু সারাক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলে অন্যরা আপনাকে ব্যস্ত বা অনাগ্রহী ভাবতে পারেন।
তাই মাঝে মাঝে ফোনটা সরিয়ে রাখুন। চারপাশে তাকান, চোখে চোখ পড়লে হালকা হাসি দিন। কে একা দাঁড়িয়ে আছেন, কার সঙ্গে কথা বলা যায়—খেয়াল করুন।
অনেক সময় নতুন আলাপের জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু দরকার হয় না।
ছবি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিন
বিয়েতে এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়—একদল বন্ধু ছবি তুলতে চাইছেন, কিন্তু ছবি তোলার জন্য কাউকে খুঁজছেন।
আপনি এগিয়ে গিয়ে বলতে পারেন, ‘ছবিটা তুলে দেব?’
ছোট্ট এই সাহায্যই আপনাকে একসঙ্গে কয়েকজন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।
ছবি তোলার পর সহজেই জানতে পারেন, ‘আপনারা সবাই কি কলেজের বন্ধু?’ তারপর গল্প নিজে থেকেই এগিয়ে যেতে পারে।
প্রতিটি কথোপকথন জমবে—এমন নয়
কোনও মানুষের সঙ্গে কথা জমল না? এতে বিব্রত হওয়ার কিছু নেই।
শুধু ভদ্রতা দেখাতে গিয়ে এমন কথোপকথন টেনে নেওয়ারও দরকার নেই, যেটি দুজনের কারও কাছেই স্বস্তিকর লাগছে না।
প্রয়োজনে সহজভাবে বলতে পারেন, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল, আমি একটু ওদিকে যাচ্ছি।’
তারপর অন্য কারও সঙ্গে কথা বলুন, খাবার নিন কিংবা কিছুক্ষণ নিজের মতো থাকুন।
একটি কথোপকথন ভালো না হলেই পুরো সন্ধ্যা নষ্ট হয়ে যায় না।
সবচেয়ে বড় কথা, আপনার ‘প্লাস ওয়ান’ না থাকলেও সমস্যা নেই
বিয়েতে একা যাওয়ার চাপটা অনেক সময় বাইরের চেয়ে নিজের মাথাতেই বেশি তৈরি হয়।
মনে হতে পারে, সবাই বুঝতে পারছে আপনি একা। বাস্তবে অধিকাংশ মানুষই হয়তো নিজেদের সঙ্গী, বন্ধু, খাবার আর অনুষ্ঠান নিয়েই ব্যস্ত।
তাই একা গিয়েছেন বলে নিজেকে আলাদা করে দেখার দরকার নেই।
আপনি চাইলে নতুন কারও সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে পারেন, নাচতে পারেন, ভালো খাবার খেতে পারেন। আবার ভালো না লাগলে কিছুক্ষণ পর বাড়িও ফিরে আসতে পারেন।
একটি বিয়েতে যাওয়ার জন্য সঙ্গী থাকা কোনও পূর্বশর্ত নয়।
হয়তো সেদিন নতুন একজন বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হবে। হয়তো মজার কোনও গল্প নিয়ে ফিরবেন। অথবা হয়তো শুধু ভালো খাবার খেয়ে, সুন্দর একটা সন্ধ্যা কাটিয়ে বাড়ি ফিরবেন।
সেটাও কিন্তু কম কিছু নয়।