একসময় এই শহরের বাতাসে মিশে থাকতো লাল মরিচের ঝাঁঝ, বাজারজুড়ে দেখা যেতো চোখধাঁধানো লাল রঙের ঢেউ। রোদে শুকাতে দেওয়া মরিচের স্তূপে ভরে উঠতো রাস্তা, আর কেনাবেচার ব্যস্ততায় প্রাণ ফিরে পেত পুরো শহর। কিন্তু এখন সেই চেনা দৃশ্যের আড়ালে জমছে উদ্বেগ। তীব্র তাপ, অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা আর খরার দাপটে পাকিস্তানের লাল মরিচের রাজধানী কুনরির কৃষকেরা যেন লড়ছেন প্রকৃতির সঙ্গেই।
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সিন্ধু প্রদেশে ভারতের সীমান্ত থেকে প্রায় ৭০ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত ছোট্ট শহর কুনরি। প্রায় ২৫ হাজার মানুষের এই শহরকে বলা হয় পাকিস্তানের ‘লাল মরিচের রাজধানী’। দেশের মোট লাল মরিচ উৎপাদনের ৮৫ শতাংশেরও বেশি আসে এই অঞ্চল থেকে। ফসল তোলার মৌসুমে তাই কুনরি আর নিরিবিলি থাকে না। মরিচের স্তূপ, ক্রেতা-বিক্রেতার দর-কষাকষি আর দিনমজুরদের ব্যস্ততায় বদলে যায় পুরো শহরের চেহারা।
বাজারের দিনে আট ফুটেরও বেশি উঁচু মরিচের স্তূপের পাশে চলে কেনাবেচা। সচ্ছল ক্রেতারা মোটরসাইকেলে চড়ে স্তূপের ফাঁক দিয়ে ঘুরে বেড়ান, আর দিনমজুরেরা পিঠে মরিচের ভার নিয়ে নুয়ে নুয়ে হাঁটেন। ফসল তোলার পর ওই বাজারে প্রতিদিন গড়ে ২০০ মেট্রিক টনের বেশি মরিচ বিক্রি হয়।
কিন্তু কুনরির এই লাল সাম্রাজ্যের ওপরই এখন নেমে এসেছে জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন অভিঘাত।
সম্প্রতি এক সকালে নিজের খেতে ঘুরছিলেন কৃষক আহসান আলী দারস। একসময় যে জমি সবুজে ভরে থাকতো, সেখানে এখন পুড়ে যাওয়া গাছ, শুকনো মাটি আর ফাঁকা জমির দৃশ্য। আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি অপেক্ষা করছিলেন মৌসুমি বৃষ্টির। কয়েক মাসের তীব্র গরমে দুর্বল হয়ে পড়া মরিচগাছগুলোর জন্য একটু বৃষ্টিই হয়তো স্বস্তি আনতে পারতো। কিন্তু আকাশে বৃষ্টির কোনও চিহ্ন ছিল না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাপমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা ছিল ১২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
পাকিস্তানের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান প্রায় এক-চতুর্থাংশ। দেশটির প্রায় অর্ধেক শ্রমশক্তিও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি পাকিস্তান। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় দেশটিতে প্রায় ৪৫ লাখ একর কৃষিজমি ধ্বংস হয়েছিল। সিন্ধু ও পাশের পাঞ্জাবের বহু কৃষক এখনও সেই ক্ষতির ধাক্কা সামলে উঠতে পারেননি।
লাল মরিচের চাষিদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। কখনও তাপপ্রবাহ, কখনও বন্যা, আবার কখনও দীর্ঘস্থায়ী খরা। আবহাওয়ার এই অনিশ্চয়তা ফসলের পাশাপাশি বদলে দিচ্ছে কৃষকদের চাষাবাদের কৌশলও।
কেউ কেউ এখন বীজ বোনার সময় এগিয়ে আনছেন, যাতে প্রচণ্ড গরম শুরু হওয়ার আগেই গাছ কিছুটা শক্ত হয়ে উঠতে পারে। আহসান আলী দারসও একসময় মে মাসের পরিবর্তে মার্চে বীজ বোনার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এ বছর মার্চের গরমই ছিল এত তীব্র যে সেই পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়। শেষ পর্যন্ত মে মাসে বীজ বুনতে হয় তাকে। ফলে গাছের বেড়ে ওঠার সময় কমে যায় এবং কোমল চারাগুলোকে আরও বেশি তাপের মুখোমুখি হতে হয়।
ফসল বাঁচিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টায় কৃষকেরা এখন আগের চেয়ে বেশি সার ব্যবহার করছেন। সেপ্টেম্বরের ফসল তোলার মৌসুম পর্যন্ত গাছগুলোকে টিকিয়ে রাখাই যেন বড় যুদ্ধ। কিন্তু একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে বৃষ্টির অনিশ্চয়তা কোনোটিই তাদের স্বস্তি দিচ্ছে না।
জুলাইয়ের শেষ দিকে অবশেষে দারসের খেতে মৌসুমি বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা নামে। কিন্তু স্বস্তির বদলে বৃষ্টি নিয়ে হাজির হয় নতুন ভয়। কারণ অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দারসের কথায়, “বৃষ্টি বেশি হলে ফসল নষ্ট হবে। আবার বৃষ্টি না হলেও সেটি ক্ষতিকর।”
মরিচ চাষের পাশাপাশি ফসল শুকানোও এখন বড় সমস্যা। সেপ্টেম্বরে ফসল তোলার পর কৃষকেরা মাটির ওপর মরিচ ছড়িয়ে প্রায় ১০ দিন ধরে রোদে শুকান। কিন্তু অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা বন্যার পানি এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। আর্দ্র মরিচে ছত্রাক ধরার আশঙ্কাও থাকে। ফলে মাঠে ভালো ফলন পাওয়ার পরও কৃষকের ঘরে পুরো ফসল পৌঁছায় না।
কুনরির ক্ষুদ্র কৃষকেরা বহু বছর ধরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মরিচ শুকানোর আধুনিক ব্যবস্থা চেয়ে আসছেন। স্থানীয় কর্মকর্তারাও সমস্যার গভীরতা স্বীকার করছেন। কুনরির জেলা কর্মকর্তা মুহাম্মদ খান জানান, মরিচ শুকানো ও প্রক্রিয়াজাত করার সময় মোট উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে রাতে নামা কুয়াশা ক্ষুদ্র জমির মালিকদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
বড় জমির মালিকেরা বাড়তি খরচ কিছুটা সামলাতে পারলেও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য পরিস্থিতি অনেক কঠিন। ক্রমবর্ধমান সার ও উৎপাদন খরচ, সেচের সংকট এবং অনিশ্চিত আবহাওয়ার সঙ্গে লড়তে গিয়ে অনেকেই এখন ফসলের ধরন বদলানোর চেষ্টা করছেন।
আহসান আলী দারসও সেই পথেই হাঁটছেন। এ বছর তার জমির চার একর জায়গায় ৮০০টি পেঁপের চারা লাগিয়েছেন তিনি। মরিচের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে নতুন ফসলের মাধ্যমে ঝুঁকি সামলানোর চেষ্টা করছেন। তবে ফসল বদলালেই যে প্রকৃতির রুদ্ররূপ থেকে রেহাই মিলবে, সে নিশ্চয়তাও নেই।
কুনরির গল্প তাই শুধু লাল মরিচের গল্প নয়। এটি এমন এক কৃষিজীবনের গল্প, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা অভিজ্ঞতাও এখন জলবায়ুর বদলে যাওয়া আচরণের সামনে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
যে শহরের বাতাস একসময় মরিচের ঝাঁঝে চোখে পানি এনে দিত, সেই শহরের কৃষকের চোখে এখন অন্য এক জল, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা।
আহসান আলী দারসের কথায় যেন সেই পুরো গল্পেরই সারাংশ মেলে, “মনে হচ্ছে, প্রকৃতি আর আমাদের পাশে নেই।”

যে শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে আছে বেনারসের ঘাটের গল্প






