সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বিছানায় গিয়েও চোখে ঘুম নেই। শরীর ক্লান্ত, অথচ মাথার ভেতর ঘুরছে নানা চিন্তা—কাজের চাপ, পারিবারিক বিষয়, আগামী দিনের পরিকল্পনা কিংবা পুরোনো কোনও ঘটনা। ঘুমানোর জন্য যত বেশি চেষ্টা করছেন, ততই যেন ঘুম দূরে সরে যাচ্ছে।
এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। ঘুমের জন্য শুধু মোবাইল দূরে রাখা বা রাতে ভারী খাবার এড়িয়ে চলাই যথেষ্ট নয়। মনোবিজ্ঞানী বেথ কুরল্যান্ডের মতে, ঘুমের আগে স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত ও নিরাপদ অবস্থার সংকেত দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমকে জোর করে আনা যায় না
ঘুমানোর সময় অনেকেই নিজের ওপর চাপ তৈরি করেন—‘এখনই ঘুমাতে হবে’, ‘আর কয়েক ঘণ্টা পরেই উঠতে হবে’, ‘আজও যদি ঘুম না হয়?’
এ ধরনের চাপ উল্টো শরীর ও মনকে আরও সতর্ক করে তুলতে পারে। তাই ঘুমকে কোনো পরীক্ষা বা অর্জনের বিষয় হিসেবে না দেখে প্রথমে শরীরকে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া জরুরি।
অর্থাৎ লক্ষ্যটা হতে পারে—‘আমাকে এখনই ঘুমাতেই হবে’ নয়, ‘আমি এখন শরীরকে বিশ্রাম নিতে দিচ্ছি।’
মনকে বিরতি দিতে হবে দিনের বেলাতেও
ঘুমের প্রস্তুতি আসলে রাতে বিছানায় যাওয়ার অনেক আগেই শুরু হতে পারে।
দিনের মধ্যে কয়েক মিনিটের ছোট বিরতি নেওয়া, প্রকৃতির দিকে তাকানো, সবুজ গাছপালা দেখা, কৃতজ্ঞতার বিষয়গুলো মনে করা কিংবা কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকা—এসব অভ্যাস মানসিক চাপ কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
দিনের ছোট ছোট বিরতিতে নিজেকে শান্ত হওয়ার সুযোগ দিলে রাতে বিশ্রামের অবস্থায় যাওয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
ধীর করুন শ্বাসের গতি
বিছানায় শুয়ে যদি মনে হয় শরীর টানটান হয়ে আছে, তাহলে ধীরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
নাক দিয়ে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিয়ে মুখ দিয়ে ধীরে ও দীর্ঘ সময় ধরে শ্বাস ছাড়ুন। শ্বাস ছাড়ার সময়টা শ্বাস নেওয়ার চেয়ে কিছুটা দীর্ঘ রাখতে পারেন।
এর উদ্দেশ্য হলো শরীরের উত্তেজনা কমিয়ে ধীরে ধীরে শান্ত অবস্থার দিকে যাওয়া।
শরীরের কোথাও টান আছে কিনা খেয়াল করুন
ঘুমানোর সময়ও শরীরের বিভিন্ন পেশি শক্ত হয়ে থাকতে পারে, অথচ আমরা তা টের পাই না।
এক্ষেত্রে পা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন পেশি কয়েক সেকেন্ডের জন্য হালকা শক্ত করে আবার ছেড়ে দিতে পারেন। এতে শরীরের টানটান ভাব সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং পেশিগুলো শিথিল করা সহজ হতে পারে।
আরেকটি উপায় হলো চোখ বন্ধ করে মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীরের বিভিন্ন অংশের দিকে মনোযোগ দেওয়া। কোথাও টান বা অস্বস্তি থাকলে সেটি জোর করে দূর করার চেষ্টা না করে ধীরে ধীরে শরীরটা ঢিলে করে দিন।
মাথার চিন্তাগুলো কালকের জন্য রেখে দিন
বিছানায় শুয়ে হঠাৎ মনে পড়ল—কাল একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। এরপর আরেকটি চিন্তা। তারপর আরেকটি।
এভাবে একের পর এক চিন্তা ঘুমকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
সহজ একটি কৌশল হলো, ঘুমানোর আগে মাথায় ঘুরতে থাকা কাজ বা সমস্যাগুলো কাগজে লিখে রাখা। চাইলে পরদিন কীভাবে বিষয়গুলো সামলাবেন, তার দু-একটি করণীয়ও লিখে রাখতে পারেন।
তারপর নিজেকে মনে করিয়ে দিন—‘এগুলো কাল ভাবব, এখন নয়।’
চিন্তা বারবার ফিরে এলে দিনের বেলায় আলাদা করে কয়েক মিনিট ‘চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের সময়’ রাখাও কাজে লাগতে পারে।
নিজের সঙ্গে কঠোর হবেন না
ঘুম না এলে নিজের ওপর বিরক্ত হওয়া খুব সহজ।
‘আমার ঘুমই আসে না’, ‘কাল সারাদিন নষ্ট হয়ে যাবে’, ‘আমার কিছুতেই ঠিক হয় না’—এ ধরনের চিন্তা উদ্বেগ আরও বাড়াতে পারে।
এর বদলে নিজের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতে পারেন, যেভাবে একজন ভালো বন্ধুকে বলতেন—‘আমি বুঝতে পারছি তুমি চিন্তিত। কিন্তু এখন বিশ্রামের সময়। সবকিছু আজ রাতেই সমাধান করতে হবে না।’
উদ্বেগের সঙ্গে লড়াই করার বদলে সেটিকে স্বীকার করে নিজের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হওয়াই বেশি কার্যকর হতে পারে।
মনে মনে চলে যান শান্ত কোনও জায়গায়
ঘুমের আগে কল্পনাশক্তিকেও কাজে লাগানো যায়।
চোখ বন্ধ করে এমন কোনও জায়গার কথা ভাবুন, যেখানে নিজেকে নিরাপদ ও শান্ত মনে হয়। হতে পারে গ্রামের বাড়ি, সমুদ্রের পাড়, কোনো নিরিবিলি বাগান কিংবা শৈশবের পরিচিত কোনো জায়গা।
শুধু জায়গাটির কথা ভাবলেই হবে না। সেখানে কী দেখছেন, কী শুনছেন, বাতাস কেমন—এসবও কল্পনা করতে পারেন। এতে মনকে বর্তমান উদ্বেগ থেকে সরিয়ে শান্ত অভিজ্ঞতার দিকে নেওয়া সহজ হতে পারে।
দুশ্চিন্তাগুলো কল্পিত বাক্সে তুলে রাখুন
আরেকটি সহজ কৌশল হলো নিজের দুশ্চিন্তাগুলো একটি কল্পিত বাক্সে রেখে দেওয়ার কথা ভাবা।
আজকের অসমাপ্ত কাজ, অফিসের সমস্যা কিংবা কারও সঙ্গে মনোমালিন্য—সবকিছু যেন একটি বাক্সে তুলে রাখলেন। এরপর বাক্সটির ঢাকনা বন্ধ করে দিলেন।
নিজেকে বললেন, ‘কাল সকালে আবার খুলব। এখন নয়।’
শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর উদ্দেশ্য হলো মস্তিষ্ককে বোঝানো—সমস্যাগুলো ভুলে যেতে হবে না, শুধু সাময়িকভাবে সরিয়ে রাখতে হবে।
ঘুমানোর জন্য নয়, বিশ্রামের জন্য বিছানায় যান
সব মিলিয়ে মূল কথাটি হলো—ঘুমকে জোর করে ডেকে আনার চেষ্টা না করে ঘুমের উপযোগী একটি মানসিক পরিবেশ তৈরি করা।
শরীরকে ধীরে ধীরে শান্ত করা, শ্বাসের গতি কমানো, পেশির টান কমানো, চিন্তাগুলো লিখে রাখা এবং নিজের সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলা—এসব অভ্যাস মন ও শরীরকে বিশ্রামের দিকে নিতে সাহায্য করতে পারে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা থাকলে শুধু এসব কৌশলের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসক বা ঘুম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কারণ ভালো ঘুমের শুরুটা অনেক সময় চোখ বন্ধ করার পর নয়—বরং নিজের মনকে এই বার্তা দেওয়ার মধ্যেই যে, এই মুহূর্তে তাকে আর কোনও যুদ্ধ করতে হবে না।









