আপনি ব্যথা পান, রং দেখেন, ভয় পান—কিন্তু কেন? উত্তরটা অবাক করবে

আমরা দেখি, শুনি, আনন্দ পাই, কষ্ট পাই, ভয় পাই, কোনোকিছু নিয়ে ভাবি। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে এতটাই স্বাভাবিক যে, সাধারণত এর পেছনের রহস্য নিয়ে ভাবি না। কিন্তু একটু থামলেই সামনে আসে কঠিন একটি প্রশ্ন—মস্তিষ্কের ভেতরে চলা বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত অনুভূতি কীভাবে তৈরি হয়?

ধরা যাক, আপনি লাল রং দেখছেন। চোখ সেই আলো গ্রহণ করছে, মস্তিষ্কে সংকেত পাঠাচ্ছে, নিউরন সক্রিয় হচ্ছে—এসব প্রক্রিয়া বিজ্ঞান দিয়ে অনেকটাই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কিন্তু আপনি যে ‘লাল’ দেখছেন, সেই ব্যক্তিগত অনুভূতিটা ঠিক কীভাবে তৈরি হলো?

ব্যথার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন। স্নায়ুর মাধ্যমে সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছায়, মস্তিষ্ক সেটি বিশ্লেষণ করে। কিন্তু ব্যথা যে ‘ব্যথার মতো’ অনুভূত হয়, সেই অভিজ্ঞতা কোথা থেকে আসে?

চেতনা নিয়ে বিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি এটাই। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তার অনেকটাই এখন বিজ্ঞানীদের জানা। কিন্তু মস্তিষ্কের কার্যক্রমের সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত অনুভূতির সম্পর্কটি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

চেতনা নিয়ে এত প্রশ্ন কেন?

চেতনা বলতে সাধারণভাবে বোঝায় নিজের অস্তিত্ব, অনুভূতি এবং চারপাশের জগত সম্পর্কে সচেতন থাকা। আপনি জানেন যে আপনি এই লেখা পড়ছেন, আপনার মনোযোগ কোথায় আছে, কোনও কথা আপনার ভালো লাগছে কিনা—এসবই চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

সমস্যা হলো, বাইরে থেকে একজন মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা গেলেও তার ভেতরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটি সরাসরি দেখা যায় না।

ধরুন, দুজন মানুষ একই সিনেমা দেখছেন। তাদের মস্তিষ্কে কিছুটা একই ধরনের কার্যক্রম হতে পারে। কিন্তু সিনেমার একটি দৃশ্য একজনকে আবেগপ্রবণ করল, অন্যজনকে করল না। অর্থাৎ একই ঘটনা ঘটলেও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে।

দার্শনিক ডেভিড চালমার্স চেতনার এই বিষয়টিকেই ‘কঠিন সমস্যা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। মস্তিষ্ক কীভাবে তথ্য গ্রহণ করে, সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে কিংবা শরীরকে পরিচালনা করে—এসব বোঝা এক বিষয়। কিন্তু এসব শারীরিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে কেন একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি যুক্ত হয়, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন।

চেতনা যদি কিছুই না করে?

এখানেই রহস্য আরও গভীর হয়।

ধরা যাক, মস্তিষ্কের প্রতিটি কাজের পেছনে একটি করে শারীরিক প্রক্রিয়া রয়েছে। নিউরন সক্রিয় হচ্ছে, কারণ তার আগে অন্য কিছু ঘটেছে। পেশি নড়ছে, কারণ মস্তিষ্ক থেকে সংকেত গেছে। আপনি কথা বলছেন, কারণ মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কার্যক্রম আপনার মুখ ও কণ্ঠকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

তাহলে চেতনা কী করছে?

একটি মত হলো, চেতনা হয়তো মস্তিষ্কের কার্যক্রমের সঙ্গে তৈরি হওয়া একটি অভিজ্ঞতা মাত্র। অর্থাৎ চেতনা নিজে আলাদাভাবে মস্তিষ্ককে কিছু করায় না।

কিন্তু এখানেই আবার প্রশ্ন আসে—চেতনার কোনও ভূমিকা না থাকলে আমরা চেতনা নিয়ে এত ভাবি কেন?

আমরা চেতনা নিয়ে বই লিখছি, গবেষণা করছি, তর্ক করছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা করছি। এমনকি চেতনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেও নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি করছি।

অর্থাৎ চেতনা নিয়ে আমাদের চিন্তা বাস্তব জগতে কোনও না কোনও প্রভাব ফেলছে। অন্তত আমাদের পর্যবেক্ষণ তেমনটাই বলছে।

চেতনা নিয়ে বিভ্রান্তিও কি গুরুত্বপূর্ণ?

মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক আলেকজান্ডার বাথিয়ানির লেখায় দার্শনিক ও কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানী আভাশালোম এলিটজুরের একটি যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

সহজ করে বললে, আমরা শুধু সচেতন নই, নিজেদের চেতনা নিয়েও প্রশ্ন করি।

আমি কেন ব্যথা অনুভব করছি? লাল রং দেখলে আমার যে অনুভূতি হয়, সেটি কী? মস্তিষ্কের কোষগুলো কীভাবে কাজ করে, তা জানা গেলেও ‘আমি অনুভব করছি’—এই অভিজ্ঞতাটি কীভাবে তৈরি হলো?

মানুষ এসব প্রশ্ন নিয়ে শুধু চিন্তাই করে না। সেই চিন্তা থেকে বই লেখে, গবেষণা করে, আলোচনা করে এবং বিতর্কে অংশ নেয়। ফলে চেতনা নিয়ে আমাদের বিস্ময় ও বিভ্রান্তিরও বাস্তব প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

এখানেই এলিটজুরের যুক্তি—চেতনা যদি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়, তাহলে চেতনা নিয়ে আমাদের এত চিন্তা ও আলোচনা কীভাবে তৈরি হচ্ছে?

তাহলে কি চেতনা মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। এটি কোনও প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং চেতনা নিয়ে চলমান দার্শনিক বিতর্কের একটি দিক।

একটি অবস্থান হলো, চেতনা মস্তিষ্কের কার্যক্রমের ফল। মস্তিষ্কের শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গেই আমাদের অনুভূতি ও চিন্তার সম্পর্ক রয়েছে। অপরদিকে প্রশ্ন উঠছে, আমাদের অনুভূতিগুলো তাহলে কি একেবারেই নিষ্ক্রিয়?

যদি ‘আমি ব্যথা পাচ্ছি’—এই অনুভূতি আমাকে চিকিৎসকের কাছে যেতে বাধ্য করে, তাহলে সেই অনুভূতিকে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক বলা কঠিন। তবে এর অর্থ এই নয় যে চেতনা মস্তিষ্কের বাইরে আলাদা কোনও শক্তি হিসেবে কাজ করছে। বিষয়টি এখনো বিতর্কের মধ্যেই রয়েছে।

দার্শনিক জম্বি হলে কী হতো?

চেতনার রহস্য বোঝাতে দর্শনে একটি পরিচিত চিন্তাপরীক্ষা রয়েছে—‘দার্শনিক জম্বি’।

ভাবুন, আপনার মতো দেখতে আরেকজন মানুষ আছে। তার মস্তিষ্ক, শরীর ও আচরণ সবকিছুই আপনার মতো। সে আপনার মতো কথা বলে, হাসে, কাঁদে, এমনকি ব্যথা পাওয়ার সময় ‘আহ’ও বলে।

কিন্তু পার্থক্য একটাই—তার ভেতরে কোনও ব্যক্তিগত অনুভূতি নেই।

সে ব্যথার কথা বলছে, কিন্তু সত্যিই ব্যথা অনুভব করছে না। সে লাল রং দেখার কথা বলছে, কিন্তু তার ভেতরে লাল দেখার কোনও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নেই।

এই কাল্পনিক চরিত্রকে বলা হয় ‘দার্শনিক জম্বি’। ডেভিড চালমার্সের চিন্তায় এমন একটি সত্তা কল্পনা করা সম্ভব কিনা, সেটিই চেতনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন তৈরি করে।

অবশ্য এর পাল্টা প্রশ্নও আছে। যদি সেই মানুষটি চেতনা নিয়ে আমাদের মতোই কথা বলে, তাহলে সে কি সত্যিই কিছু অনুভব করছে না? নাকি তার মস্তিষ্ক শুধু তথ্য প্রক্রিয়া করে সেই অনুযায়ী কথা বলছে?

এখানেই বিতর্ক আবার ফিরে আসে একই জায়গায়—তথ্য প্রক্রিয়া করা আর কোনও কিছু অনুভব করা কি একই ব্যাপার?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রশ্নটা আরও কঠিন

চেতনা নিয়ে পুরোনো এই প্রশ্ন এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

ধরুন, কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘তোমার কি ব্যথা লাগে?’

সে হয়তো উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, আমার ব্যথা লাগছে।’

কিন্তু সে সত্যিই ব্যথা অনুভব করছে, নাকি পরিস্থিতি অনুযায়ী একটি উপযুক্ত বাক্য তৈরি করছে—সেটা আমরা কীভাবে বুঝব?

মানুষের ক্ষেত্রেও আমরা অন্যের চেতনা সরাসরি দেখতে পাই না। তার আচরণ, কথা ও মস্তিষ্কের কার্যক্রম দেখে আমরা অনুমান করি যে সে অনুভব করছে।

তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি একদিন মানুষের মতো কথা বলে, অনুভূতির কথা বলে এবং নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন চেতনা নিয়ে পুরোনো বিতর্কই নতুনভাবে সামনে আসতে পারে।

তাহলে চেতনা আসলে কী?

এর সহজ কোনও উত্তর এখনো নেই।

মস্তিষ্ক কীভাবে তথ্য গ্রহণ করে, স্মৃতি তৈরি করে, মনোযোগ দেয় কিংবা আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে—এসব বিষয়ে বিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু মস্তিষ্কের এই কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যক্তিগত অনুভূতি কীভাবে যুক্ত হয়, সেই প্রশ্নের পুরো উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

তাই চেতনা মস্তিষ্কের বাইরে কোনও আলাদা শক্তি—এমন দাবি করার মতো প্রমাণ নেই। আবার ‘চেতনা নিছক একটি বিভ্রম’ বলেও পুরো বিষয়টি শেষ করে দেওয়া যায় না।

বরং বিজ্ঞান ও দর্শনের সামনে এখনো একটি বড় প্রশ্ন খোলা রয়েছে।

মস্তিষ্কের ভেতরে যতই বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া চলুক, সেগুলোর সঙ্গে ‘আমি অনুভব করছি’—এই অভিজ্ঞতাটি কীভাবে তৈরি হয়?

এই প্রশ্নের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো, প্রশ্নটি আমরাই করছি।

আমরা চেতনা নিয়ে ভাবছি, সেই ভাবনা লিখে রাখছি, অন্যকে বোঝাচ্ছি, তর্ক করছি, গবেষণা করছি। অর্থাৎ চেতনা সম্পর্কে আমাদের প্রশ্নগুলোই শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে দৃশ্যমান কিছু ‘ছাপ’ রেখে যাচ্ছে।

হয়তো এ কারণেই চেতনার রহস্য এত গভীর—চেতনাকে বুঝতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আমাদের চেতনাকেই ব্যবহার করতে হচ্ছে।