সব সময় পরিপাটি থাকতে হবে। দামি পোশাক পরতে হবে। ভালো রেস্তোরাঁয় খেতে হবে। সবাই যা করছে, সেটাই করতে হবে। নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে বিয়ে, সন্তান, বাড়ি—জীবনের প্রতিটি ধাপ যেন একটা নির্দিষ্ট ছকে এগোতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সামনে এমনই এক ‘নিখুঁত’ জীবনের ছবি তুলে ধরেছে।
কিন্তু সেই ধারণার মধ্যেই এখন একটু অন্যরকম এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘কাইন্ডা চিক’ কথাটি। সহজ করে বললে, যে কাজ বা অভ্যাসকে সাধারণত খুব একটা স্টাইলিশ বা আকর্ষণীয় মনে করা হয় না, সেটাকেই মজা করে ‘কাইন্ডা চিক’ বলা হচ্ছে। অর্থাৎ সাদামাটা কিছু করাও এক ধরনের স্টাইল—যদি সেটা নিজের মতো করে করতে পারেন।
শুনতে নিছক আরেকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চলতি বুলি মনে হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে নিজের জীবনকে অন্যের মাপকাঠিতে না মাপা, অগোছালো মুহূর্ত মেনে নেওয়া, নিজের জন্য সীমারেখা তৈরি করা এবং সামাজিক প্রত্যাশাকে প্রশ্ন করার মতো কিছু বিষয়ও আছে।
‘কাইন্ডা চিক’ মানে আসলে কী?
‘কাইন্ডা’ এসেছে ‘কাইন্ড অব’ থেকে, যার অর্থ অনেকটা ‘কিছুটা’ বা ‘এক ধরনের’। আর ‘চিক’ বলতে বোঝায় স্টাইলিশ বা রুচিশীল। দুই শব্দ একসঙ্গে ব্যবহার করে এমন কিছুকে বোঝানো হচ্ছে, যেটা প্রচলিত অর্থে খুব একটা স্টাইলিশ নয়, কিন্তু সেটাকেই মজা করে স্টাইলিশ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে।
যেমন—নিজের কাপড় নিজে ধোয়া, ঘরের ময়লা ফেলা, দাঁত পরিষ্কার করা কিংবা একটু আগে ঘুমাতে যাওয়া। এগুলো এমন কাজ, যেগুলোর মধ্যে বিশেষ কোনও চাকচিক্য নেই। কিন্তু ‘কাইন্ডা চিক’ প্রবণতা বলছে, এসবও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন তো আর পার্টি, দামি খাবার আর ঘুরে বেড়ানো সম্ভব নয়।
অর্থাৎ সাধারণ জীবনটাকেও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করাই এখানে এক ধরনের স্টাইল।
একটু অগোছালো হলেও সমস্যা নেই
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সবচেয়ে ভালো ছবিটাই আমরা সাধারণত দেখাই। চুল ঠিকঠাক, পোশাক পরিপাটি, ঘর গোছানো—সবকিছুতেই যেন নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা।
‘কাইন্ডা চিক’ প্রবণতা সেখানে একটু উল্টো পথে হাঁটে।
জামায় খাবার পড়ে গেছে? সমস্যা নেই। কোনও পানীয় গায়ে পড়ে গেছে? সেটাও চলবে। বেরি বা কোনও পানীয় খেয়ে দাঁত অদ্ভুত রঙের হয়ে গেছে? সেটা নিয়েও হাসা যায়। চুল একটু এলোমেলো? তাতেও পৃথিবী শেষ হয়ে যাচ্ছে না।
এর মধ্যে নিজের অগোছালো দিক নিয়ে হাসতে পারার একটা ব্যাপার আছে। কারণ বাস্তবে কেউই সবসময় গোছানো থাকেন না। তারকারাও ক্যামেরার বাইরে ক্লান্ত, অপ্রস্তুত বা এলোমেলো দেখাতে পারেন।
তাই সব সময় ‘দেখতে ভালো’ থাকার চাপটা একটু নামিয়ে রাখার সুযোগও তৈরি করছে এই প্রবণতা।
সবাই করছে, তাই আমাকেও করতে হবে—এমন নয়
‘কাইন্ডা চিক’ শুধু অগোছালো থাকা বা সাদামাটা কাজকে গ্রহণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের জন্য সীমারেখা তৈরি করাও এর একটি বড় অংশ।
ধরুন, কোনও অনুষ্ঠানে সবাই পান করছেন, কিন্তু আপনি পান করতে চান না। তাতে সমস্যা নেই। খাবারে কম লবণ চাইছেন, যদিও সেটা বলতে একটু বাড়তি ঝামেলা হবে—সেটাও ঠিক আছে। কোনও জনপ্রিয় মানুষ আপনার জন্য মানসিকভাবে ক্ষতিকর? তার কাছ থেকে দূরে থাকাও ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে।
অর্থাৎ অন্য সবাই কী করছে, সেটার সঙ্গে তাল মেলানোর চেয়ে নিজের শরীর ও মনের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।
সবাই করছে বলে আপনাকেও করতে হবে—এই চাপ থেকে একটু বেরিয়ে আসাই এখানে বড় কথা।
একা রেস্তোরাঁয় খাওয়াও ঠিক আছে
আমাদের সমাজে অনেক কিছু নিয়েই অলিখিত নিয়ম আছে। একা রেস্তোরাঁয় খাওয়া যেন একটু অদ্ভুত। বিয়ে না করলে প্রশ্ন। পছন্দের চাকরিটা খুব ‘কুল’ না হলে প্রশ্ন। সবাই নতুন কিছু কিনছে, আপনি কিনছেন না—সেটাও প্রশ্ন।
‘কাইন্ডা চিক’ এসব ধারণাকেও একটু উল্টে দিচ্ছে।
একা খেতে যেতে ভালো লাগে? যান। বিয়ে করতে এখনই ইচ্ছা করছে না? সেটাও আপনার সিদ্ধান্ত। সবাই নতুন ফোন কিনছে, কিন্তু আপনার পুরোনোটাই ভালো চলছে? তাহলে নতুন ফোন না কিনলেও হলো।
আপনার জীবনকে সবসময় অন্যের পছন্দের সঙ্গে মিলিয়ে চলতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।
বয়সেরও কি নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে?
এই প্রবণতার সবচেয়ে মজার দিকগুলোর একটি হলো বয়স নিয়ে সামাজিক প্রত্যাশাকে প্রশ্ন করা।
কত বয়সে বিয়ে করতে হবে, কখন সন্তান নিতে হবে, কখন বাড়ি কিনতে হবে, কোন বয়সে ক্যারিয়ারে কোথায় পৌঁছাতে হবে—এসব নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের নির্দিষ্ট সময়সূচি আছে।
ফলে কেউ সেই সময়সূচি অনুযায়ী এগোতে না পারলে মনে করতে পারেন, তিনি পিছিয়ে পড়েছেন।
‘কাইন্ডা চিক’ সেখানে বলছে, সবার জীবন এক সময়সূচিতে চলে না।
অভিনেত্রী ড্রু ব্যারিমোর তার পঞ্চাশের কোঠায় থাকাকে ‘কাইন্ডা চিক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। লেখাটিতে উদ্যোক্তা হওয়ার বয়স নিয়েও একই ধরনের সামাজিক ধারণার কথা বলা হয়েছে। যেমন, অনেকে মনে করেন ব্যবসা শুরু করার সেরা সময় ২০-এর কোঠা। অথচ হারল্যান্ড স্যান্ডার্স ষাটের কোঠায় গিয়ে কেএফসি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
অর্থাৎ ২৫ বছরে যা হয়নি, সেটা ৩৫-এ হতে পারে। ৩৫-এ না হলে ৪৫-এও হতে পারে।
জীবনের কোনও একটাই সঠিক সময়সূচি নেই।
শরীর নিয়ে লজ্জা নয়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সৌন্দর্যের মাপকাঠি নিয়েও প্রশ্ন তুলছে এই প্রবণতা।
কার শরীর কেমন, বয়সের ছাপ আছে কিনা, ত্বকে দাগ আছে কিনা—এসব নিয়ে মানুষ প্রতিনিয়ত তুলনার মধ্যে থাকেন। বিশেষ করে তারকা ও মডেলদের নিখুঁত ছবি দেখে নিজের স্বাভাবিক শরীরকেও অনেকের কাছে অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে।
‘কাইন্ডা চিক’ সেই জায়গায় বলছে, প্রচলিত সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে না পড়লেও নিজের শরীরকে গ্রহণ করা যায়।
মডেল অ্যাশলি গ্রাহাম নিজের শরীরের সেলুলাইট নিয়ে এমনই আত্মবিশ্বাসী অবস্থান তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ যেটাকে কেউ ‘খুঁত’ হিসেবে দেখতে পারেন, সেটাই আপনার শরীরের স্বাভাবিক অংশ।
তাহলে কি ‘নিখুঁত জীবন’ থেকে একটু বেরিয়ে আসা?
অনেকটাই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত জীবনের বাছাই করা অংশ দেখি। কারও ভ্রমণ, কারও সুন্দর বাড়ি, কারও দামি পোশাক, কারও সফলতা। কিন্তু সেই মানুষটির অগোছালো ঘর, খারাপ দিন কিংবা ব্যর্থতার গল্প আমরা সাধারণত দেখি না।
ফলে অন্যের সাজানো জীবন দেখে নিজের জীবনকে এলোমেলো মনে হতে পারে।
‘কাইন্ডা চিক’ সেই তুলনাটাকে একটু হালকা করে। বলে, ঘর অগোছালো হতে পারে। চুল ঠিকঠাক নাও থাকতে পারে। আপনি একা খেতে পারেন। কোনও অনুষ্ঠানে যেতে ইচ্ছা না করলে যেতে নাও পারেন।
জীবনকে সবসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবির মতো সুন্দর দেখাতে হবে না।
তবে এই প্রবণতারও সমস্যা আছে
সবাই যে ‘কাইন্ডা চিক’ শুনে খুশি হচ্ছেন, তা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ শব্দটির অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে বিরক্ত। কারও কাছে এটি কৃত্রিম কিংবা অতিরিক্ত ব্যবহার করা একটি চলতি বুলি।
আরেকটি সমস্যা হলো, এই শব্দটি কখনও কখনও আত্মপ্রচার বা পরোক্ষভাবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর কৌশল হয়ে উঠতে পারে।
যেমন, কেউ লিখলেন—‘অমুক অভিজাত এলাকায় বাড়ি থাকাও কাইন্ডা চিক।’ কিন্তু বাস্তবে সেটি এমন একটি জীবনযাপন, যা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তখন ‘কাইন্ডা চিক’ হয়ে উঠতে পারে এক ধরনের ভান করা বিনয়—অর্থাৎ নিজেকে বড় করে দেখিয়েও এমনভাবে বলা, যেন ব্যাপারটা খুব সাধারণ।
তাই প্রবণতাটির ভালো দিক যেমন আছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্য অনেক চলের মতো এটিও বাড়াবাড়ি বা আত্মপ্রচারের হাতিয়ার হতে পারে।
আসল কথা ট্রেন্ড নয়, নিজের মতো থাকা
‘কাইন্ডা চিক’ হয়তো কিছুদিন পর অন্য অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ডের মতোই হারিয়ে যাবে। নতুন কোনো শব্দ এসে এর জায়গা নেবে।
কিন্তু এর ভেতরের কথাটা থেকে যেতে পারে।
সবসময় নিখুঁত দেখাতে হবে না। অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে বিচার করতে হবে না। নিজের প্রয়োজনের জায়গায় ‘না’ বলা যায়। একা থাকা বা একা খাওয়ায় লজ্জার কিছু নেই। বয়স পেরিয়ে গেলেই কোনও সুযোগ শেষ হয়ে যায় না। আর নিজের শরীরকে ভালোবাসতে হলে প্রচলিত সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হওয়ারও দরকার নেই।
তবে এসব বিষয়কে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন বুলি হিসেবে ব্যবহার করলেই হবে না। নিজের জীবনে সত্যিই তা প্রয়োগ করতে পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত ‘কাইন্ডা চিক’ হয়তো কোনও ফ্যাশন নয়। বরং সবকিছু নিখুঁত না হলেও নিজের জীবনটাকে নিজের মতো করে গ্রহণ করার একটা মজার ভাষা।
আর হয়তো সেখানেই এর সবচেয়ে ভালো দিকটা—অন্যের চোখে কেমন লাগছি, তার চেয়ে নিজের জীবনে কেমন আছি, সেটাকে একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়া।









