‘পুলিশে ধরেছে’—ফেসবুকে হাতকড়া পরা ছবির ট্রেন্ড কতটা বিপজ্জনক?

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক  
২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮:২১আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮:২১

ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ছে অদ্ভুত এক দৃশ্য—কেউ পুলিশের হাতে হাতকড়া পরা, কাউকে আবার পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ দাঁড়িয়ে আছেন প্রিজন ভ্যানের সামনে। ছবিতে থাকা মানুষগুলোও অপরিচিত নন; বন্ধু, পরিচিতজন কিংবা নিজের পরিচিত মুখ। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, সত্যিই বুঝি গ্রেফতার হয়েছেন তারা। কিন্তু আসলে এসব ছবির বড় অংশই বাস্তব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এই প্রবণতা মূলত এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ফেস-সোয়াপের এক ধরনের মজার ট্রেন্ড।

ছবিগুলোতে নিজের মুখ বসিয়ে এমন দৃশ্য তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা তাকে হাতকড়া পরিয়ে গ্রেফতার করছেন বা প্রিজন ভ্যানে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে মজা করতে, কেউ সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যঙ্গ করতে এসব ছবি বানাচ্ছেন। ‘ম্যাজিক সোয়াপ পাজল’-এর মতো থার্ড-পার্টি ফেস-সোয়াপ অ্যাপ বা গেম ব্যবহার করেও এসব ছবি তৈরি করা যাচ্ছে।

মজার বিষয় হলো, প্রযুক্তির দিক থেকে ছবিগুলো তৈরি করা যত সহজ, সেগুলো দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তত বেশি। কারণ ছবিতে যদি পরিচিত কোনো মানুষকে পুলিশি হেফাজতে দেখা যায়, তখন অনেকেই ছবিটাকে আগে সত্যি ধরে নেন, পরে যাচাই করেন। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আগে শেয়ার, পরে যাচাই’ করার অভ্যাস থাকায় সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে বড় সমস্যা।

মজা থেকেই শুরু, কিন্তু শেষ কোথায়?

নিজের ছবি দিয়ে নিজেকেই ‘গ্রেফতার’ দেখিয়ে পোস্ট করা নিছক মজা হতে পারে। বন্ধুদের ট্যাগ করে হাসাহাসি, কোনও সামাজিক ঘটনা নিয়ে রসিকতা কিংবা রাজনৈতিক ব্যঙ্গ—এসবের মধ্যেই হয়তো ট্রেন্ডটির জনপ্রিয়তার বড় অংশ।

কিন্তু একই ছবি যখন অন্য কেউ ডাউনলোড করে নতুন ক্যাপশন দিয়ে পোস্ট করেন, তখন ছবিটির অর্থ বদলে যেতে পারে। যিনি প্রথম ছবিটি তৈরি করেছিলেন, তার পোস্টে হয়তো পরিষ্কার লেখা ছিল এটি কৃত্রিম ছবি। কিন্তু পরে সেই অংশ বাদ দিয়ে ছবিটি ছড়িয়ে পড়তে পারে এমনভাবে, যেন সত্যিই ওই ব্যক্তি পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন।

সমস্যাটা এখানেই—ছবি একই থাকে, বদলে যায় তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া গল্প।

পরিচিত কাউকে ‘আসামি বানিয়ে দিলে?

ধরুন, আপনার কোনও বন্ধু মজা করে নিজের ছবি দিয়ে হাতকড়া পরা একটি ছবি বানালেন। তিনি জানেন, ছবিটি কৃত্রিম। তার বন্ধুরাও জানেন। কিন্তু কয়েক দিন পর সেই ছবিই যদি অন্য কেউ নতুন ক্যাপশন দিয়ে পোস্ট করেন—‘অমুককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ’—তখন বিষয়টি আর নিছক মজা থাকে না।

বিশেষ করে পরিচিত ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন ছবি তার সামাজিক ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষ ছবিটি সত্যি মনে করে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারেন।

আর একবার কোনও পোস্ট ভাইরাল হয়ে গেলে পরে সেটি মিথ্যা বা কৃত্রিম বলে জানানো হলেও আগের বিভ্রান্তি পুরোপুরি দূর করা কঠিন।

এআইয়ের কারণে সমস্যা আরও জটিল

আগে ছবি সম্পাদনা করতে দক্ষতা বা বিশেষ সফটওয়্যার দরকার হতো। এখন এআইয়ের সাহায্যে কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েই বাস্তবের মতো ছবি তৈরি করা সম্ভব।

চলমান এই ট্রেন্ডেও অনেকে আগে এআই দিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতারের দৃশ্য তৈরি করছেন, পরে ফেস-সোয়াপের মাধ্যমে নিজের মুখ বসিয়ে নিচ্ছেন। ফলে ছবিটা যে কৃত্রিম, তা সবসময় খালি চোখে বোঝা সহজ নয়।

এখানেই এআই-নির্ভর ভুয়া তথ্যের বড় ঝুঁকি। একটা ছবি বাস্তবের মতো দেখতে হলেই সেটি বাস্তব—এমন ধারণা এখন আর নিরাপদ নয়।

নিজের ছবি কোথায় দিচ্ছেন, সেটাও ভাবুন

ট্রেন্ডে অংশ নেওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্যের নিরাপত্তা।

অনেকেই ফেসবুক পোস্টের নিচে থাকা ‘প্লে’, ‘ক্লিক টু প্লে’ বা এ ধরনের কোনও লিংকে গিয়ে তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ বা গেম ব্যবহার করছেন। এরপর নিজের একটি পরিষ্কার ছবি আপলোড করছেন। কিন্তু ছবিটি কোথায় সংরক্ষণ হচ্ছে, কে সেটি ব্যবহার করতে পারছে বা সেবাটির গোপনীয়তা নীতি কী—এসব বিষয় অনেকেই না দেখেই এগিয়ে যান।

চেহারা মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শুধু ‘একটা মজার ছবি বানাব’ ভেবে যেকোনও অচেনা অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে নিজের ছবি আপলোড করার আগে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও এই ধরনের থার্ড-পার্টি সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

আজ মজা, কাল হয়রানির হাতিয়ার

একটি ছবির সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, সেটি তৈরি করার উদ্দেশ্য আর পরে ব্যবহারের উদ্দেশ্য এক নাও হতে পারে।

আপনি হয়তো নিজের ছবি দিয়ে মজা করলেন। কিন্তু অন্য কেউ সেই ছবিটি ব্যবহার করে আপনাকে অপরাধী হিসেবে দেখাতে পারেন। ব্যক্তিগত শত্রুতা, অনলাইন হয়রানি কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধেও এ ধরনের কৃত্রিম ছবি ব্যবহার করা সম্ভব।

আর শুধু ছবি নয়, একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিডিওও তৈরি করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশি নির্যাতনের দৃশ্য দেখানো কৃত্রিম ভিডিওকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে ছড়ানোর ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে ভবিষ্যতে শুধু হাতকড়া পরা ছবি নয়, আরও বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া ভিডিও নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

ছবিটা দেখলেই বিশ্বাস করবেন না

ফেসবুকে কারও হাতকড়া পরা ছবি দেখলে প্রথমেই ধরে নেওয়া উচিত নয় যে তিনি সত্যিই গ্রেফতার হয়েছেন।

প্রথমে দেখুন, ছবিটির সঙ্গে কোনও নির্ভরযোগ্য সূত্র আছে কিনা। কোনও সংবাদমাধ্যমের খবরের দাবি করা হলে সেই সংবাদমাধ্যমের মূল ওয়েবসাইটে গিয়ে খবরটি খুঁজে দেখুন। অন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে একই ঘটনার খবর আছে কিনা, সেটাও যাচাই করতে পারেন।

ছবিটি পুরোনো কিনা, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো কোনও ছবি নতুন ঘটনা হিসেবে ছড়িয়ে পড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন কিছু নয়। আবার এআই দিয়ে তৈরি ছবি হলে ছবির সূক্ষ্ম অসঙ্গতিও খেয়াল করা যায়—হাত, আঙুল, পোশাকের লেখা, পুলিশের ব্যাজ কিংবা ছবির আলো-ছায়ায় অস্বাভাবিকতা আছে কিনা।

তবে এখনকার এআই ছবি অনেক নিখুঁত হওয়ায় শুধু চোখের ওপর নির্ভর না করে উৎস যাচাই করাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।

ট্রেন্ডে অংশ নেবেন? আগে দুটো কথা ভাবুন

নিজের ছবি দিয়ে মজার কোনও এআই ছবি তৈরি করা নিজে থেকেই অপরাধ বা বিপজ্জনক কিছু নয়। কিন্তু কোথায় ছবি দিচ্ছেন এবং পরে সেটি কীভাবে ব্যবহার হতে পারে—সেটা মাথায় রাখা দরকার।

বিশেষ করে অচেনা থার্ড-পার্টি অ্যাপে ছবি দেওয়ার আগে তার অনুমতি ও গোপনীয়তা নীতি দেখে নেওয়া ভালো। আর নিজের ছবি প্রকাশ্যে দিলে সেটি অন্য কেউ সংরক্ষণ বা পুনরায় ব্যবহার করতে পারে—এই সম্ভাবনাটাও মাথায় রাখা উচিত।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের ছবি দিয়ে মজা করা আর অন্যের ছবি দিয়ে তাকে অপরাধী সাজানো এক জিনিস নয়।

কারও অনুমতি ছাড়া তার মুখ বসিয়ে হাতকড়া পরা, পুলিশি হেফাজত বা অপরাধের দৃশ্য তৈরি করা নিছক মজা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। কারণ এতে ওই ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিগত জীবনে বাস্তব ক্ষতি হতে পারে।

ফেসবুকের ‘গ্রেফতার আসলে আমাদের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে?

এই ট্রেন্ডের মজার দিক আছে, অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজের ছবি দিয়ে অদ্ভুত সব দৃশ্য তৈরি করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বাভাবিক বিনোদনের অংশ হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এআইয়ের যুগে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা অন্য জায়গায়—এখন একটি ছবি দেখে ‘আমি তো নিজের চোখে দেখলাম’ বলা আর যথেষ্ট নয়।

কারণ চোখের সামনে দেখা ছবিটিও কৃত্রিম হতে পারে। আর সেই ছবির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া গল্পটাও হতে পারে পুরোপুরি বানানো।

তাই ফেসবুকে হঠাৎ কাউকে হাতকড়া পরা অবস্থায় দেখলে একবার থামুন। শেয়ার করার আগে ভাবুন, ছবিটি সত্যিই কী বলছে—আর ছবিটির সঙ্গে যে গল্পটা বলা হচ্ছে, সেটার কোনো প্রমাণ আছে কিনা।

মজা করতে গিয়ে নিজের ছবি কোথায় দিচ্ছেন, সেটাও দেখুন। আর অন্যের ছবি দেখলে বিশ্বাস করার আগে যাচাই করুন।

কারণ আজকের ‘পুলিশে ধরেছে’ পোস্টটা হয়তো নিছক হাসির ট্রেন্ড। কিন্তু ভুল হাতে পড়লে সেই একই ছবি কারও জন্য হয়ে উঠতে পারে বদনাম, বিভ্রান্তি কিংবা হয়রানির হাতিয়ার।

/এম/ 
সম্পর্কিত
অগোছালো থাকাটাই নাকি ট্রেন্ড! সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হচ্ছে ‘কাইন্ডা চিক’
বাড়ছে লোডশেডিং, হঠাৎ লিফট বন্ধ হয়ে গেলে কী করবেন?
বিয়ে পুরুষের জন্য ‘আশীর্বাদ’, নারীর জন্য কী?
সর্বশেষ খবর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নতুন দুই তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নতুন দুই তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ
শিশুর জন্য ফুটপাতে দুধ গরম করছিলেন গৃহহীন মা, মন্ত্রীর ধমকে তীব্র বিতর্ক
শিশুর জন্য ফুটপাতে দুধ গরম করছিলেন গৃহহীন মা, মন্ত্রীর ধমকে তীব্র বিতর্ক
অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ ও নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় সংসদীয় কমিটির নতুন উদ্যোগ
অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ ও নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় সংসদীয় কমিটির নতুন উদ্যোগ
খেলায় বিশেষ অতিথি না করায় ‘১৪৪ ধারা’ ঘোষণা করে মাইকিং, ছাত্রদল নেতাকে শোকজ
খেলায় বিশেষ অতিথি না করায় ‘১৪৪ ধারা’ ঘোষণা করে মাইকিং, ছাত্রদল নেতাকে শোকজ
সর্বাধিক পঠিত
নতুন দায়িত্বে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন 
নতুন দায়িত্বে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন 
খেজুর-শসার সূত্র ধরে চার খুনে জড়িতদের যেভাবে ধরলো পুলিশ
খেজুর-শসার সূত্র ধরে চার খুনে জড়িতদের যেভাবে ধরলো পুলিশ
১০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ব্যাংক কর্মকর্তারা, প্রতিবাদ জানাতে এসে অজ্ঞান ব্যবসায়ী
১০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ব্যাংক কর্মকর্তারা, প্রতিবাদ জানাতে এসে অজ্ঞান ব্যবসায়ী
রংপুরে শিক্ষক পরিবারের ৪ জনকে হত্যার রহস্য উদঘাটন, যা জানালো পুলিশ
রংপুরে শিক্ষক পরিবারের ৪ জনকে হত্যার রহস্য উদঘাটন, যা জানালো পুলিশ
ব্রাজিল খেলবে বাংলাদেশে? আজ আসছে প্রতিনিধি দল
ব্রাজিল খেলবে বাংলাদেশে? আজ আসছে প্রতিনিধি দল