সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেওয়া। কয়েক মিনিটের মধ্যে দেশের খবর, পৃথিবীর অন্য প্রান্তের যুদ্ধ, বন্ধুর নতুন চাকরি, কারও বিদেশ ভ্রমণ, কারও সংসারের সুখের ছবি, অফিসের মেসেজ—সব একসঙ্গে হাজির। এরপর শুরু হয় নিজের দিনের হিসাব। অফিসে কাজ আছে, বাসায় দায়িত্ব আছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। এর মধ্যে কোনও একটা খবর মাথায় আটকে যায়, কারও জীবন দেখে নিজের জীবনটাকেও একটু কম মনে হয়।
দিন শেষে হয়তো দেখা গেল, খুব বেশি কাজই করা হয়নি। তবু মনে হচ্ছে, সারাদিন যেন বিশাল একটা ভার বয়ে বেড়িয়েছেন।
কেন এমন হয়?
অনেক সময় আমরা ধরে নিই, এর কারণ কাজের চাপ। কিন্তু বিষয়টি শুধু কাজের পরিমাণের নয়। আধুনিক জীবনে আমাদের মস্তিষ্ককে এমন বিপুল পরিমাণ তথ্য, খবর, মানুষের জীবন আর সম্ভাব্য বিপদের মুখোমুখি হতে হয়, যার বেশিরভাগের সঙ্গে আমাদের সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই।
পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কী ঘটছে, অন্যরা কী করছে, কে কোথায় এগিয়ে যাচ্ছে—সবই মুহূর্তের মধ্যে আমাদের চোখের সামনে চলে আসে। ফলে নিজের জীবনের পাশাপাশি যেন গোটা পৃথিবীর একটা অংশও মাথায় নিয়ে চলতে হয়।
আমাদের মস্তিষ্ক কি এত কিছুর জন্য তৈরি?
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় বিষয়টিকে বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের মন এমন এক সময়ে গড়ে উঠেছে, যখন সামাজিক পরিসর ছিল অনেক ছোট। মানুষ তার চারপাশের সীমিতসংখ্যক মানুষের জীবন, আচরণ ও সমস্যার সঙ্গেই মূলত পরিচিত ছিল।
কিন্তু সেই পৃথিবী বদলে গেছে। এখন আমরা একই সঙ্গে অনেক বেশি মানুষের সঙ্গে যুক্ত। সারাক্ষণ খবর পাচ্ছি। এমন মানুষের জীবনও দেখছি, যাদের সঙ্গে বাস্তবে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। তাদের সাফল্য, ব্যর্থতা, চেহারা, সম্পদ, ভ্রমণ কিংবা জীবনযাপন—সবকিছুই আমাদের নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনার উপাদান হয়ে উঠছে।
অর্থাৎ, সমস্যা সবসময় এই নয় যে আমাদের জীবনে অনেক কিছু ঘটছে। কখনও কখনও সমস্যা হলো—আমরা একই সময়ে অনেক বেশি কিছু সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছি।
সবকিছুর দায়িত্ব কি আমার?
পৃথিবীর নানা সমস্যা নিয়ে আমরা জানতে পারি, চিন্তাও করি। কিন্তু কোনও বিষয় নিয়ে চিন্তা করা আর সেটি সমাধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়া এক নয়।
কাজেই সবকিছু অসহ্য লাগলে নিজেকে ‘আমি দুর্বল’ বলে দোষ দেওয়ার আগে একটু থামা যায়। নিজেকে প্রশ্ন করা যায়—আমি কি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিছু নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কয়েকটি ছোট পরিবর্তন কাজে আসতে পারে।
প্রথমত, সময়টাকে ছোট করুন। আগামী এক মাসে কী কী করতে হবে, একসঙ্গে ভাবলে চাপ বাড়তেই পারে। বরং নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—আজ আমার সবচেয়ে জরুরি কাজ কোনটি? আগামী মাসের সমস্যার সমাধান আজই করতে হবে না। এই মুহূর্তের প্রয়োজনীয় কাজটিতে মন দেওয়া অনেক বড় চাপকে ছোট করে আনে।
দ্বিতীয়ত, যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, তার দায়িত্বও নেবেন না। খবর জানুন, প্রয়োজন হলে উদ্বিগ্ন হন, নিজের জায়গা থেকে কিছু করার থাকলে করুন। কিন্তু পৃথিবীর প্রতিটি সমস্যার সমাধান আপনার দায়িত্ব নয়। কোন বিষয়ে আপনি সত্যিই কিছু করতে পারবেন আর কোনটি শুধু জানার বিষয়—এই পার্থক্যটা বোঝা জরুরি।
তৃতীয়ত, তুলনার লাগাম টানুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের চাকরি, বাড়ি, চেহারা, সন্তান, ভ্রমণ—প্রায় সবকিছুই দেখা যায়। ফলে নিজের জীবনটাকে অন্যের জীবনের সঙ্গে মেলানোর সুযোগ তৈরি হয় প্রতিদিন, প্রায় প্রতি মুহূর্তে।
কিন্তু এই তুলনার কোনও শেষ নেই। কারণ আপনি যখন কারও সাফল্যের সঙ্গে নিজের বর্তমান অবস্থার তুলনা করছেন, তখন তার জীবনের পুরো ছবিটা আপনি দেখছেন না। দেখছেন বেছে নেওয়া কিছু মুহূর্ত।
তাই মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার—অন্যদের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে আমি কি নিজের কাছে ‘যথেষ্ট’ হওয়ার সংজ্ঞাটাই বদলে ফেলছি?
নিজের জীবনের জন্যও একটু জায়গা রাখুন
ই-মেইল, খবর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা কাজ—কোনও কিছুরই যেন স্বাভাবিক শেষ নেই। কাজের সময় শেষ হলেও ফোনে আবার কাজ চলে আসে। একটি খবর পড়তে গিয়ে আরও দশটি খবর সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলে বের হওয়ারও কোনও নির্দিষ্ট সময় থাকে না।
তাই নিজের জন্য কিছু সীমা তৈরি করা জরুরি। কখন খবর দেখবেন, কখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দূরে থাকবেন, কাজ শেষ হওয়ার পর কোন সময়টা শুধু নিজের জন্য রাখবেন—এসবের একটা সীমা থাকা দরকার।
এর অর্থ পৃথিবী থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা নয়। বরং নিজের মনোযোগের ওপর একটু নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া।
কারণ আপনার মনোযোগও সীমিত। আপনি সবকিছু দেখতে পারেন, সবকিছু জানতে পারেন—কিন্তু সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দিতে পারেন না।
সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হবে না
সব খবর আজই জানতে হবে না। আগামী মাসের সব সমস্যার সমাধানও আজ করতে হবে না। অন্যরা কীভাবে জীবন কাটাচ্ছে, সেটাও প্রতিদিন মেপে নিজের জীবনকে বিচার করার দরকার নেই।
কখনও কখনও একটু স্বস্তি পাওয়ার জন্য জীবনে নতুন কিছু যোগ করার দরকার হয় না। বরং কিছু জিনিস সরিয়ে রাখাই যথেষ্ট—একটা অপ্রয়োজনীয় খবর, একটা অর্থহীন তুলনা, একটা উত্তর পরে দিলেও চলবে এমন মেসেজ, কিংবা এমন কোনও দায়িত্ব যা আসলে আপনার নয়।
হয়তো সবকিছু সামলানোর প্রথম ধাপই হলো—সবকিছু একসঙ্গে সামলানোর চেষ্টা বন্ধ করা।
পৃথিবীটা বড়ই থাকবে। খবর আসতেই থাকবে, অন্যরা এগোবে, নতুন সমস্যা তৈরি হবে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমাদের নেই।
কিন্তু সবকিছুকে নিজের ভেতরে ঢুকতে দিতে হবে কিনা—সেই সিদ্ধান্তটা এখনও আমাদের হাতে।
সবকিছু আপনার ভাবতে হবে না। সবকিছু আপনার করতে হবে না। আর সবকিছু একসঙ্গে সামলাতেও হবে না।
কখনও কখনও নিজের কাঁধটা একটু হালকা করাই সবচেয়ে জরুরি কাজ।