ফেসবুক খুললেই কারও বিদেশভ্রমণের ছবি, কারও নতুন চাকরির খবর, কারও সাফল্যের উদযাপন, আবার কারও সুখী পরিবারের মুহূর্ত। পরিচিতদের এমন সব পোস্ট দেখে কখনও কি মনে হয়েছে, সবার জীবন কত সুন্দর! শুধু নিজের জীবনেই যেন সমস্যা, ব্যর্থতা আর হতাশার শেষ নেই।
কিন্তু ফেসবুকে মানুষের জীবনের যে ছবি আমরা দেখি, সেটাই কি পুরো গল্প? নাকি জীবনের কিছু মুহূর্তই সেখানে জায়গা পায়, আর বাকিগুলো থেকে যায় আড়ালে?
সম্প্রতি মনোবিদ এলিয়েজার সোবারের একটি লেখায় উঠে এসেছে জীবনের বিব্রতকর ঘটনা, ব্যর্থতা ও প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতা আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতটা এড়িয়ে চলি।
ব্যর্থতার গল্পগুলো কোথায় যায়?
এলিয়েজার সোবার নিজের জীবনের কয়েকটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। স্কুলে পড়ার সময় পিৎজা পৌঁছে দেওয়ার চাকরি হারিয়েছিলেন তিনি। কলেজে বই বিক্রির জন্য ফোনে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের কাজেও এক দিনের বেশি টিকতে পারেননি। একবার এক ক্রেতার স্বামীর মৃত্যুর খবর শোনার পরও তাকে নির্ধারিত বিক্রির স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করতে বলা হয়েছিল। কাজটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানালে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছিলেন, তিনি জীবনে কখনও সফল হতে পারবেন না।
পরে হটডগ বিক্রি থেকে শুরু করে দোকানের নিরাপত্তাকর্মী—বিভিন্ন কাজ করেছেন সোবার। একসময় দুঃসাহসিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। সেখানে প্রশিক্ষণের সময় একটি নিরাপত্তাবেষ্টনীতে আটকে পড়ার ঘটনা বসকে মজার গল্প হিসেবে শোনান। কিন্তু পরদিনই চাকরি হারান।
এমন অভিজ্ঞতা মানুষের জীবনে ঘটতেই পারে। কিন্তু নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত সাফল্য, আনন্দ কিংবা অর্জনের মুহূর্তগুলোই বেছে নিই। ব্যর্থতা বা বিব্রতকর অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন।
সোবারের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো এই বৈপরীত্য সামনে আনে: আমরা নিজেদের জীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুই দিকই জানি, কিন্তু অন্যের জীবনের কেবল প্রকাশিত অংশটুকুই দেখি।
অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের তুলনা
ফেসবুকে কারও নতুন চাকরি, বিদেশভ্রমণ কিংবা ব্যক্তিগত অর্জনের খবর দেখে নিজের জীবনকে পিছিয়ে পড়া মনে হতে পারে। মনে হতে পারে, অন্যরা একের পর এক সাফল্য পাচ্ছেন, অথচ নিজের জীবন যেন একই জায়গায় আটকে আছে।
এই তুলনার বড় সমস্যা হলো, দুই পক্ষের অভিজ্ঞতা এখানে সমান নয়। নিজের জীবনের ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা, দুশ্চিন্তা ও হতাশার কথা আমাদের জানা। অন্যের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি তার বেছে নেওয়া কিছু মুহূর্ত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন নির্বাচিত উপস্থাপনাকে বাস্তব জীবনের সম্পূর্ণ চিত্র ধরে নিলে অন্যের জীবনকে নিজের চেয়ে অনেক বেশি সুখী বা সফল মনে হতে পারে। অথচ একটি সুন্দর ছবির পেছনে কী ঘটেছে, ছবির মানুষটি কী নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন কিংবা সাফল্যের পথে তাকে কতবার ব্যর্থ হতে হয়েছে—এসব ছবিটি দেখে বোঝার উপায় নেই।
ফলে নিজের বাস্তব জীবনের সঙ্গে অন্যের প্রকাশ করা মুহূর্তের তুলনা করে কেউ কেউ অকারণেই হতাশ হয়ে পড়তে পারেন।
সব কথা না বলাই কি ভণ্ডামি?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ঘটনা প্রকাশ করা কারও দায়িত্ব নয়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পারিবারিক পরিস্থিতি কিংবা নিজের মানসিক প্রস্তুতির কারণে কেউ ব্যর্থতার কথা না-ও বলতে পারেন। তাই সবকিছু প্রকাশ না করলেই কাউকে ভণ্ড বলা যায় না।
সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন আমরা অন্যের প্রকাশ করা সুখের মুহূর্তগুলোকে তার জীবনের সম্পূর্ণ চিত্র বলে ধরে নিই। কারও হাসিমুখের ছবি দেখে তার জীবনে কোনও দুঃখ নেই, কিংবা কারও সাফল্যের পোস্ট দেখে তার পথচলা সহজ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই।
একইভাবে, নিজের জীবনের কঠিন সময়কে অন্যের বেছে নেওয়া সুন্দর মুহূর্তের সঙ্গে তুলনা করলে নিজের প্রতি অসন্তুষ্টি বাড়তে পারে। মনে হতে পারে, অন্যরা সবাই এগিয়ে যাচ্ছেন, শুধু নিজেরই কিছু হচ্ছে না। অথচ বাস্তবে প্রত্যেকের জীবনেই এমন অনেক অভিজ্ঞতা থাকে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পায় না।
নিজের গল্পের সবটা দেখানো জরুরি নয়
ব্যর্থতা কিংবা কঠিন অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেওয়ারও মূল্য আছে। এতে অন্য কেউ বুঝতে পারেন, এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শুধু তাকেই যেতে হচ্ছে না। তবে সেই অভিজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত নিজের ইচ্ছা ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রত্যাশা পূরণের জন্য নয়।
ফেসবুকে ভালো সময়ের ছবি দেওয়া দোষের কিছু নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, অন্যের প্রকাশ করা জীবনকে নিজের জীবনের মানদণ্ড বানিয়ে না ফেলা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত মানুষের জীবনের নির্বাচিত অংশ দেখি, সম্পূর্ণ জীবন নয়।
পরেরবার ফেসবুকে কারও ঝলমলে জীবন দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে হলে একটু থামুন। আপনি হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটি দেখছেন, আর তুলনা করছেন নিজের এমন একটি দিনের সঙ্গে, যেদিন কিছুই ঠিকঠাক চলছে না।
মানুষের জীবন কয়েকটি ছবি, স্ট্যাটাস কিংবা সাফল্যের ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি প্রকাশিত মুহূর্তের বাইরেও থাকে অজস্র অপ্রকাশিত গল্প। সেই গল্পগুলোর কথা মনে রাখলে অন্যের জীবনকে যেমন বাস্তবভাবে দেখা যায়, তেমনি নিজের জীবনকেও আরও সহানুভূতির সঙ্গে গ্রহণ করা সম্ভব।