বিচ্ছেদ হলে মানুষের আত্মহত্যা প্রবণতা কাজ করে কেন

ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার হতাশা, গভীর মানসিক আঘাত এবং নিজের প্রতি ভালোবাসার অভাব; এই তিনটি বিষয় অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানীরা। রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইনসে কর্মরত কনস্টেবল মো. সাইদুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনায় তার ফেসবুকে দেওয়া শেষ পোস্টেও এমন মানসিক ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত মিলেছে।

রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইনস ভবন থেকে শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকালে ২১ বছর বয়সী কনস্টেবল মো. সাইদুল ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, হতাশা থেকে গলায় ফাঁস দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। পরে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

আত্মহত্যার আগে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দীর্ঘ একটি পোস্ট দেন সাইদুল। সেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার বেদনা প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘তোমায় কেন্দ্র করে আমি যে জগৎ সাজিয়ে গুছিয়ে গড়ে তুলেছিলাম... মানুষ আসলেই কি মানুষকে ভালোবাসে?’

আরেক অংশে তিনি লেখেন, ‘তোমারে ভালোবাসাটা অপরাধ? নাকি সব কিছু উপেক্ষা করে তোমাকে বিয়ে করাটা অপরাধ?... আমি হাজার বার সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু তুমি প্রতিবারই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছো মানুষকে এতটাও বিশ্বাস করতে হয় না। যে বিশ্বাস করলে নিজেই আর বাঁচার সুযোগ থাকে না।’

পোস্টের শেষ দিকে তিনি লেখেন, ‘বহুকাল বয়ে বেড়াতে হবে হৃদয় ভাঙা এই ব্যথা, হয়তো এই জন্মে আর সেরে উঠবে না মৃত্যু ছাড়া। তাই আমি সেই পথেই গেলাম।’ বাবা-মার উদ্দেশেও তিনি লেখেন, *‘দুঃখিত আম্মু-আব্বু আপনাদের ছেলে আর নিতে পারছে না।’

এর আগে একই ধরনের একটি আত্মহত্যার ঘটনার পর মানুষের এ ধরনের প্রবণতার পেছনের মানসিক কারণ নিয়ে বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছিলেন মনোবিজ্ঞানী মেহতাব খানম। তার সেই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সাইদুলের ফেসবুক পোস্টের বিষয়বস্তুর মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

মেহতাব খানম বলেছিলেন, অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার আগে মানুষ অন্যদের কিছু জানিয়ে যেতে চায়। কেউ টেক্সট করে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা দেয়। অনেক সময় এসব বার্তা দেখে তাকে বাঁচানো সম্ভব হলেও সব ক্ষেত্রে তা হয় না।

তিনি বলেন, ‘আত্মহত্যা যারা করে, তাদের বড় হওয়াটা যদি দেখা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে তাদের মধ্যে আসলে আত্মভালোবাসা ব্যাপারটা নেই। কোথাও একটা শূন্যতা কাজ করে। নিজেকে সে গ্রহণ করতে পারে না, ভালোবাসতে পারে না।’

তার ভাষ্য, নিজের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে মানুষ সহজেই নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। ‘নিজের প্রতি ভালোবাসাটা সবার মধ্যে থাকা প্রয়োজন। নিজেকে ভালোবাসলেই আরেকজনকে ভালোবাসা দেওয়া সম্ভব।’

প্রেম বা সম্পর্ক ভেঙে গেলে সবাই আত্মহত্যার কথা ভাবেন না। এ বিষয়ে মেহতাব খানমের ব্যাখ্যা, ‘যখন মানুষ আত্মহত্যার চিন্তা করে, তখন অনেকটা হঠাৎ করেই নিজেকে শেষ করে ফেলে। অনেকের এ ধরনের চিন্তা আগে থেকে আসে। তারা বিষয়টি অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করার পর অনেক সময় কাটিয়ে ওঠে। কিন্তু অনেকে সেই কাটিয়ে ওঠাটা হয়তো শেষ পর্যন্ত পারে না।’

পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, একজন মানুষের বেড়ে ওঠার সময়ে পরিবারের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক না থাকলে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে। তার ভাষায়, ‘একটি জাহাজ যদি ঝড়ের সময় নোঙর ফেলে না রাখে, তাহলে তো সে ভেসে যাবে।’ তাই শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।