কাজের সুবিধার জন্য এখন অনেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) টুল ব্যবহার করছেন। কেউ প্রতিবেদন লিখতে, কেউ প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে, আবার কেউ তথ্য বিশ্লেষণে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছেন। তবে অনেকেই বিষয়টি সহকর্মীদের জানাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, এআই ব্যবহার গোপন রাখার চেয়ে দলের সবার সামনে ব্যবহার করলে সহযোগিতা, আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান আরও উন্নত হতে পারে।
একই এআই, কিন্তু দুই দলের ফল ভিন্ন
সম্প্রতি নিউক্যাসেল ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে দুটি ধরনের দল গঠন করা হয়।
প্রথম দলের সদস্যরা আলাদাভাবে এআই ব্যবহার করে নিজেদের মতো উত্তর তৈরি করেন। পরে সেটি নিজেদের কাজ হিসেবে দলের সামনে উপস্থাপন করেন।
অন্য দলটি একটি শেয়ার করা পর্দায় একসঙ্গে এআই ব্যবহার করে। কী প্রশ্ন করা হবে, কোন উত্তর গ্রহণ করা হবে এবং কোনটি বাদ দেওয়া হবে—সব সিদ্ধান্তই নেওয়া হয় যৌথভাবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, একই প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও দুই দলের সহযোগিতার ধরন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
গোপনে এআই ব্যবহার করলে কী হয়?
গবেষকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় অনেক শিক্ষার্থী জানান, তারা আগে থেকেই এআই দিয়ে কাজ তৈরি করে সেটি নিজের ভাষায় সাজিয়ে দলের সামনে উপস্থাপন করতেন। অনেক ক্ষেত্রেই অন্য সদস্যরা জানতেন না, কাজটির কতটা অংশ এআই তৈরি করেছে। এর ফলে দুটি সমস্যা দেখা দেয়।
প্রথমত, এআইয়ের দেওয়া তথ্য বা ধারণা নিয়ে সমালোচনামূলক আলোচনা করার সুযোগ কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, যে সদস্য আগে থেকেই এআই ব্যবহার করে প্রস্তুতি নিতেন, তিনিই আলোচনায় বেশি প্রভাব বিস্তার করতেন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সবার সামনে এআই ব্যবহার করলে কী বদলায়?
গবেষণায় দেখা গেছে, সবাই মিলে এআই ব্যবহার করলে সেটি শুধু একটি সফটওয়্যার নয়, বরং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
দলের সদস্যরা একসঙ্গে প্রশ্ন তৈরি করেন, এআইয়ের উত্তর বিশ্লেষণ করেন, তা নিয়ে বিতর্ক করেন এবং কোন তথ্য গ্রহণ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত যৌথভাবে নেন। ফলে সবাই একই তথ্যের ভিত্তিতে মতামত দেওয়ার সুযোগ পান।
গবেষকদের ভাষায়, এআই তখন এক ধরনের 'যৌথ স্মৃতিভান্ডার' হিসেবেও কাজ করে। আগের উত্তর, সিদ্ধান্ত ও ধারণা পরে আবার দেখা, যাচাই বা সংশোধন করা সহজ হয়।
অন্ধ বিশ্বাসও ঝুঁকিপূর্ণ
তবে গবেষণাটি আরেকটি বিষয়েও সতর্ক করেছে।
সব দল সমানভাবে সমালোচনামূলক ছিল না। কিছু ক্ষেত্রে সদস্যরা এআইয়ের উত্তর যাচাই না করেই গ্রহণ করেছেন।
গবেষকদের মতে, এআইকে সহকর্মীর মতো ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু এর প্রতিটি উত্তরকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। বরং তথ্য যাচাই, প্রশ্ন করা এবং প্রয়োজনে ভুল ধরিয়ে দেওয়াই কার্যকর দলগত কাজের অংশ।
পার্থক্য প্রযুক্তিতে নয়, ব্যবহারের ধরনে
বিশেষজ্ঞদের মতে, একই এআই টুল ব্যবহার করলেও ফল নির্ভর করে সেটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।
যদি একজন সদস্য গোপনে এআই ব্যবহার করে প্রস্তুত উত্তর নিয়ে আসেন, তাহলে দল শেখা ও যৌথভাবে চিন্তা করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারায়।
অপরদিকে, এআই ব্যবহার যদি স্বচ্ছভাবে সবার সামনে হয়, তাহলে নতুন ধারণা তৈরি, তথ্য যাচাই এবং আরও ভালো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ হয়।
শেষ কথা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা। তবে গবেষণা বলছে, এর সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু দ্রুত উত্তর দেওয়ায় নয়; বরং মানুষকে একসঙ্গে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং আরও ভালো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়তা করার মধ্যে।
অর্থাৎ, অফিসে এআই ব্যবহার করছেন কিনা, সেটাই মূল প্রশ্ন নয়। বরং এটি গোপনে ব্যবহার করছেন, নাকি সহকর্মীদের সঙ্গে স্বচ্ছভাবে ব্যবহার করছেন—ভবিষ্যতের কর্মসংস্কৃতিতে সেই পার্থক্যই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।