কলেজে পড়ার সময় হুয়ান রিভেরা বুঝতে পারলেন, একসময় যে বিষয়গুলো তাকে আনন্দ দিতো, সেগুলো আর আগের মতো ভালো লাগছে না। বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যেতেন, কিন্তু মন থেকে উপভোগ করতে পারতেন না। অনেক সময় নিজেকে অনুভূতিহীন ও বিচ্ছিন্ন মনে হতো। আর খারাপ দিনগুলোতে বিছানা থেকে ওঠার মতো শক্তিও পেতেন না।
সমস্যাটি নিয়ে তিনি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান। চিকিৎসক তাকে মূল্যায়ন করে বিষণ্নতা শনাক্ত করেন এবং অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ দেন। কিন্তু ওষুধে কাজ হলো না। পরবর্তী কয়েক বছরে আরও কয়েক ধরনের অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি পাননি রিভেরা।
এখন ৩৫ বছর বয়সী রিভেরা মিয়ামিতে অভিবাসন আইনজীবী হিসাবে কাজ করেন। তার মতো এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের ক্ষেত্রে প্রচলিত চিকিৎসা নেওয়ার পরও বিষণ্নতার উপসর্গ পুরোপুরি কমে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে বলা হয় ‘ট্রিটমেন্ট-রেজিস্ট্যান্ট ডিপ্রেশন’ বা চিকিৎসায় প্রতিরোধী বিষণ্নতা।
ইয়েল ডিপ্রেশন রিসার্চ প্রোগ্রামের পরিচালক ডা. জেরার্ড সানাকোরার মতে, এ অবস্থার সর্বজনস্বীকৃত কোনও একক সংজ্ঞা নেই। তবে অনেক চিকিৎসক মনে করেন, পরপর দুটি ভিন্ন অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট চার থেকে ছয় সপ্তাহ করে ব্যবহার করার পরও যদি বিষণ্নতার উপসর্গে অন্তত ৫০ শতাংশ উন্নতি না হয়, তাহলে সেটিকে চিকিৎসায় প্রতিরোধী বিষণ্নতা বলা যেতে পারে।
তবে নামটি যতটা ভয়ংকর শোনায়, বাস্তবতা ততটা হতাশাজনক নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসায় প্রতিরোধী বিষণ্নতাও ভালো হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক চিকিৎসা-পদ্ধতির সমন্বয়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।
বিষণ্নতার চিকিৎসায় সাড়া না পাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
ডা. ডেব্রা কান বলেন, শৈশবে মানসিক আঘাত বা ট্রমার অভিজ্ঞতা থাকলে পরবর্তী জীবনে বিষণ্নতার চিকিৎসা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া বিষণ্নতার সঙ্গে যদি উদ্বেগ, কিছু ভিটামিনের ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, হৃদ্রোগ কিংবা স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকে, তাহলেও চিকিৎসায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি পেতে সমস্যা হতে পারে। কারণ এসব অবস্থার অনেকগুলোর উপসর্গ যেমন ক্লান্তি, অবসাদ বা ঘুমের সমস্যা বিষণ্নতার উপসর্গের সঙ্গে মিলে যায়।
জিনগত পার্থক্যও ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনিদ্রার জিনগত প্রবণতা এবং কিছু ধরনের নিউরোটিসিজম চিকিৎসায় প্রতিরোধী বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এর পাশাপাশি রোগীর নিজের প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কয়েক ধরনের ওষুধ ব্যবহার করেও যখন কেউ ভালো ফল পান না, তখন পরবর্তী চিকিৎসা নিয়েও তার প্রত্যাশা কমে যাওয়া স্বাভাবিক।
যুক্তরাষ্ট্রে বিষণ্নতার চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আনুমানিক ৩১ শতাংশ চিকিৎসায় প্রতিরোধী বিষণ্নতায় আক্রান্ত বলে ২০২১ সালের একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
চিকিৎসায় প্রতিরোধী বিষণ্নতার জন্য কোনও একক চিকিৎসা নেই। রোগীর অবস্থা, আগের চিকিৎসার ফল এবং অন্যান্য শারীরিক বা মানসিক সমস্যা বিবেচনা করে চিকিৎসার পদ্ধতি ঠিক করা হয়।
কোনও রোগী পরপর দুটি অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট এবং সাইকোথেরাপি নেওয়ার পরও উন্নতি না করলে চিকিৎসকেরা কখনো কখনো মূল ওষুধের সঙ্গে অতিরিক্ত একটি ওষুধ যোগ করেন। এর মধ্যে অ্যাটিপিক্যাল অ্যান্টিসাইকোটিক বা লিথিয়াম থাকতে পারে।
একই সঙ্গে বিষণ্নতার উপসর্গের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে এমন অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও খুঁজে দেখা হয়।
ওষুধে যথেষ্ট সাড়া না পাওয়া রোগীদের জন্য আরেকটি চিকিৎসা-পদ্ধতি হলো ট্রান্সক্র্যানিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন বা টিএমএস।
এতে চৌম্বকীয় পালস ব্যবহার করে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশকে উদ্দীপিত করা হয়। এর ফলে মেজাজ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে এবং বিষণ্নতার উপসর্গ কমতে পারে।
টিএমএস সাধারণত ভালোভাবে সহ্য করা যায়। মাথাব্যথা বা মাথার ত্বকে অস্বস্তির মতো কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে, তবে গুরুতর দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণ নয়।
২০২৩ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে ১৯টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের সঙ্গে টিএমএস নেওয়া রোগীদের রেমিশন বা উপসর্গ থেকে উল্লেখযোগ্য মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা শাম টিএমএস নেওয়া রোগীদের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৮ গুণ বেশি ছিল।
চিকিৎসায় প্রতিরোধী বিষণ্নতার ক্ষেত্রে কেটামিন নিয়েও গবেষণা ও চিকিৎসা ব্যবহারে আগ্রহ বেড়েছে। কেটামিন মূলত অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত একটি অ্যানেস্থেটিক।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ স্প্রাভাটো, অর্থাৎ নাকের মাধ্যমে ব্যবহৃত এসকেটামিন স্প্রে, ট্রিটমেন্ট-রেজিস্ট্যান্ট ডিপ্রেশনের চিকিৎসায় অনুমোদন করে।
২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের সঙ্গে এসকেটামিন ব্যবহার করা রোগীদের মধ্যে ২৮ দিন পর প্রায় ৫২ দশমিক ৫ শতাংশের উপসর্গে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছিল। একই সময়ে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের সঙ্গে প্লাসিবো নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ৩১ শতাংশ।
কেটামিন কীভাবে কাজ করে, তার পুরো প্রক্রিয়া এখনো গবেষণাধীন। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি মস্তিষ্কের মেজাজ ও চিন্তাভাবনার সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্কে নতুন বা শক্তিশালী স্নায়বিক সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এই কারণেই সাইলোসাইবিন, আইবোগেইন ও ৫-মেথক্সি-ডিএমটি-এর মতো কিছু সাইকেডেলিক পদার্থ নিয়েও সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসেবে গবেষণা চলছে।
বহু বছর ধরে বিভিন্ন অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ব্যবহারের পর রিভেরা সম্প্রতি নাকের মাধ্যমে ব্যবহৃত স্প্রাভাটো শুরু করেন।
তিনি জানান, দ্বিতীয় সেশনের পরই নিজের মধ্যে পরিবর্তন অনুভব করতে শুরু করেন। তার মনে হচ্ছিল, চিন্তা ও মেজাজের ওপর দীর্ঘদিন ধরে থাকা একটি ‘নেতিবাচক ফিল্টার’ যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
চিকিৎসায় প্রতিরোধী বিষণ্নতার ক্ষেত্রে একটি মাত্র ‘ম্যাজিক পিল’ সমস্যার সমাধান করবে এমনটা আশা করা ঠিক নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
অনেকের ক্ষেত্রে ওষুধ, সাইকোথেরাপি, টিএমএস কিংবা এসকেটামিনের মতো চিকিৎসার সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি জীবনযাপনেও পরিবর্তন আনতে হয়।
ডা. সানাকোরা রোগীদের প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন, সামনে আসা সপ্তাহান্তে তারা কী করার পরিকল্পনা করছেন। এর মাধ্যমে তিনি বোঝার চেষ্টা করেন, রোগী সক্রিয় থাকছেন কি না এবং আনন্দদায়ক বা অর্থপূর্ণ কাজে নিজেকে যুক্ত করছেন কি না।
তার বক্তব্যের সারকথা হলো, শুধু ওষুধ খেলেই সবসময় যথেষ্ট হয় না। শারীরিক ও সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং আনন্দ দেয় এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসায় প্রতিরোধী বিষণ্নতা কঠিন হতে পারে, কিন্তু তার মানে আশাহীন নয়।