প্রচণ্ড গরমে বয়স্কদের জন্য বাড়তি সাবধানতা কেন জরুরি

গরমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সবার শরীরেই বাড়ে চাপ। তবে একই তাপমাত্রায় ঝুঁকিটা সবার জন্য সমান নয়। বিশেষ করে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ অতিরিক্ত গরমে হিট এক্সহস্টশন, পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকসহ নানা জটিলতায় বেশি আক্রান্ত হতে পারেন। তীব্র গরমে বয়স বাড়ার সঙ্গে কমে যায় শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা। হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০০০-২০০৪ থেকে ২০১৭-২০২১ সময়কালে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে তাপজনিত মৃত্যুর হার প্রায় ৮৫ শতাংশ বেড়েছে।

গরম এখন শুধু অস্বস্তির বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত তাপ শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে হিট এক্সহস্টশন থেকে শুরু করে জীবন-সংশয়ী হিটস্ট্রোক পর্যন্ত হতে পারে। একই সঙ্গে হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি, শ্বাসতন্ত্র ও ডায়াবেটিসের মতো আগে থেকে থাকা রোগও তীব্র গরমে আরও খারাপ হতে পারে।

বয়স বাড়লে কেন ঝুঁকি বেশি?

তরুণ বয়সের তুলনায় বয়স্কদের শরীর তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনামূলক কম মানিয়ে নিতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের ঘাম তৈরি ও তাপ বের করে দেওয়ার সক্ষমতা কমতে পারে। একই সঙ্গে তৃষ্ণার অনুভূতিও কমে যেতে পারে। ফলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হলেও অনেক সময় তা দ্রুত বোঝা যায় না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগ। হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বা মানসিক স্বাস্থ্যের কিছু সমস্যা থাকলে অতিরিক্ত গরমের প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।

ওষুধেও বাড়তে পারে তাপের ঝুঁকি

অনেক বয়স্ক মানুষ নিয়মিত একাধিক ওষুধ সেবন করেন। কিছু ওষুধ শরীরের ঘাম তৈরি, রক্তচাপ, তৃষ্ণার অনুভূতি বা শরীরে পানির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে গরমে পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা শরীর ঠান্ডা রাখার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তবে গরমের কারণে নিজে থেকে কোনো ওষুধ বন্ধ বা কমানো উচিত নয়। নিয়মিত ওষুধ সেবনকারী ব্যক্তির গরমের সময়ে পানি বা তরল গ্রহণের পরিমাণ কিংবা ওষুধ নিয়ে কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন কি না, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।

কীভাবে নিরাপদ রাখবেন বয়স্কদের?

গরমের সময়ে কিছু সহজ অভ্যাস ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। ডব্লিউএইচও ও যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের পরামর্শ অনুযায়ী— দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে বাইরে বের হওয়া ও পরিশ্রমের কাজ এড়িয়ে চলুন। সম্ভব হলে দিনের কয়েক ঘণ্টা শীতল বা ঠান্ডা পরিবেশে থাকুন। ঘরের পর্দা বা জানালার আচ্ছাদন ব্যবহার করে দিনের তাপ কমানোর চেষ্টা করুন। হালকা, ঢিলেঢালা পোশাক পরুন। নিয়মিত পানি পান করুন এবং তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা করবেন না। তবে চিকিৎসক যদি তরল গ্রহণ সীমিত করে থাকেন, তাহলে তার পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। ঠান্ডা পানিতে গোসল বা শরীর ঠান্ডা করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অতিরিক্ত গরমে শুধু পাখার ওপর নির্ভর না করে সম্ভব হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করুন। একা বসবাসকারী বয়স্ক আত্মীয়, প্রতিবেশী বা পরিচিতদের নিয়মিত খোঁজ নিন।

একা থাকলে নজরদারি আরও জরুরি

বয়স্ক কেউ যদি একা থাকেন, চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা থাকে বা স্মৃতিভ্রংশজনিত সমস্যা থাকে, তাহলে গরমের সময়ে তার ঝুঁকি আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ডব্লিউএইচও বিশেষভাবে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী এবং হৃদ্‌যন্ত্র, ফুসফুস বা কিডনির রোগে আক্রান্ত কিংবা একা বসবাসকারী ব্যক্তিদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

পরিবারের সদস্য বা পরিচর্যাকারীরা দিনে অন্তত দুবার খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন—তিনি পর্যাপ্ত পানি পান করছেন কি না, ঠান্ডা পরিবেশে থাকার সুযোগ আছে কি না এবং গরমজনিত অসুস্থতার কোনও লক্ষণ দেখা দিচ্ছে কি না।

কোন লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেবেন?

গরমে মাথাব্যথা, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব বা বমি, পেশিতে টান, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ইত্যাদি তাপজনিত অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে। এসব দেখা দিলে দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে গিয়ে শরীর ঠান্ডা করার ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।

অন্যদিকে অতিরিক্ত গরম শরীর, শুষ্ক ত্বক, বিভ্রান্তি বা প্রলাপ, খিঁচুনি কিংবা অচেতন হয়ে যাওয়া হিটস্ট্রোকের মতো গুরুতর অবস্থার লক্ষণ হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি চিকিৎসা জরুরি অবস্থা—দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।

গরমে বয়স্কদের জন্য মূল কথা

পানি, ঠান্ডা পরিবেশ, নিয়মিত নজরদারি এবং সময়মতো চিকিৎসা এই চারটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে গরম সহ্য করার স্বাভাবিক সক্ষমতা কমে যেতে পারে, তাই তীব্র গরমকে ‘স্বাভাবিক গরম’ ভেবে অবহেলা না করে আগে থেকেই সতর্ক হওয়াই নিরাপদ।

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ডব্লিউএইচও ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)।