ফ্যাট বেশি, তবু কেন এত স্বাস্থ্যকর অ্যাভোকাডো

ফ্যাটের নাম শুনলেই অনেকের মনে তৈরি হয় দ্বিধা। অথচ এমন একটি ফল রয়েছে, যাতে ফ্যাটের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হলেও সেটিই হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের পছন্দের খাবার। বলছি অ্যাভোকাডোর কথা। মাখনের মতো নরম ও ক্রিমি স্বাদের এই ফল এখন সালাদ, টোস্ট, স্যান্ডউইচ থেকে শুরু করে স্মুদি বিভিন্ন খাবারে জনপ্রিয়। তবে শুধু স্বাদের জন্য নয়, এর পুষ্টিগুণও অ্যাভোকাডোকে আলাদা করে তুলেছে।

অ্যাভোকাডোতে রয়েছে ফাইবার, ভিটামিন, খনিজ, ফোলেট, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট। ফ্যাট বেশি থাকার কারণে পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি হলেও সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে পরিমিত অ্যাভোকাডো হতে পারে পুষ্টিকর সংযোজন।

অ্যাভোকাডোর সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো এতে থাকা মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট। এটি স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের একটি ধরন, যা সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করলে হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

এই ধরনের ফ্যাট রক্তের ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল কমাতে এবং উপকারী এইচডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের কার্যকারিতার ওপরও মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

অ্যাভোকাডোতে থাকা ওলেইক অ্যাসিডও এক ধরনের মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট। স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের পাশাপাশি ফাইবার থাকার কারণে অ্যাভোকাডো কিছুটা সময় পেট ভরা রাখতেও সাহায্য করতে পারে। ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণের খাদ্যতালিকায়ও পরিমিত পরিমাণে এটি রাখা যেতে পারে।

অ্যাভোকাডোতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ক্যারোটিনয়েড। এগুলো উদ্ভিদজাত প্রাকৃতিক যৌগ, যাদের মধ্যে কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। শরীরে অক্সিডেটিভ চাপ মোকাবিলায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভূমিকা রয়েছে।

ক্যারোটিনয়েডসমৃদ্ধ খাবার চোখের স্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে অ্যাভোকাডোর পুষ্টিমূল্য শুধু স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

অ্যাভোকাডোতে রয়েছে ভিটামিন সি ও ভিটামিন কে। ভিটামিন কে হাড়ের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে এবং শরীরের রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অন্যদিকে ভিটামিন সি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। এটি কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করে এবং শরীরে খাবার থেকে আয়রন শোষণের প্রক্রিয়াকে সহজতর করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্যও ভিটামিন সি গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যাভোকাডোর আরেকটি বড় গুণ হলো এতে থাকা ফাইবার। পর্যাপ্ত ফাইবার গ্রহণ হজমশক্তি ভালো রাখতে এবং নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা করে। একই সঙ্গে অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর জন্য ফাইবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে পারে। পাশাপাশি হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও রক্তে শর্করার স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও পর্যাপ্ত ফাইবার গ্রহণের সম্পর্ক রয়েছে। তাই অ্যাভোকাডো দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ফাইবারের একটি ভালো উৎস হতে পারে।

অ্যাভোকাডোতে রয়েছে বিভিন্ন ফাইটোকেমিক্যাল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এর মধ্যে লুটেইন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চোখের ম্যাকুলার স্বাস্থ্যের সঙ্গে লুটেইনের সম্পর্ক রয়েছে।

এ ছাড়া অ্যাভোকাডোতে থাকা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ শরীরে ফ্রি র‌্যাডিক্যালের কারণে তৈরি অক্সিডেটিভ ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে। ফলটির শাঁসের গাঢ় সবুজ অংশে বিভিন্ন উপকারী উদ্ভিজ্জ যৌগ বেশি থাকতে পারে। তাই অ্যাভোকাডো ছাড়ানোর সময় খোসার একেবারে কাছের সবুজ অংশ খুব বেশি বাদ না দেওয়াই ভালো।

অ্যাভোকাডোতে রয়েছে ফোলেট, যা কোষ বিভাজন ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত ফোলেট গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর নিউরাল টিউবের স্বাভাবিক বিকাশে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ফোলেটসমৃদ্ধ খাদ্যকে সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে রাখা যায়। তবে গর্ভাবস্থায় শুধু খাবারের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ফোলেট বা ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

ফলকে সাধারণত প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে ধরা হয় না। অ্যাভোকাডোতেও প্রোটিনের পরিমাণ ডিম, মাছ, মাংস, দুধ বা ডালের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের তুলনায় কম। তবে অন্যান্য অনেক ফলের তুলনায় এতে কিছুটা বেশি প্রোটিন রয়েছে।

শরীরের কোষ গঠন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের জন্য প্রোটিন প্রয়োজন। তাই শারীরিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিদের খাদ্যতালিকায় অ্যাভোকাডো রাখা যেতে পারে, তবে এটিকে প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।

অ্যাভোকাডোর নরম, মাখনের মতো শাঁসের কারণে ভারতে এটি ‘মাখন ফল’ নামেও পরিচিত। উদ্ভিদবিজ্ঞানের দিক থেকে এটি একটি বড় আকারের বেরি, যার ভেতরে থাকে একটি বড় বীজ বা আঁটি।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অ্যাভোকাডোর চাষ হয়। ভারতেও তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রসহ কয়েকটি রাজ্যে এর চাষ দেখা যায়। সময়ের সঙ্গে দেশটিতে এই ফলের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে।

অ্যাভোকাডোর সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো এর বহুমুখী ব্যবহার। সালাদ, স্যান্ডউইচ, টোস্ট, গুয়াকামোলে কিংবা বিভিন্ন ধরনের খাবারের সঙ্গে এটি সহজেই যোগ করা যায়। নরম ও ক্রিমি গঠন খাবারে আলাদা স্বাদ ও টেক্সচার এনে দেয়।

তবে অ্যাভোকাডোতে ফ্যাট ও ক্যালরির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তাই এটি যতই স্বাস্থ্যকর হোক, অতিরিক্ত খাওয়ার প্রয়োজন নেই। পরিমিত পরিমাণে এবং অন্যান্য শাকসবজি, ফল, শস্য ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে মিলিয়ে খাওয়াই ভালো।

অ্যাভোকাডোকে একক কোনো ‘সুপারফুড’ হিসেবে দেখার চেয়ে একটি সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই বেশি যুক্তিযুক্ত। স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ফাইবার, ফোলেট, ভিটামিন, খনিজ ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের সমন্বয় ফলটিকে পুষ্টিকর করে তুলেছে।

অর্থাৎ, ফ্যাট আছে বলেই অ্যাভোকাডো এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার স্বাস্থ্যকর ফ্যাট রয়েছে বলে ইচ্ছেমতো খাওয়াও ঠিক নয়। পরিমাণ বুঝে নিয়মিত ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অ্যাভোকাডো রাখলেই এর পুষ্টিগুণ থেকে সবচেয়ে ভালোভাবে উপকৃত হওয়া সম্ভব।

সূত্র: এনডিটিভি