‘সরি’ শব্দটি বলতে আমাদের অনেকেরই বেশ কষ্ট হয়। ভুল করেছি জানি। কিন্তু মুখে ‘ক্ষমা করবেন’ কথাটি আসতে চায় না! কখনও আবার ‘দোষটা আসলে আমার না’ বলে আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রস্তুতিও শুরু হয়ে যায়। অথচ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কখনও কখনও একটি ছোট্ট ‘সরি’ই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। সেই ক্ষমা চাওয়া, ক্ষমা করা এবং মনের বোঝা একটু হালকা করার কথাই মনে করিয়ে দেয় ক্ষমা প্রার্থনা দিবস। আর আজ সেই দিবস।
ক্ষমা আসলে শুধু মুখে ‘ঠিক আছে, মাফ করে দিলাম’ বলা নয়। এটি এমন একটি মানসিক প্রক্রিয়া, যেখানে কেউ তার প্রতি অন্যায় বা কষ্টদায়ক আচরণ করা ব্যক্তির ব্যাপারে নিজের রাগ, ক্ষোভ ও নেতিবাচক অনুভূতিগুলো বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ, ক্ষমা মানে ভুলকে ঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়, বরং সেই ভুলের বোঝা নিজের মাথায় সারাক্ষণ বয়ে বেড়াতে না চাওয়া।
ক্ষমার সঙ্গে অন্য কিছু বিষয়কে গুলিয়ে ফেলারও সুযোগ আছে। অন্যায়কে মেনে নেওয়া মানে হলো ঘটনাটিকে ভুলই মনে না করা। আবার কোনো কাজের দায় অন্য কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো অজুহাত খোঁজা। আইনি ক্ষমা আবার একেবারেই আলাদা বিষয়—সেখানে আইনগত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কাউকে শাস্তি বা দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর ভুলে যাওয়া মানে হলো ঘটনাটি স্মৃতি বা অনুভূতিতে আর সক্রিয় না থাকা। পুনর্মিলন মানে সম্পর্ক আবার জোড়া লাগা, যদিও সেই ঘটনার জন্য ক্ষমা করা হয়েছে কি না, সেটি আলাদা বিষয়।
সহজ করে বললে, ক্ষমা মানে ‘তুমি যা করেছ, তা ঠিক ছিল’ বলা নয়। বরং ‘এই ঘটনার রাগটা আর আমি বয়ে বেড়াতে চাই না’র নিজেকে এমন কথা বলার মতো একটি সিদ্ধান্ত।
একটু ‘পারডন মি’, একটু ‘এক্সকিউজ মি’
ক্ষমা প্রার্থনা দিবস উদযাপনের সবচেয়ে সহজ উপায় সম্ভবত দৈনন্দিন জীবনে একটু বেশি ভদ্র হওয়া। কারও সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে পথ আটকে গেলে ‘পারডন মি’ বলা যায়। ভুল করে কারও গায়ে ধাক্কা লাগলে ‘এক্সকিউজ মি’ বলতেও খুব বেশি ক্যালরি খরচ হয় না! বরং এই ছোট্ট শব্দগুলোই অনেক সময় পরিস্থিতি সহজ করে দেয়।
আর যদি মনে হয়, ‘আমি তো কারও সঙ্গে অন্যায় করিনি’ তাহলে একটু ভালো করে ভাবুন। হয়তো গত সপ্তাহের সেই বন্ধুটি এখনও আপনার ওপর অভিমান করে আছে। কিংবা পরিবারের কেউ আপনার বলা কোনও কথায় কষ্ট পেয়েছেন। অথবা এমনও হতে পারে, আপনি নিজেই কারও কাছে ‘সরি’ বলার সুযোগ খুঁজছেন। এই দিনটি হতে পারে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর ভালো অজুহাত।
পুরোনো অভিমানগুলো একটু ঝেড়ে ফেলুন
ক্ষমা দিবসের একটু কঠিন, কিন্তু অর্থবহ উদযাপন হতে পারে নিজের ভেতরে জমে থাকা পুরোনো ক্ষোভগুলোর হিসাব নেওয়া। কারও ওপর মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অভিমান করে আছেন? নিজেকে একবার প্রশ্ন করুন এই রাগটি ধরে রাখার লাভটা কী?
অবশ্যই সব পরিস্থিতিতে সঙ্গে সঙ্গে কাউকে ক্ষমা করে দিতে হবে, এমন নয়। তবে নিজের ভেতরের কষ্ট ও ক্ষোভ নিয়ে ভাবা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে সেই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলা যায়। মুখোমুখি বলতে অস্বস্তি হলে ই-মেইল লেখা যায়, এক কাপ কফির আড্ডায় মনের কথা বলা যায় কিংবা একটি চিঠি লিখে অনুভূতিগুলো প্রকাশ করা যায়।
কখনও কখনও যার কাছে অনেক কথা জমে আছে, তিনি হয়তো আর এই পৃথিবীতেই নেই। সেক্ষেত্রে তাকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখতে পারেন। যা বলতে পারেননি, সব লিখে ফেলুন। তারপর নিরাপদ উপায়ে চিঠিটি নষ্ট করে দিতে পারেন। উদ্দেশ্য চিঠি পোড়ানো নয়, বরং মনের ভেতর আটকে থাকা কথাগুলোকে বাইরে বের করে দেওয়া।
ক্ষমা দিবসের পেছনের গল্প
ক্ষমা দিবসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচিত ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি। ১৯৭৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এম. নিক্সনকে প্রেসিডেনশিয়াল ক্ষমা প্রদান করেন। নিক্সনের বিরুদ্ধে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সম্ভাব্য অপরাধের অভিযোগ ছিল।
ফোর্ডের এই সিদ্ধান্ত সে সময় ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দেয়। তবে সাধারণ মানুষের হাতে প্রেসিডেনশিয়াল ক্ষমা দেওয়ার ক্ষমতা না থাকলেও, নিজেদের জীবনে ক্ষমাশীল হওয়ার সুযোগ সবারই আছে।
আর সেখানেই ক্ষমা দিবসের আসল শিক্ষা। কারও অন্যায়কে সমর্থন করা বা ভুলকে ভুল নয় বলে মেনে নেওয়া নয়, বরং নিজের মানসিক শান্তির জন্য দীর্ঘদিনের রাগ, অভিমান ও ক্ষোভ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা।
গবেষণাতেও ক্ষমাশীলতার ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বিরক্তি ছেড়ে দিতে পারলে মানসিক চাপ কমার পাশাপাশি হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ, অন্যকে ক্ষমা করার পাশাপাশি নিজের মনকেও একটু ‘ছুটি’ দেওয়া যায়।
তাই ক্ষমা প্রার্থনা দিবসে খুব বড় কোনও আয়োজনের প্রয়োজন নেই। কখনো একটি ‘সরি’, কখনো একটি ‘তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম’, আবার কখনো নিজের মনকে বলা, ‘এবার এই অভিমানটা ছেড়ে দিই’ এটুকুই যথেষ্ট হতে পারে। কারণ ক্ষমা সবসময় অন্যকে মুক্ত করার গল্প নয়; অনেক সময় এটি নিজের মনটাকেই একটু হালকা করে দেওয়ার গল্প।









