কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগের পেছনের পরিস্থিতি প্রায়ই জটিল ও বহুস্তরে বিভক্ত হয়ে থাকে। কোনও অপরাধে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত একজন ব্যক্তিকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করার নীতি বিশ্বের অনেক দেশের বিচারব্যবস্থায় স্বীকৃত। তবে সব তথ্য ও প্রমাণ যাচাইয়ের আগেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী হিসেবে ধরে নেওয়ার প্রবণতা সমাজে প্রায়ই দেখা যায়।
বিচারব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো এমন পরিস্থিতি থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। তারপরও মিথ্যা অভিযোগ একজন মানুষের জীবন, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তি নন, এর প্রভাব পড়তে পারে তার পরিবার, বন্ধু এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিসরেও।
পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে কখনো কখনো পরবর্তী সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নির্দোষ প্রমাণিত হন। একটি মিথ্যা অভিযোগের কারণে আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সময় ও সম্পদও ব্যয় হতে পারে, যা প্রকৃত অপরাধের তদন্ত ও অপরাধীদের বিচারের কাজে ব্যবহার করা যেত।
মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার, বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই পালিত হয় ‘ন্যাশনাল ফলস্লি অ্যাকিউজড ডে’, বাংলায় যাকে বলা যায় ‘মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত দিবস’। দিবসটির মাধ্যমে এমন মানুষদের বিষয়টি সামনে আনা হয়, যারা তারা করেননি—এমন অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন এবং কখনও কখনও সেই অভিযোগের ভিত্তিতে অন্যায়ভাবে দোষীও সাব্যস্ত হয়েছেন।
দিবসটির ইতিহাস
ন্যাশনাল ফলস্লি অ্যাকিউজড ডে প্রতিষ্ঠা করেন লিন ক্র্যাবট্রি। ২০২০ সালে তিনি ও তার স্বামী মিথ্যা অভিযোগের শিকার হওয়ার পর দিবসটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। পরে লিনের সঙ্গে কাজ করা ‘ফাইটিং ফর দ্য ফলস্লি অ্যাকিউজড’ নামের একটি তৃণমূলভিত্তিক আন্দোলন যুক্তরাজ্যজুড়ে দিবসটি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে কাজ শুরু করে। প্রথমদিকে লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ও লন্ডনে এর কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দিবসটির অন্যতম লক্ষ্য হলো মিথ্যা অভিযোগের শিকার ব্যক্তিদের বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা। বিশেষ করে মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত পুরুষদের অভিজ্ঞতা ও তাদের মুখোমুখি হওয়া আইনি ও সামাজিক সমস্যাগুলোও এদিন সামনে আনা হয়।
দিবসটি সাবেক স্কুলশিক্ষক ও বিবিসি রেডিওর সম্প্রচারক সাইমন ওয়ারের জন্মবার্ষিকীতে পালনের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে শিক্ষকতা জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত অতীতের শিশু নির্যাতনের অভিযোগে তিনি মিথ্যাভাবে অভিযুক্ত হন। দীর্ঘ ও কঠিন বিচারপ্রক্রিয়ার পর শেষ পর্যন্ত তিনি ওই অভিযোগ থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হন।
নিজের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে একটি বই লেখেন সাইমন ওয়ার। একই সঙ্গে অতীতে ঘটে যাওয়া শিশু নির্যাতনের অভিযোগ কীভাবে যথাযথভাবে মোকাবিলা করা উচিত, সে বিষয়েও তিনি নিজের মতামত তুলে ধরেন।
প্রতি বছর মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং তাদের পরিবার ও বন্ধুদের জন্য দিবসটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ উপলক্ষে মিথ্যা অভিযোগ ও অন্যায়ভাবে দোষী সাব্যস্ত করার সমস্যার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি, সমাবেশ এবং বিভিন্ন আয়োজন করা হয়।
যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা, পোল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রেও দিবসটি ঘিরে জনসমাবেশ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব আয়োজনে বক্তৃতা ও আলোচনার মাধ্যমে মিথ্যা অভিযোগ এবং অন্যায় দণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়।
যেভাবে দিবসটি পালন করা হয়
মিথ্যা অভিযোগের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি সহমর্মিতা ও সমর্থন জানিয়ে দিবসটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া যায়। স্থানীয় পর্যায়ে আয়োজিত সমাবেশ, আলোচনা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে সংহতি প্রকাশ করা সম্ভব।
এ ছাড়া দিবসটি ঘিরে বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। এসব কর্মসূচির মধ্যে নীরব প্রহর বা মোমবাতি প্রজ্বালনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা ও সমর্থন জানানোর আয়োজনও থাকতে পারে। নির্দোষ মানুষের প্রতি সম্মান জানানো এবং মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিই এসব কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অন্যায়ভাবে শাস্তি পাওয়া থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দাতব্য ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া যেতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠান মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত বা ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের তথ্য, আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকে। কেউ চাইলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে অনুদানও দিতে পারেন।
মিথ্যা অভিযোগের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তায় যুক্তরাজ্যের এফএসিটি ইউকে অনলাইন তথ্য ও হেল্পলাইন পরিচালনা করে। যুক্তরাষ্ট্রের ইনোসেন্স প্রজেক্ট নির্দোষ ব্যক্তিদের ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত ও কারাবন্দি হওয়ার ঘটনা সংশোধন এবং ভবিষ্যতে এমন অন্যায় প্রতিরোধে কাজ করে। দ্য এক্সোনারেশন প্রজেক্ট ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের পক্ষে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেয়। যুক্তরাজ্যের দ্য ডিফেন্ড্যান্ট বিচারব্যবস্থার প্রক্রিয়া মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত একজন ব্যক্তিকে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করার নীতির পক্ষে কাজ করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিবসটি নিয়ে লেখা বা পোস্ট করা, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী কিংবা পরিচিতদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা এবং শান্তিপূর্ণ সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমেও দিবসটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব।
প্রয়োজন সহায়তার
মিথ্যা অভিযোগের প্রভাব একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পরিবার, বন্ধু এবং বৃহত্তর সমাজেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই মিথ্যা অভিযোগের শিকার ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করাও দিবসটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, নির্দোষ ব্যক্তির অধিকার রক্ষা এবং মিথ্যা অভিযোগের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা তৈরির বার্তা নিয়েই প্রতি বছর পালিত হয় মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত দিবস।