ডিম দিয়ে অমলেট, পোচ কিংবা ডিমভাজি এসব তো নিত্যদিনের ব্যাপার। কিন্তু ডিম যদি রান্নাঘর থেকে উড়ে গিয়ে বন্ধুর হাতে পৌঁছায়, আর শর্ত থাকে ‘ভাঙা চলবে না’, তাহলে কেমন হয়? শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এমনই এক মজার আয়োজন ঘিরে পালিত হয় গ্রেট এগ টস ডে বা মহান ডিম ছোড়াছুড়ি দিবস।
দিনটির মূল আকর্ষণ কাঁচা ডিম ছোড়াছুড়ি। দুজন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে ডিম ছুড়ে দেন। প্রথমে দূরত্ব কম থাকে, কিন্তু প্রতিবার ডিম অক্ষত অবস্থায় ধরা পড়লেই দুজনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। আর দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে উত্তেজনাও।
এখানে শুধু জোরে ডিম ছুড়লেই হবে না। দরকার দ্রুত প্রতিক্রিয়া, নরম হাতে ক্যাচ নেওয়ার দক্ষতা এবং অবশ্যই কিছুটা ভাগ্য। কারণ একটি সামান্য ভুলেই ‘ক্যাচ’ বদলে যেতে পারে ‘কাচ্চি’ অর্থাৎ চারদিকে ডিমের কুসুম-সাদা অংশের ছড়াছড়ি!
খেলাটির সবচেয়ে মজার দিক হলো, ডিম না ভাঙা পর্যন্ত সবাই বেশ আত্মবিশ্বাসী থাকে। কিন্তু ডিম যখন মাঝ আকাশে, তখন সেটি ধরতে পারার মুহূর্তে কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশে তৈরি হয় টানটান উত্তেজনা। আর ডিমটি হাত ফসকে মাটিতে পড়লেই শুরু হয় হাসির রোল।
এই মজার খেলার শুরু কোথায়?
গ্রেট এগ টস ডে-এর ইতিহাসও বেশ মজার। ডিম ছোড়াছুড়ির ধারণার শিকড় মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে রয়েছে বলে প্রচলিত আছে। ১৪শ’ শতকে লিংকনশায়ারের এক ব্যক্তি, যিনি এলাকার একমাত্র মুরগির মালিক ছিলেন বলে জানা যায়, গির্জায় আসা মানুষদের ডিম দিতেন। স্থানীয়রা বিভিন্ন সমাবেশে সেই ডিম নিয়ে আনন্দ করে ছোড়াছুড়ি করতেন। এভাবেই নাকি তৈরি হয় ডিম ছোড়াছুড়ির প্রাথমিক ঐতিহ্য।
পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ২০শ শতকে, এই খেলা আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০০৪ সালে ‘বিশ্ব ডিম নিক্ষেপ ফেডারেশন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ডিম ছোড়াছুড়ি আনুষ্ঠানিকভাবে আরও সংগঠিত রূপ পায় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন শুরু হয়।
১৯৮১ সালে রিস্তো আন্তিকাইনেন নামে এক ব্যক্তির ৩০০ ফুটের বেশি দূরে ডিম ছোড়ার ঘটনাটিও এই খেলার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। ডিম ছোড়ার বিভিন্ন কৃতিত্ব গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও স্থান পেয়েছে।
ডিম ছোড়াছুড়িতে মিলেমিশে একাকার
গ্রেট এগ টস ডে মানুষকে একসঙ্গে আনন্দ করারও একটি উপলক্ষ। পার্ক, কমিউনিটি আয়োজন কিংবা বাড়ির উঠান যেকোনো জায়গাতেই বন্ধু, পরিবার ও প্রতিবেশীদের নিয়ে আয়োজন করা যায় এই মজার খেলা।
ডিম আকাশে উড়বে, কেউ চিৎকার করে বলবে ‘ধরো ধরো!’, কেউ ক্যাচ নিতে গিয়ে হোঁচট খাবেন, আবার কেউ হয়তো শেষ মুহূর্তে অবিশ্বাস্যভাবে ডিমটি ধরে ফেলবেন। সব মিলিয়ে হাসি-আনন্দ আর বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় জমে উঠতে পারে পুরো আয়োজন।
কীভাবে উদযাপন করবেন?
সবচেয়ে সহজ উপায় বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ডিম ছোড়াছুড়ির আয়োজন করুন। ঠিক করে নিন, কে কার সঙ্গী। এরপর কাছ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়াতে থাকুন। যে জুটি সবচেয়ে বেশি দূরত্বে ডিম অক্ষত রাখতে পারবে, তারাই হবে বিজয়ী।
বিজয়ীদের জন্য ছোটখাটো পুরস্কার রাখলে প্রতিযোগিতার উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। তবে পুরস্কার না থাকলেও সমস্যা নেই কারণ ডিম ভেঙে যাওয়ার পর যে হাসি শুরু হবে, সেটিই হতে পারে দিনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার!
চাইলে কয়েকটি রাউন্ডের ছোট টুর্নামেন্টও আয়োজন করা যায়। একেক রাউন্ডে দূরত্ব বাড়বে, আর শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা জুটিই পাবে ‘ডিম ছোড়ার চ্যাম্পিয়ন’ খেতাব।
নিয়মে আনুন একটু মজা
শুধু প্রচলিত নিয়মেই খেলতে হবে এমন কোনও কথা নেই। অনুশীলনের জন্য পানিভর্তি বেলুন ব্যবহার করা যেতে পারে। আর যারা একটু কম নোংরা আয়োজনে খেলতে চান, তারা কাঁচা ডিমের বদলে সেদ্ধ ডিম ব্যবহার করতে পারেন।
তবে চোখ বেঁধে বা এক হাতে খেলার মতো চ্যালেঞ্জ যোগ করার আগে নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে কাঁচা ডিম ব্যবহারের ক্ষেত্রে খেলার জায়গা ও আশপাশের মানুষদের নিরাপদ রাখা ভালো।
ডিম ভাঙলেও ভিডিও কিন্তু চাই!
আজকের দিনে কোনও মজার আয়োজন ক্যামেরাবন্দী না হলে যেন আনন্দটাই অসম্পূর্ণ! তাই ডিম ছোড়াছুড়ির সবচেয়ে মজার মুহূর্তগুলো ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা যেতে পারে।
অবিশ্বাস্য কোনও ক্যাচ যেমন ভাইরাল হতে পারে, তেমনি নিখুঁতভাবে ছোড়া ডিম গিয়ে কারও গায়ে বা মাটিতে পড়ার দৃশ্যও কম মজার নয়। অবশ্য ভিডিও করার সময় কারও অনুমতি ছাড়া তাকে বিব্রতকর অবস্থায় প্রকাশ না করাই ভালো।
পিকনিকের সঙ্গে ডিম ছোড়াছুড়ি
চাইলে গ্রেট এগ টস ডে-কে বানিয়ে ফেলতে পারেন ছোটখাটো পিকনিক। পার্কে বা বাড়ির উঠানে চাদর বিছিয়ে সঙ্গে রাখুন নাশতা ও পছন্দের খাবার। খাওয়া-দাওয়ার ফাঁকে শুরু হোক ডিম ছোড়াছুড়ি।
একদিকে খাবার, অন্যদিকে খেলা আর মাঝখানে ডিম ভাঙার সম্ভাবনা। প্রিয়জনদের সঙ্গে বাইরে সময় কাটানোর জন্য এর চেয়ে মজার আয়োজন আর কী হতে পারে!
তবে এই দিবসের আসল আকর্ষণ কোনও রেকর্ড নয়। ডিম কত দূরে গেলো, কে জিতলো কিংবা কার ডিম আগে ভাঙলো এসবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো একসঙ্গে হাসাহাসি করার সুযোগ।
কারণ শেষ পর্যন্ত গ্রেট এগ টস ডে-এর শিক্ষা খুব সহজ, ‘ডিম ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু বন্ধুত্ব যেন না ভাঙে!’









