জীবনের সব পরিস্থিতি নিজের ইচ্ছেমতো হবে না। কখনও সাফল্য আসবে, আবার কখনও ব্যর্থতা, হতাশা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সামনে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে বিষয়টিকে দেখছি, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে আমাদের মানসিক অবস্থার ওপর। সেই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব মনে করিয়ে দিতেই প্রতি বছর পালিত হয় ইতিবাচক চিন্তা দিবস বা ‘পজিটিভ থিংকিং ডে’।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক উদ্যোক্তার উদ্যোগে দিবসটির যাত্রা শুরু হয়। ইতিবাচক মনোভাবের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং দৈনন্দিন জীবনে আশাবাদী চিন্তার চর্চা করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
ইতিবাচক থাকা মানে জীবনের কোনও সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়। বরং কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সম্ভাব্য ভালো দিকটি খুঁজে দেখার চেষ্টা করা। সব সময় নেতিবাচক পরিণতির কথা ভাবলে দুশ্চিন্তা বাড়তে পারে। বিপরীতে আশাবাদী মনোভাব কঠিন সময় সামলানোর মানসিক শক্তি জোগাতে পারে।
অনেক সময় আমরা কোনও ঘটনার চেয়ে ঘটনাটি নিয়ে নিজের তৈরি করা ধারণার কারণে বেশি অস্বস্তিতে ভুগি। ধরুন, বাইরে যাওয়ার পথে পোশাকে কফি পড়ে গেল। ঘটনাটি সামান্য হলেও মনে হতে পারে, এখন সবাই আপনার দিকে তাকাবে কিংবা পুরো দিনটাই নষ্ট হয়ে গেল। অথচ কয়েক ঘণ্টা পর হয়তো কেউ ঘটনাটির কথাই মনে রাখবে না। পরিস্থিতিকে অন্যভাবে দেখার অভ্যাস করলে অযথা দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নিজের চিন্তার ধরন বুঝতে তাই কিছুটা সময় দেওয়া দরকার। কোনও ঘটনায় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হলে সঙ্গে সঙ্গে সেই ভাবনায় ভেসে না গিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে ঘটনাটি আসলে কতটা গুরুতর? এর অন্য কোনও ব্যাখ্যা বা ইতিবাচক দিক আছে কি? এভাবে নিজের চিন্তাকে নতুনভাবে দেখার অভ্যাস ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে পারে।
ইতিবাচক থাকার জন্য বড় কোনও সাফল্যের অপেক্ষা করারও প্রয়োজন নেই। দিনের ছোট ছোট আনন্দ, সামান্য অর্জন কিংবা প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো কিছু সময়ও মন ভালো রাখার কারণ হতে পারে। দিনের শেষে ভালো লাগার কয়েকটি মুহূর্ত মনে করার অভ্যাসও ইতিবাচক মানসিকতা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
নেতিবাচক ভাবনার পেছনে অনেক সময় ভয়ও কাজ করে। মানুষ কী ভাববে, ভুল হয়ে গেলে কী হবে, টাকা নষ্ট হলো কি না এ ধরনের আশঙ্কা থেকেই অযথা দুশ্চিন্তা তৈরি হতে পারে। তাই নিজের ভয়কে এড়িয়ে না গিয়ে সেটির কারণ বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। নিজেকে কিছুটা সময় দিয়ে শান্ত হওয়া, ধ্যান করা কিংবা চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার মতো পদ্ধতি অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে কোন পদ্ধতি কার জন্য কার্যকর হবে, তা ব্যক্তিভেদে আলাদা।
ইতিবাচক চিন্তার সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক নিয়েও বিভিন্ন সময়ে গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় আশাবাদী মনোভাবের সঙ্গে কম মানসিক চাপ, বিষণ্নতার ঝুঁকি এবং হৃদ্স্বাস্থ্যের মতো বিষয়ের সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। তবে ইতিবাচক চিন্তাকে কোনও রোগের চিকিৎসা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। সুস্থ থাকার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, শরীরচর্চা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শও জরুরি।
এই দিবসটি পালন করতে বিশেষ কোনও আয়োজনের প্রয়োজন নেই। দিনের শুরুতে নিজের প্রতি একটি ইতিবাচক কথা বলা যেতে পারে। কাছের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো, কারও প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা কিংবা দীর্ঘদিন ধরে পড়তে চাওয়া কোনও বই হাতে নেওয়াও হতে পারে দিনের ছোট্ট আনন্দ। কাউকে সাহায্য করা বা ভালো কিছু বলার মধ্য দিয়েও নিজের মন ভালো রাখা সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইতিবাচক চিন্তা একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস থেকেই এটি গড়ে ওঠে। তাই কোনও দিন মন খারাপ হলে নিজেকে দোষ না দিয়ে পরিস্থিতিকে বোঝার চেষ্টা করুন। সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান না মিললেও তার মধ্য থেকে সামান্য ভালো কিছু খুঁজে নেওয়ার অভ্যাসই হয়তো একসময় চিন্তার ধরন বদলে দিতে পারে।
ইতিবাচক চিন্তা দিবসের মূল বার্তাও তাই জীবনে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও কোনও পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখব, সে সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের হাতে। আর কখনও কখনও একটি আন্তরিক হাসি, একটি আশাবাদী কথা কিংবা ছোট্ট একটি ভালো কাজও দিনটাকে বদলে দিতে পারে।