শিশুর বয়স বাড়ছে, কিন্তু সমবয়সী অন্যদের তুলনায় উচ্চতায় যেন পিছিয়ে পড়ছে। এমন বিষয় অনেক বাবা-মায়ের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেউ ভাবেন, সন্তান ঠিকমতো খাচ্ছে না বলেই হয়তো এমন হচ্ছে। আবার কারও ক্ষেত্রে ওজন বাড়লেও উচ্চতা সেই অনুপাতে বাড়ে না। আসলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধিকে শুধু ওজন বা উচ্চতার একটি সংখ্যা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। বয়স অনুযায়ী তার সার্বিক বৃদ্ধির ধারা কেমন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর উচ্চতা বৃদ্ধির গতি সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। বংশগত বৈশিষ্ট্য, পুষ্টি, হরমোন, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা এবং শারীরিক সক্রিয়তার মতো বিভিন্ন বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। তাই অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা না করে নিজের সন্তানের বৃদ্ধির ধারার দিকে নজর রাখাই জরুরি।
কোন বয়স পর্যন্ত বাড়তে পারে উচ্চতা
ছেলে ও মেয়েদের উচ্চতা বৃদ্ধির সময়কাল এক নয়। সাধারণত বয়ঃসন্ধির সময়ে উচ্চতা দ্রুত বাড়ে। ছেলেদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি প্রায় ১৮ থেকে ২০ বছর বয়স পর্যন্ত চলতে পারে। মেয়েদের ক্ষেত্রে সাধারণত ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সের মধ্যে উচ্চতা বৃদ্ধির গতি ধীরে ধীরে কমে আসে। মেয়েদের ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর উচ্চতা বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়াও স্বাভাবিক।
তবে সবার ক্ষেত্রে একই বয়সে উচ্চতা বাড়া থেমে যায় না। তাই নির্দিষ্ট একটি বয়সকে চূড়ান্ত সীমা ধরে সন্তানের উচ্চতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।
কেন আটকে যেতে পারে বৃদ্ধি
শিশুর উচ্চতা প্রত্যাশিত হারে না বাড়ার পেছনে পারিবারিক বা বংশগত কারণ থাকতে পারে। বাবা-মায়ের উচ্চতা কম হলে সন্তানের চূড়ান্ত উচ্চতাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। আবার শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি থাকলেও স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও জিঙ্কের মতো পুষ্টি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের থাইরয়েড সমস্যা, কিডনির অসুস্থতা বা গ্রোথ হরমোনের ঘাটতির মতো কিছু শারীরিক সমস্যাও শিশুর বৃদ্ধির গতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই শুধু বেশি করে খাওয়ালেই উচ্চতা বাড়ে না। কোনও শিশুর বৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ থাকলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
খাবারের দিকে নজর দিন
শিশুর খাবারে বৈচিত্র্য থাকা জরুরি। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফল, দুধ বা উপযুক্ত বিকল্প এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা উচিত। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার বা শুধু পেট ভরানোর খাবারের ওপর নির্ভর না করে বয়স অনুযায়ী সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।
খাবার নিয়ে শিশুকে জোর না করে নিয়মিত সময়ে পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি আছে কি না, তা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অনুমান করে ওষুধ বা পরিপূরক দেওয়া ঠিক নয়।
খেলাধুলাও গুরুত্বপূর্ণ
শিশুর শারীরিক বিকাশের জন্য নিয়মিত খেলাধুলা ও সক্রিয় থাকা জরুরি। দৌড়ঝাঁপ, সাঁতার, খেলাধুলা কিংবা বয়স উপযোগী শরীরচর্চা শিশুর পেশি ও হাড়কে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।
স্ট্রেচিং বা যোগব্যায়াম শরীরের নমনীয়তা ও ভঙ্গি ঠিক রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে কোনও ব্যায়াম করলেই শিশুর জিনগতভাবে নির্ধারিত চূড়ান্ত উচ্চতা বাড়বে, তা নয়। তাই উচ্চতা বাড়ানোর নামে কঠিন ব্যায়াম বা অপ্রমাণিত পদ্ধতি শিশুর ওপর প্রয়োগ করা উচিত নয়।
শুধু উচ্চতা নয়, দেখুন পুরো বৃদ্ধির ধারা
একবার মেপে শিশুর উচ্চতা কম মনে হলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কয়েক মাস বা বছরের ব্যবধানে তার উচ্চতা, ওজন এবং অন্যান্য শারীরিক পরিবর্তন কীভাবে হচ্ছে, সেটি পর্যবেক্ষণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিশু দীর্ঘ সময় ধরে বয়স অনুযায়ী প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে, হঠাৎ বৃদ্ধির গতি কমে গেলে বা ওজন ও উচ্চতার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক শিশুর শারীরিক পরীক্ষা, বৃদ্ধির তালিকা এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে কারণ খুঁজে দেখবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তানের উচ্চতা নিয়ে তাকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা না করা। সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত খেলাধুলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ এই চার বিষয়েই বাবা-মায়ের মনোযোগ থাকা দরকার।