মাঠহীন শৈশব, বাড়ছে শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি

জীবনযাপন ডেস্ক
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:২৯আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:২৯

শৈশব মানেই দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা আর বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে সময় কাটানো। কিন্তু বদলে যাওয়া জীবনযাত্রায় সেই শৈশবই যেন ক্রমে ঘরবন্দী হয়ে পড়ছে। গরমের তীব্রতা, বর্ষার বৃষ্টি, মশার উৎপাত, নিরাপদ খেলার জায়গার অভাব সব মিলিয়ে অনেক শিশুরই বাইরে গিয়ে খেলাধুলার সুযোগ কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোবাইল ফোন, ট্যাব, টেলিভিশন ও কম্পিউটারের প্রতি বাড়তি নির্ভরতা।

গত দুই দশকে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে এই পরিবর্তন বেশ স্পষ্ট। অবসর কাটানো, মন খারাপ দূর করা কিংবা বিনোদনের জন্য এখন অনেক শিশুই বেছে নিচ্ছে পর্দা। ফলে শারীরিকভাবে সচল থাকার সময় কমছে, যার প্রভাব পড়ছে শরীর ও মনের ওপর। চিকিৎসকদের পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণাতেও শিশুদের নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনের নানা নেতিবাচক দিক উঠে এসেছে।

খেলাধুলার অভাবে কী ক্ষতি হচ্ছে

শিশুর জন্য খেলাধুলা শুধু বিনোদন নয়। দৌড়ানো, লাফানো, বল খেলা কিংবা অন্য কোনও শারীরিক কর্মকাণ্ড শরীরকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি সামাজিক ও মানসিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বেঙ্গালুরুর শারীরচর্চা ও পুষ্টিবিদ্যার অধ্যাপক-চিকিৎসক অনুরা কুরপাদের মতে, দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস শিশুদের বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ায় একদিকে তাদের ক্ষুধার স্বাভাবিক প্রবণতা কমছে, অন্যদিকে একঘেয়ে জীবন তাদের বিরক্তও করে তুলছে।

এই বিরক্তি বা আনন্দের ঘাটতি পূরণ করতে অনেক শিশু চকোলেট, মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এসব খাবার খেলে মস্তিষ্কে ডোপামিনের নিঃসরণ বাড়ে, ফলে সাময়িক ভালো লাগা তৈরি হয়। কিন্তু অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের বিপরীতে শারীরিক পরিশ্রম না থাকায় বাড়তে থাকে ওজন। অল্প বয়সেই স্থূলতার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ভিটামিন ডির ঘাটতিও হতে পারে

বাইরে খেলাধুলা বা হাঁটাহাঁটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সূর্যের আলো পাওয়া। শরীরে ভিটামিন ডি তৈরিতে সূর্যালোকের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু দিনের বড় একটা সময় ঘরের ভেতর কাটালে অনেক শিশুই পর্যাপ্ত সূর্যালোক থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বয়ঃসন্ধিকালের প্রায় ৮০ শতাংশ ছেলে-মেয়ে প্রয়োজনীয় মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড করে না। শহরাঞ্চলে এই সমস্যা আরও প্রকট।

এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় অনিয়মিত খাবার ও জাঙ্কফুডের অভ্যাস, তাহলে আয়রন, ক্যালসিয়ামসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।

শুধু ওজন নয়, প্রভাব পড়ছে মস্তিষ্কেও

শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা শিশুর ঘুমের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দিনের বেলা দৌড়ঝাঁপ ও খেলাধুলায় শরীর ক্লান্ত হলে রাতে সহজে ঘুম আসে। কিন্তু স্কুলে দীর্ঘ সময় বসে থাকার পর বাড়িতেও যদি টেলিভিশন, মোবাইল বা কম্পিউটারের সামনে বসে কাটে, তাহলে শরীরের স্বাভাবিক সক্রিয়তা আরও কমে যায়।

সূর্যের আলো, শারীরিক কর্মকাণ্ড ও ঘুম এই তিনটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম না হলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দও ব্যাহত হতে পারে।

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার পাশাপাশি অতিরিক্ত পর্দানির্ভরতা ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস শিশুর মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। মনোযোগ, চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

অভিভাবকেরা অনেক সময় মনে করেন, শিশু যত বেশি সময় পড়ার টেবিলে বসবে, ফলাফল তত ভালো হবে। কিন্তু শুধু বইয়ের সামনে বসে থাকাই শিশুর সামগ্রিক বিকাশের জন্য যথেষ্ট নয়। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা পরিস্থিতি বুঝতে, সিদ্ধান্ত নিতে, অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করতে এবং নিজের মতো করে সমস্যার সমাধান করতে শেখে।

বাইরে খেলার জায়গা না থাকলে কী করবেন

বাসার আশপাশে মাঠ বা পার্ক না থাকলেও শিশুকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় রাখার প্রয়োজন নেই। কিছু পরিকল্পনা করলেই ঘর বা আশপাশের নিরাপদ জায়গায় শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। যেমন- প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, দৌড়ানো বা খেলাধুলার জন্য সময় নির্ধারণ করুন। সকাল কিংবা বিকালে সুবিধামতো যেকোনো সময় হতে পারে। পার্ক বা মাঠে যাওয়ার সুযোগ না থাকলে নিরাপদ ছাদ কিংবা বাড়ির খোলা জায়গা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। ঘরের ভেতরেও বয়স উপযোগী শারীরিক খেলাধুলার ব্যবস্থা করা যায়। রিং ধরে ঝোলা, ছোট মই বেয়ে ওঠা কিংবা শরীরচর্চার উপযোগী নিরাপদ সরঞ্জাম শিশুকে সক্রিয় রাখতে পারে। অভিভাবকেরা নিজেরাও নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম করলে শিশুরা তা দেখে উৎসাহিত হয়। পরিবারের সবাই মিলে শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলা আরও কার্যকর। ঘরের ছোটখাটো কাজে শিশুকে অংশ নিতে দিন। নিজের জিনিস গুছিয়ে রাখা, গাছের পরিচর্যা করা কিংবা প্রয়োজনীয় কিছু এনে দেওয়ার মতো কাজেও তার হাঁটাচলা বাড়বে। শিশুর আগ্রহ অনুযায়ী কোনও খেলাধুলার প্রশিক্ষণে ভর্তি করানো যেতে পারে। ক্রিকেট, ফুটবল, সাঁতার, কারাতে, টেনিস কিংবা অন্য কোনো খেলায় আগ্রহ থাকলে তাকে উৎসাহ দিন।

খেলাধুলা বিলাসিতা নয়

শিশুর জন্য খেলাধুলার সময়কে অনেক পরিবার এখনো পড়াশোনার তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। অথচ শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার অভ্যাস শুধু শরীরকে সুস্থ রাখে না, শিশুর মানসিক বিকাশ, ঘুম, সামাজিক দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।

তাই মাঠ না থাকলে বিকল্প জায়গা খুঁজতে হবে, সময়ের সংকট থাকলে রুটিনে খেলাধুলার সময় রাখতে হবে। মোবাইল বা পর্দার সামনে বসিয়ে রাখার বদলে শিশুকে যতটা সম্ভব নড়াচড়া, খেলাধুলা ও বাস্তব জীবনের নানা কাজে যুক্ত করাই হতে পারে সুস্থ শৈশবের অন্যতম চাবিকাঠি।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
১০ কেজি ওজন কমাতে ডায়েটিশিয়ানের ৮ সহজ কৌশল
ফিট থাকতে মালাইকা অরোরার রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড ওয়ার্কআউট
বৃষ্টি ভিজে সর্দি-কাশি? একটি পানীয়তে মিলতে পারে স্বস্তি
সর্বশেষ খবর
ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করলো পুলিশ, গিয়ে দেখলো অটোরিকশার গ্যারেজ অস্ত্র তৈরির কারখানা
ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করলো পুলিশ, গিয়ে দেখলো অটোরিকশার গ্যারেজ অস্ত্র তৈরির কারখানা
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধ: পদত্যাগ করলেন মার্কিন সেনাসচিব
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধ: পদত্যাগ করলেন মার্কিন সেনাসচিব
প্রধানমন্ত্রী উপযুক্ত সময়ে ভারত সফর করবেন: হুমায়ুন কবির
প্রধানমন্ত্রী উপযুক্ত সময়ে ভারত সফর করবেন: হুমায়ুন কবির
সীমান্তের ওপারে আমরা কাউন্টার পার্টকেও দেখতে পাবো: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সীমান্তের ওপারে আমরা কাউন্টার পার্টকেও দেখতে পাবো: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা পাবেন মোবাইল ভাতা
সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা পাবেন মোবাইল ভাতা
বাংলাদেশ-পাকিস্তানে এলএনজি সরবরাহ বাতিল করলো কাতারএনার্জি
বাংলাদেশ-পাকিস্তানে এলএনজি সরবরাহ বাতিল করলো কাতারএনার্জি
এক জেলার ২ এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ
এক জেলার ২ এসিল্যান্ডসহ ২০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ
নতুন পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা যেসব সুবিধা পাবেন
নতুন পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা যেসব সুবিধা পাবেন
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ৩ মিনিটে ৮১ বার ‘স্যার’ ডাকলেন সিভিল সার্জন
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ৩ মিনিটে ৮১ বার ‘স্যার’ ডাকলেন সিভিল সার্জন