সকালের ঘুমঘুম চোখে এক কাপ কফি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় কফি কিংবা কাজের ব্যস্ততায় একটু সতেজ হতে কফি- বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে আছে এই জনপ্রিয় পানীয়। কফির প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও এর দীর্ঘ ইতিহাসকে স্মরণ করে আজ ১ অক্টোবর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক কফি দিবস।
কফি শুধু একটি পানীয় নয়, অনেকের কাছে এটি জীবনযাপনেরই একটি অংশ। কফিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নিজস্ব সংস্কৃতি, আড্ডা ও নানা ধরনের আয়োজন। কালো কফি থেকে দুধ-চিনি মেশানো কফি স্বাদ ও তৈরির পদ্ধতিতে রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্য।
কফির দীর্ঘ ইতিহাস
ধারণা করা হয়, কফির বৈশিষ্ট্য প্রথম মানুষের নজরে আসে ইথিওপিয়ায়। প্রচলিত একটি গল্প অনুযায়ী, নবম শতাব্দীতে এক ছাগলপালক লক্ষ্য করেন, নির্দিষ্ট কিছু ফল খাওয়ার পর তার ছাগলগুলো অস্বাভাবিকভাবে চঞ্চল হয়ে উঠছে। সেখান থেকেই কফি ফল নিয়ে মানুষের আগ্রহ তৈরি হয় বলে ধারণা করা হয়।
পরবর্তীতে প্রায় পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে আরব বিশ্বে কফি পান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া ও ইউরোপে। পরে আমেরিকাতেও কফির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কফি আজ বিশ্বের অন্যতম বহুল পান করা পানীয়।
প্রায় পাঁচ দশক আগে কফিকে ঘিরে নতুন ধরনের সংস্কৃতিরও বিকাশ ঘটে। উচ্চমানের কফি বিন নির্বাচন, সঠিকভাবে ভাজা এবং বিশেষ পদ্ধতিতে কফি তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়। এর ফলে কফি পান শুধু তৃষ্ণা মেটানোর বিষয় না থেকে স্বাদ ও অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।
দিবসটির সূচনা
আন্তর্জাতিক কফি দিবসের ইতিহাস বেশ পুরোনো। জাপানে ১৯৮৩ সালে কফিকে ঘিরে একটি আয়োজনের তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে কফি দিবস পালিত হতে থাকে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক কফি সংস্থা দিবসটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ইতালির মিলানে দিবসটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
কফি চাষিদের নানা সমস্যা, ন্যায্য বাণিজ্য এবং উৎপাদকদের উপযুক্ত পারিশ্রমিকের বিষয়টি সামনে আনাও দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য। কারণ এক কাপ কফির পেছনে রয়েছে অসংখ্য কৃষক ও শ্রমিকের পরিশ্রম।
কফির নানা ধরন
কফির স্বাদ নির্ভর করে এর উৎপত্তিস্থল, মাটির বৈশিষ্ট্য, চাষের পদ্ধতি, ফল সংগ্রহ এবং কফি ফলের ভেতরের বীজ শুকানোর প্রক্রিয়ার ওপর। এরপর ভাজার ধরনও কফির স্বাদ ও ঘ্রাণে বড় প্রভাব ফেলে।
কেউ গাঢ় ও তীব্র স্বাদের কফি পছন্দ করেন, আবার কেউ দুধ মেশানো হালকা স্বাদের কফি পছন্দ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কফি তৈরির নিজস্ব পদ্ধতিও রয়েছে। কোথাও বিশেষ পাত্রে কফি তৈরি করা হয়, আবার কোথাও দুধ বা অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে কফিকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলা হয়।
কফির সম্ভাব্য উপকারিতা
কফিতে রয়েছে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কফির ক্যাফেইন বিপাকক্রিয়া বাড়াতে এবং শারীরিক কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। কফি পানকে মানসিক সতেজতা ও প্রফুল্লতার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।
তবে কফি পান সবার জন্য একই রকম নয়। অতিরিক্ত কফি পান করলে অস্বস্তি বা ঘুমের সমস্যা হতে পারে। তাই পরিমিত পরিমাণে কফি পান করাই ভালো।
কফি চাষিদের কথাও মনে রাখা জরুরি
কফির জনপ্রিয়তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাখো কৃষকের জীবিকা। কফির বিন উৎপাদন থেকে শুরু করে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিটি ধাপে মানুষের শ্রম রয়েছে। তাই কফি কেনার সময় ন্যায্যভাবে উৎপাদিত ও বাণিজ্য করা কফিকে গুরুত্ব দেওয়া কফি চাষিদের জন্য সহায়ক হতে পারে।
আন্তর্জাতিক কফি দিবস তাই শুধু এক কাপ কফি উপভোগের দিন নয়, বরং কফির ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং এর পেছনে থাকা মানুষের শ্রমকে স্মরণ করারও দিন। আজ কফির সুবাস ও স্বাদ উপভোগের পাশাপাশি কফি চাষিদের অবদান স্মরণ করেই উদযাপন করা যেতে পারে দিনটি।