প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় এমন অনেক পদ রয়েছে, যাদের নাম আমরা খুব সহজেই উচ্চারণ করি, কিন্তু সেই নামের পেছনের গল্পটা জানি না। কোনও খাবারের নাম এসেছে একটি শহর থেকে, কোনোটি আবার বহন করে বেড়াচ্ছে বহু পুরোনো ভাষার ছাপ। আবার কোনও খাবারের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজপরিবার, অভিজাত সমাজ কিংবা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গল্প।
খাবারের নাম আসলে শুধু একটি পরিচয় নয়। এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে কোনও অঞ্চলের ইতিহাস, মানুষের যাতায়াত, সংস্কৃতির আদান-প্রদান এবং রান্নার বিবর্তনের গল্প। বিশ্বের জনপ্রিয় কয়েকটি খাবারের নামের দিকে তাকালেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।
বিরিয়ানি নামের ভেতরেই রান্নার ইঙ্গিত
বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয় বিরিয়ানি। কিন্তু ‘বিরিয়ানি’ শব্দটির উৎস নিয়েই রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। শব্দটির সঙ্গে ফারসি ‘বিরিঞ্জ বিরিয়ান’ কথাটির সম্পর্ক রয়েছে বলে খাদ্য-ইতিহাসবিষয়ক বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। এর অর্থ দাঁড়ায় ভাজা চাল বা রান্নার আগে ভেজে নেওয়া চাল।
বিরিয়ানির সুনির্দিষ্ট জন্মস্থান নিয়ে অবশ্য একক কোনও মত নেই। পারস্যের রান্নার ঐতিহ্য, মুঘল আমলের রান্নাঘর এবং ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় রন্ধনপ্রণালির নানা প্রভাব মিলেই বর্তমানের বিরিয়ানির রূপ গড়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও খাদ্য-ইতিহাসে ধারণা করা হয়।
অর্থাৎ বিরিয়ানির নামের মধ্যেই যেন তার রান্নার একটি পুরোনো সূত্র লুকিয়ে রয়েছে।
হ্যামবার্গারে ‘হ্যাম’ কোথায়?
হ্যামবার্গার নাম শুনে অনেকের মনে প্রথমেই ‘হ্যাম’ বা শুকরের মাংসের কথা আসতে পারে। কিন্তু নামটির সঙ্গে হ্যামের সম্পর্ক নেই। ‘হ্যামবার্গার’ শব্দটি জার্মানির হামবুর্গ শহরের নাম থেকে এসেছে। একসময় হামবুর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত মাংসের পদকে ‘হামবুর্গ স্টেক’ বলা হতো। পরে যুক্তরাষ্ট্রে মাংসের কিমার তৈরি খাবার ও রুটির সঙ্গে এর নতুন রূপ জনপ্রিয় হয়।
সময়ের সঙ্গে ‘হ্যামবার্গার’-এর ‘বার্গার’ অংশটি আলাদা অর্থেও ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ফলে আজ আমরা মাংস ছাড়াও নানা ধরনের ‘বার্গার’-এর নাম শুনি।
স্যান্ডউইচের নামের পেছনে এক অভিজাতের গল্প
দুই টুকরো পাউরুটির মধ্যে মাংস বা অন্য কোনও পুর ভরে তৈরি খাবারটির নাম স্যান্ডউইচ। এই নামটি যুক্ত ইংল্যান্ডের অভিজাত জন মন্টাগু, চতুর্থ আর্ল অব স্যান্ডউইচের সঙ্গে। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, তিনি তাস খেলতে খেলতে টেবিল ছেড়ে না গিয়ে খাবার খাওয়ার জন্য রুটির মধ্যে মাংস দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। পরে এই খাবারের নাম ‘স্যান্ডউইচ’ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে যায়। তবে ঘটনাটি ঠিক এইভাবেই ঘটেছিল কি না, তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, গল্পটির ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে ১৮ শতকে ‘স্যান্ডউইচ’ শব্দটি খাবারের অর্থে ব্যবহৃত হওয়ার লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়।
খাবারের নাম যেন ইতিহাসের ছোট্ট মানচিত্র
বিশ্বের নানা খাবারের নামের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক নামের সঙ্গে কোনও না কোনও জায়গার যোগ রয়েছে। শহর, অঞ্চল কিংবা দেশের নাম খাবারের সঙ্গে মিশে গিয়ে একসময় সেই খাবারের পরিচয় হয়ে উঠেছে। এ ধরনের নামকে ভাষাবিজ্ঞানে স্থাননির্ভর নাম হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশেও এমন বহু খাবার রয়েছে, যেগুলোর নামের মধ্যে অঞ্চল, সম্প্রদায় বা স্থানীয় সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে। আবার অনেক খাবারের নাম প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে বদলেছে। ফলে একটি খাবারের নামের পেছনের গল্প খুঁজতে গেলে শুধু রান্নাঘর নয়, পৌঁছে যেতে হয় ইতিহাস ও ভাষার কাছেও।
নাম বদলায়, খাবারের গল্প থেকে যায়
একটি খাবার যখন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যায়, তখন তার উপকরণ ও রান্নার পদ্ধতির সঙ্গে নামেও পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন জায়গার মানুষের স্বাদ, স্থানীয় উপকরণ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে খাবারটি নতুন রূপ পায়। বিরিয়ানির ক্ষেত্রেও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি হয়েছে স্বতন্ত্র ধরন।
তাই পছন্দের কোনও খাবার সামনে এলে শুধু তার স্বাদ নিয়ে থেমে না গিয়ে একবার নামটির দিকেও তাকানো যায়। হয়তো সেই পরিচিত নামের আড়ালেই লুকিয়ে আছে কোনও শহরের ইতিহাস, কোনও পুরোনো ভাষার শব্দ কিংবা বহু প্রজন্মের ভ্রমণের গল্প।