বেশি সময় টিভি দেখছেন? কমতে পারে মস্তিষ্কের আয়তন

টিভি দেখার অভ্যাস নিয়ে ছোটবেলা থেকেই সতর্ক করে আসছেন বাড়ির বড়রা। বেশি সময় টিভির সামনে বসে থাকলে চোখের ক্ষতি হতে পারে, এমনটাই এত দিন বেশি শোনা গিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ টিভি দেখার সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে সাম্প্রতিক গবেষণা। বিশেষ করে মধ্যবয়সে নিয়মিত বেশি সময় টিভি দেখার সঙ্গে মস্তিষ্কের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশের আয়তন কমে যাওয়া এবং জ্ঞানীয় ক্ষমতার খারাপ ফলের সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে।

‘আলঝাইমার্স অ্যান্ড ডিমেনশিয়া’ জার্নালে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় প্রায় ১,৭০০ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মধ্যবয়সে যারা বেশি সময় টিভি দেখতেন, পরবর্তী সময়ে তাদের মস্তিষ্কের এমন কিছু অঞ্চলে তুলনামূলক কম আয়তন দেখা গিয়েছে, যেগুলি স্মৃতি, চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত। তবে গবেষণাটি টিভি দেখার অভ্যাসই সরাসরি মস্তিষ্ক সঙ্কুচিত হওয়ার কারণ এমন প্রমাণ দেয়নি।

মধ্যবয়সে কেন বেশি সতর্কতা

গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যবয়সে টিভি দেখার অভ্যাস সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হয়েছিল। পরে তাদের মস্তিষ্কের পরীক্ষা করে দেখা হয়, দীর্ঘদিনের টিভি দেখার অভ্যাসের সঙ্গে মস্তিষ্কের গঠনের কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, বেশি টিভি দেখার সঙ্গে মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশের কম আয়তনের সম্পর্ক পাওয়া যায়, যেগুলি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের স্নায়বিক সমস্যার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এর আগেও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় মধ্যবয়সে বেশি টেলিভিশন দেখার সঙ্গে মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থের কম আয়তনের সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছিল। একটি গবেষণায় প্রায় ৬০০ জনকে ২০ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাদের মধ্যে বেশি টিভি দেখার অভ্যাসের সঙ্গে ফ্রন্টাল কর্টেক্স, এন্টোরাইনাল কর্টেক্স এবং মোট গ্রে ম্যাটারের কম আয়তনের সম্পর্ক দেখা গিয়েছিল।

স্মৃতির উপরেও কি প্রভাব পড়ে

মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস স্মৃতি তৈরি ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে এই অংশে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে এবং আলঝাইমার্স রোগের ক্ষেত্রেও হিপ্পোক্যাম্পাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে টিভি দেখার কারণে হিপ্পোক্যাম্পাস নিশ্চিত ভাবে সঙ্কুচিত হয়, এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছনো এখনও ঠিক নয়।

অন্য দিকে, ফ্রন্টাল কর্টেক্সের মতো মস্তিষ্কের অংশ পরিকল্পনা, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো জটিল মানসিক কাজের সঙ্গে যুক্ত।

শুধু বসে থাকাই কি দায়ী

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, বসে থাকার সব ধরনের অভ্যাসের প্রভাব এক নয় বলেও ইঙ্গিত মিলেছে। টিভি দেখা সাধারণত অপেক্ষাকৃত নিষ্ক্রিয় বিনোদন, যেখানে দর্শকের মস্তিষ্কের সক্রিয় অংশগ্রহণ কম। অন্য দিকে কম্পিউটারে কাজ করা বা এমন কোনও কাজ, যেখানে চিন্তা ও মনোযোগের প্রয়োজন হয়, তার সঙ্গে একই ধরনের ফল দেখা যায়নি। সাম্প্রতিক গবেষণায় টিভি দেখার সঙ্গে মস্তিষ্কের কম আয়তন ও বেশি সাদা পদার্থের ক্ষতির সম্পর্ক পাওয়া গেলেও কর্মক্ষেত্রে বসে থাকার ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা গিয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকাও স্বাস্থ্যকর।

দিনে পাঁচ ঘণ্টা টিভি দেখলে

অন্য একটি বড় গবেষণাতেও টেলিভিশন দেখার সময়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। চার লক্ষেরও বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা ওই গবেষণায় দেখা যায়, দিনে পাঁচ ঘণ্টা বা তার বেশি টিভি দেখার সঙ্গে ডিমেনশিয়া, স্ট্রোক এবং পারকিনসনস রোগের বেশি ঝুঁকির সম্পর্ক ছিল। একই সঙ্গে টিভি দেখার সময় বাড়ার সঙ্গে গ্রে ম্যাটার ও হিপ্পোক্যাম্পাসের আয়তন কমার সম্পর্কও পাওয়া যায়।

তাই মধ্যবয়সে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় টিভির সামনে বসে থাকার অভ্যাস থাকলে তা কমানোই ভালো। একটানা টিভি না দেখে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটাহাঁটি করা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা এবং অবসর সময়ে বই পড়া, সামাজিক যোগাযোগ বা এমন কোনও কাজে সময় দেওয়া যেতে পারে, যাতে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে।