ঘুম থেকে উঠে বিছানা ছাড়তেই পিঠ ও কোমরে টান। নড়াচড়া করতে গেলেই ব্যথা, শরীর যেন শক্ত হয়ে রয়েছে। কখনও সেই ব্যথা ছড়িয়ে যাচ্ছে নিতম্ব পর্যন্ত। আশ্চর্যের বিষয়, সারাদিনের কাজের পর বিশ্রাম নিলে ব্যথা কমার বদলে আরও বেড়ে যাচ্ছে। সঙ্গে কখনও চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চোখে ব্যথা বা ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
এমন লক্ষণকে অনেকেই সাধারণ কোমরব্যথা বা ‘বাত’ বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যা চলতে থাকলে বিষয়টি হালকা ভাবে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ, এর নেপথ্যে থাকতে পারে অ্যাঙ্কিলোজিং স্পন্ডিলাইটিস, যা মেরুদণ্ড ও পেলভিসের সংযোগস্থলে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করা এক ধরনের প্রদাহজনিত বাতরোগ।
কী এই অ্যাঙ্কিলোজিং স্পন্ডিলাইটিস
অ্যাঙ্কিলোজিং স্পন্ডিলাইটিসে মূলত মেরুদণ্ড এবং কোমর ও নিতম্বের সংযোগস্থলে প্রদাহ ও ব্যথা হয়। এটি শুধু হাড় বা পেশির ক্ষয়জনিত সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন প্রদাহের চিকিৎসা না হলে মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলির মধ্যে হাড়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধি হয়ে সেগুলি পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে যেতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে মেরুদণ্ডের নমনীয়তা কমে যায়।
পিঠ ও কোমর শক্ত হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামনে ঝুঁকতে, দীর্ঘক্ষণ হাঁটতে কিংবা দৈনন্দিন কাজ করতে সমস্যা হতে পারে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে নিতম্বের জোড়ও আক্রান্ত হয়।
সাধারণ কোমরব্যথার সঙ্গে পার্থক্য কোথায়
এই রোগের ব্যথার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্রামে ব্যথা বাড়তে পারে এবং নড়াচড়া করলে কিছুটা কমতে পারে। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর পিঠ ও কোমরে দীর্ঘ সময় আড়ষ্টতা থাকলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
সাধারণ যান্ত্রিক কোমরব্যথার ক্ষেত্রে অনেক সময় বিশ্রামে আরাম পাওয়া যায়। কিন্তু প্রদাহজনিত এই ধরনের ব্যথায় উল্টো চিত্র দেখা যেতে পারে। রাতের দিকে ব্যথায় ঘুম ভেঙে যাওয়া, সকালে দীর্ঘক্ষণ শক্তভাব থাকা এবং নিতম্বে ব্যথা এগুলিও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
শুধু পিঠ-কোমরেই সীমাবদ্ধ নয়
অ্যাঙ্কিলোজ়িং স্পন্ডিলাইটিসের প্রভাব মেরুদণ্ডে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে চোখে প্রদাহ তৈরি হয়ে চোখ লাল হওয়া, ব্যথা, আলো সহ্য করতে না পারা বা দৃষ্টিতে সমস্যা হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আবার গোড়ালি বা শরীরের অন্য জোড়েও ব্যথা ও প্রদাহ হতে পারে।
কখনও পেটের সমস্যা বা বুকের হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথাও দেখা দিতে পারে। তাই চোখের সমস্যা বা অন্য কোনও উপসর্গের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কোমর-পিঠের ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কম বয়সেই শুরু হতে পারে
অ্যাঙ্কিলোজিং স্পন্ডিলাইটিস সাধারণত তরুণ বয়সে শুরু হয়। অনেকের ক্ষেত্রে কিশোর বা তরুণ বয়সেই প্রথম উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই বয়স কম বলে দীর্ঘদিনের কোমরব্যথাকে অবহেলা করা ঠিক নয়।
তবে শুধু দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, মোবাইল দেখা বা কম্পিউটারে কাজ করাই এই রোগের সরাসরি কারণ এমনটা বলা ঠিক নয়। রোগটির সঙ্গে জিনগত প্রবণতা এবং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
জিনের সঙ্গেও রয়েছে সম্পর্ক
অ্যাঙ্কিলোজ়িং স্পন্ডিলাইটিসের সঙ্গে এইচএলএ-বি২৭ নামের একটি জিনগত বৈশিষ্ট্যের শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে। আক্রান্ত বহু মানুষের শরীরে এই জিনের উপস্থিতি দেখা যায়। তবে শরীরে এইচএলএ-বি২৭ থাকলেই যে অ্যাঙ্কিলোজিং স্পন্ডিলাইটিস হবে, তা নয়। একই ভাবে এই জিন না থাকলেও কারও রোগটি হতে পারে।
অর্থাৎ শুধু জিন পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা যায় না। রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এক্স-রে বা এমআরআই সব মিলিয়েই চিকিৎসকেরা রোগ নির্ণয় করেন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
যদি কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে পিঠ ও কোমরে ব্যথা থাকা, সকালে ঘুম থেকে উঠে দীর্ঘক্ষণ কোমর-পিঠ শক্ত বা আড়ষ্ট লাগা, বিশ্রামে বা রাতে ব্যথা বেড়ে যাওয়া, নড়াচড়া করলে ব্যথা, কিছুটা কমে আসা, নিতম্বে বার বার ব্যথা হওয়া, গোড়ালি বা অন্য জোড়ে ব্যথা ও ফোলা, চোখ লাল, ব্যথা বা আলো সহ্য করতে না পারা এবং দীর্ঘদিনের পিঠের ব্যথার সঙ্গে বুক বা পেটের অন্য উপসর্গ যুক্ত হওয়া লক্ষণগুলি দীর্ঘদিন ধরে থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে ব্যথা ও প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক নড়াচড়া যতটা সম্ভব বজায় রাখা যায়। তাই দীর্ঘদিনের কোমরব্যথাকে শুধু ‘বাত’ বলে ধরে নিয়ে ওষুধ খেয়ে যাওয়ার বদলে প্রয়োজন হলে রিউমাটোলজিস্ট বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভাল।









