খাবার খাওয়ার পর বুকের ভেতর জ্বালাপোড়া, গলা পর্যন্ত টক ঢেঁকুর উঠে আসা কিংবা রাতে শুয়ে পড়ার পর অস্বস্তি বুকজ্বালা অনেকের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত সমস্যা। কখনও সামান্য অস্বস্তি হলেও, বারবার হলে তা বেশ বিরক্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
বুকজ্বালা পুরোপুরি এড়ানো সবসময় সম্ভব না হলেও কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এর ঝুঁকি ও অস্বস্তি কমানো যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে দৈনন্দিন জীবনযাপনেও কিছু পরিবর্তন আনা গুরুত্বপূর্ণ।
যে খাবারে সমস্যা হয়, তা এড়িয়ে চলুন: বুকজ্বালা প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হতে পারে নিজের খাবারের তালিকার দিকে নজর দেওয়া। নর্থ ক্যারোলিনার ইউএনসি হেলথের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. ক্রেইগ সি. রিডের মতে, যেসব খাবার বা পানীয় গ্রহণের পর আপনার বুকজ্বালা বাড়ে, সেগুলো এড়িয়ে চলুন।
তবে সবার ক্ষেত্রে একই খাবার বুকজ্বালার কারণ হয় না। কারও ক্ষেত্রে ঝাল বা মসলাদার খাবার সমস্যা তৈরি করতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে অন্য কোনও খাবার বা পানীয় থেকে অস্বস্তি হতে পারে। তাই কোন খাবারের পর উপসর্গ বাড়ছে, তা খেয়াল করে নিজের জন্য একটি উপযোগী খাবারের তালিকা তৈরি করা যেতে পারে।
খাবারের পরপরই শুয়ে পড়বেন না: খাবার খাওয়ার পরপরই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ার অভ্যাস বুকজ্বালার সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই খাবার খাওয়ার পর কিছুটা সময় সোজা হয়ে থাকা ভালো। বিশেষ করে রাতে খাবার খাওয়ার পরপরই ঘুমিয়ে না পড়ে কিছুটা সময় অপেক্ষা করলে পাকস্থলীর উপাদান খাদ্যনালিতে উঠে আসার প্রবণতা কমতে পারে।
ঘুমের সময় মাথা একটু উঁচুতে: রাতে শুয়ে পড়ার পর যাদের বুকজ্বালা বেশি হয়, তাদের জন্য ঘুমানোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। মাথার দিকটা কিছুটা উঁচু করে ঘুমালে পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালিতে উঠে আসার প্রবণতা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
তবে শুধু মাথার নিচে কয়েকটি বালিশ দিয়ে শরীর বাঁকিয়ে রাখার পরিবর্তে ঘুমানোর ব্যবস্থা এমনভাবে করা ভালো, যাতে মাথা ও বুকের অংশ তুলনামূলকভাবে উঁচু থাকে।
ধূমপান ও অ্যালকোহল কমান: ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণের অভ্যাস থাকলে তা কমিয়ে আনা বা সম্ভব হলে পরিহার করাও বুকজ্বালা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। দৈনন্দিন জীবনযাপনে এই পরিবর্তন শুধু বুকজ্বালার ক্ষেত্রেই নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে।
অতিরিক্ত ওজন থাকলে কমানোর চেষ্টা: শরীরে অতিরিক্ত ওজন থাকলে পাকস্থলীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। এর ফলে অ্যাসিড খাদ্যনালিতে উঠে আসার প্রবণতা বাড়তে পারে।
ডা. রিডের মতে, অতিরিক্ত ওজন থাকলে ওজন কমানোর মাধ্যমে বুকজ্বালার সমস্যা প্রতিরোধে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। তবে দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা না করে স্বাস্থ্যকর খাবার ও নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা ভালো।
ভেষজ উপাদানেই কি মিলবে সমাধান
বুকজ্বালা হলেই অনেকে ঘরোয়া বা ভেষজ উপাদানের দিকে ঝুঁকেন। ক্যামোমাইল চা, আদা কিংবা যষ্টিমধুর নির্যাস এসবকে বুকজ্বালা কমানোর প্রাকৃতিক উপায় হিসেবে অনেকে ব্যবহার করেন।
তবে আমেরিকান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. বায়রন ক্রায়ারের মতে, এসব ভেষজ উপাদান বুকজ্বালার চিকিৎসায় কার্যক এমন শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
তাই ভেষজ উপাদানকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে যাদের নিয়মিত বুকজ্বালা হয়, তাদের শুধু ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে সমস্যার কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
কখন সতর্ক হবেন
মাঝেমধ্যে হালকা বুকজ্বালা হলে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যদি সপ্তাহে বারবার বুকজ্বালা হয়, দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হয় কিংবা উপসর্গ ক্রমেই বাড়তে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বুকজ্বালার সঙ্গে খাবার গিলতে সমস্যা, অনিচ্ছাকৃত ওজন কমে যাওয়া, তীব্র বুকব্যথা, রক্তবমি বা কালো পায়খানার মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
ছোট ছোট অভ্যাসেই নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে অস্বস্তি
বুকজ্বালা শুধু খাবারের কারণে হয় এমনটা নয়। খাবারের ধরন, খাওয়ার সময়, ঘুমের অভ্যাস, ওজন এবং জীবনযাপনের নানা বিষয় এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তাই বুকজ্বালা এড়াতে প্রথমেই নিজের অভ্যাসগুলো পর্যবেক্ষণ করা দরকার।
যে খাবারে সমস্যা হয় তা এড়িয়ে চলা, খাবারের পরপরই না শোয়া, ঘুমের সময় মাথা ও বুকের অংশ কিছুটা উঁচু রাখা, ধূমপান ও অ্যালকোহল কমানো এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এই ছোট ছোট পরিবর্তনই অনেকের জন্য বুকজ্বালার অস্বস্তি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সূত্র: দ্যা নিউইয়র্ক টাইম









