রাজশাহীর নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আম, পদ্মা আর রেশম। এই শহরের পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক রাজশাহী সিল্ক। মসৃণ, উজ্জ্বল ও কোমল এই কাপড়ের পেছনে রয়েছে হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য, অসংখ্য মানুষের শ্রম আর প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। কিন্তু যে সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে বোনা হয় রাজশাহীর বিখ্যাত রেশম, সেই সুতার যাত্রা শুরু হয় কোথা থেকে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তুঁতবাগানে।
রেশমের গল্প শুরুটা কিন্তু তাঁতে নয়, এই গল্প শুরু হয় তুঁতগাছের পাতায়। কারণ রেশমকীটের একমাত্র খাদ্য তুঁতের পাতা। তুঁতবাগানের সবুজ পাতাই রেশমশিল্পের প্রথম ভিত্তি। নির্দিষ্ট সময়ে ডিম ফুটে বের হওয়া ক্ষুদ্র রেশমকীট দিন-রাত তুঁতের কোমল পাতা খেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠে। কয়েক দফা খোলস বদলের পর তারা নিজেদের চারপাশে একটানা সূক্ষ্ম তন্তু দিয়ে তৈরি করে গোলাকার একটি আবরণ। এই আবরণকেই বলা হয় কোকুন বা রেশমগুটি। এই কোকুনই রাজশাহীর রেশম সুতার মূল উৎস।
কোকুনের ভেতরে থাকা অবিশ্বাস্য বিস্ময়
প্রতিটি কোকুনের ভেতরে লুকিয়ে থাকে একটি অবিশ্বাস্য বিস্ময়। একটি কোকুনের ভেতরে থাকা একটিমাত্র অবিচ্ছিন্ন রেশম তন্তুর দৈর্ঘ্য কয়েকশ’ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, একটি রেশমকীট প্রায় ৮০০ থেকে এক হাজার ৫০০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ একটানা তন্তু তৈরি করতে পারে। যদিও ব্যবহার করার মতো সুতা বের করতে অনেকগুলো কোকুনের তন্তু একসঙ্গে জোড়া লাগাতে হয়।
সুতা বের করার পদ্ধতি
রেশমগুটি সংগ্রহের পর শুরু হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সুতা বের করার কাজ। প্রথমে গুটিগুলো গরম পানিতে সেদ্ধ বা ভিজিয়ে নরম করা হয়, যাতে সেগুলোকে জড়িয়ে রাখা প্রাকৃতিক আঠালো পদার্থ আলগা হয়ে যায়। এরপর বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে প্রতিটি গুটির সূক্ষ্ম তন্তুর শুরু অংশ খুঁজে বের করা হয়। কয়েকটি তন্তু একসঙ্গে পাকিয়ে তৈরি করা হয় অবিচ্ছিন্ন রেশম সুতা। এই পুরো প্রক্রিয়াকেই বলা হয় রিলিং।
রিলিং শেষে সুতা শুকিয়ে নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী পাক দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন রঙে রঞ্জিত করা হয়। এরপর সেই সুতা চলে যায় তাঁতিদের হাতে। দক্ষ কারিগরের নিপুণ বুননে সেই সূক্ষ্ম সুতা ধীরে ধীরে রূপ নেয় রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিল্ক শাড়ি, পাঞ্জাবি, স্কার্ফ, টাই, ওড়না এবং নানা ধরনের নান্দনিক পোশাক ও হস্তশিল্পে।
রেশমের ইতিহাস
এক সময় বাংলাদেশের রেশমশিল্পের প্রাণকেন্দ্র ছিল রাজশাহী। শুধু এই শহর নয়, আশপাশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলাতেও ব্যাপকভাবে তুঁতচাষ ও রেশমকীট পালন হতো। এসব অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা রেশমগুটি রাজশাহীর রিলিং কারখানায় এনে তৈরি করা হতো সূক্ষ্ম রেশম সুতা। পরে সেই সুতা থেকেই বোনা হতো দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সিল্ক।
এই শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড এবং বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। তাদের গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তায় একসময় দেশের রেশমশিল্প সমৃদ্ধি অর্জন করে।
তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বেড়েছে উৎপাদন খরচ, আগের তুলনায় কমেছে তুঁতচাষের জমি। এছাড়া বেশি লাভজনক অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়েন অনেক চাষিই। এ কারণে দেশীয় কোকুন উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করে। যার ফলে বর্তমানে রাজশাহীর অনেক তাঁত ও রেশম কারখানা স্থানীয় কাঁচামালের পাশাপাশি চীন, ভারত, উজবেকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা কাঁচা রেশম সুতা ব্যবহার করে। অর্থাৎ আজকের রাজশাহী সিল্কের সব সুতা আর স্থানীয় উৎস থেকে আসে না।
তবুও রাজশাহী সিল্কের ঐতিহ্য আজও অটুট। কারণ একটি রেশমপণ্যের মূল্য শুধু তার কাঁচামালে নয়, এর আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে দক্ষ তাঁতির নিখুঁত বুননে, নান্দনিক নকশায় এবং শত বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়। প্রতিটি শাড়ি, ওড়না কিংবা রেশমি কাপড়ে তাই জড়িয়ে থাকে তুঁতপাতার সবুজ, রেশমকীটের নীরব পরিশ্রম, কারিগরের সৃজনশীলতা এবং রাজশাহীর গৌরবময় উত্তরাধিকার।