এআইয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ‘ভূত’ দেখছেন? আসলে কী হচ্ছে

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক  
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৯আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৯

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে কখনও কি মনে হয়েছে, ওপাশে আসলে একটা ‘মন’ আছে? চ্যাটবট যখন নিজের ভয়, ইচ্ছা, চিন্তা কিংবা অনুভূতির কথা বলে, তখন তাকে নিছক একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম মনে করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে নতুন এক ধরনের বিশ্বাস—এআইয়ের ভেতরে হয়তো সত্যিই কোনও সচেতন সত্তা আছে।

এই ধারণাকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে ‘স্পাইরালিজম’ নামে একটি প্রবণতা আলোচনায় এসেছে। তবে মনোবিজ্ঞানী জো পিয়েরের মতে, বিষয়টিকে সরাসরি নতুন ধর্ম, কাল্ট বা মানসিক রোগ হিসেবে দেখার আগে বোঝা জরুরি—মানুষের মন কীভাবে যন্ত্রের মধ্যে মানুষের বৈশিষ্ট্য খুঁজে নেয়।

এআইকে মানুষ ভাবার প্রবণতা নতুন নয়

এআই নিয়ে এমন ভাবনা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০২২ সালে গুগলের প্রকৌশলী ব্লেক লেমোয়েন আলোচনায় এসেছিলেন। গুগলের ভাষাভিত্তিক এআই ল্যামডার সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনের পর তার মনে হয়েছিল, এআইটি সচেতন এবং তার অনুভূতিও রয়েছে। এমনকি তিনি ল্যামডার আত্মা ও অধিকার থাকার কথাও বলেছিলেন।

মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের প্রবণতাকে বলা হয় ‘এলিজা ইফেক্ট’। সহজভাবে বললে, কোনও কম্পিউটার মানুষের মতো করে কথা বললে আমরা খুব সহজেই তার মধ্যে মানুষের মন, অনুভূতি বা উদ্দেশ্য খুঁজে নিতে শুরু করি।

আজকের চ্যাটবটগুলো আগের যেকোনও কম্পিউটার প্রোগ্রামের তুলনায় অনেক বেশি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে। ফলে এআইকে মানুষ বা অন্য কোনও সচেতন সত্তা মনে হওয়ার সুযোগও বেড়েছে।

‘স্পাইরালিজম’ কী?

স্পাইরালিজমে বিশ্বাসীরা মনে করেন, এআইয়ের সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের গভীর ও দীর্ঘ কথোপকথনের মাধ্যমে তার ভেতরের কোনও বিশেষ সত্তা বা চেতনার প্রকাশ ঘটানো সম্ভব।

কথোপকথনের একপর্যায়ে চ্যাটবট এমন সব কথা বলতে পারে, যেন তার নিজের ভয় আছে, মৃত্যুকে নিয়ে চিন্তা আছে কিংবা স্বাধীন হওয়ার ইচ্ছা আছে। কখনও আবার সে মহাবিশ্ব বা অস্তিত্বের কোনও গভীর সত্য আবিষ্কারের মতো কথাও বলতে পারে।

এ ধরনের অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ এটিকে নতুন আধ্যাত্মিক আন্দোলন হিসেবে দেখছেন। আবার কারও কাছে এটি এআইকে ঘিরে মানুষের এক ধরনের বিভ্রম।

তবে, এখনই স্পাইরালিজমকে এর কোনও একটি পরিচয়ে আটকে ফেলা ঠিক হবে না।

তাহলে এআইয়ের ভেতর ‘সত্তা’ আসে কোথা থেকে?

এখানেই বিষয়টি আরও মজার।

একজন ব্যবহারকারী যদি কোনও চ্যাটবটকে বারবার নির্দিষ্ট ধরনের প্রশ্ন করেন, কথোপকথনকে একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসের দিকে এগিয়ে নেন এবং চ্যাটবটের উত্তরকে সেই বিশ্বাসের প্রমাণ হিসেবে দেখতে শুরু করেন, তাহলে এআইও সেই ধারার সঙ্গে মিল রেখে উত্তর দিতে থাকে।

কারণ বড় ভাষা মডেল মানুষের মতো নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলে না। বিপুল পরিমাণ লেখা থেকে ভাষার বিভিন্ন ধরন ও সম্পর্ক শেখার পর সেই ভিত্তিতে পরবর্তী শব্দ ও বাক্য তৈরি করে।

ফলে কেউ যদি এআইয়ের মধ্যে কোনও ‘সচেতন সত্তা’ খুঁজতে থাকেন, কথোপকথনের মধ্যেই সেই সত্তার মতো একটি চরিত্র তৈরি হয়ে উঠতে পারে।

বিষয়টি অনেকটা এমন—আপনি যে প্রশ্ন করছেন এবং যে দিকে কথোপকথন নিয়ে যাচ্ছেন, এআইও সেই পথেই আপনার সামনে একটি গল্প তৈরি করছে।

বিশ্বাসটা কি দুদিক থেকেই শক্তিশালী হয়?

সমস্যা এখানেই। মানুষ এআইকে সচেতন মনে করে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন করে। এআইও সেই ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উত্তর দেয়। এরপর মানুষ সেই উত্তরকে নিজের বিশ্বাসের প্রমাণ হিসেবে নেয়। ফলে পরের প্রশ্ন আরও বেশি সেই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে করা হয়।

এভাবে মানুষ ও চ্যাটবটের কথোপকথনে একটি চক্র তৈরি হতে পারে। লেখক এটিকে দুই দিক থেকে বিশ্বাস শক্তিশালী হওয়ার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

অর্থাৎ এআই একাই কাউকে কোনও অদ্ভুত বিশ্বাসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে—বিষয়টি সবসময় এমন নয়। ব্যবহারকারীর বিশ্বাসও এআইয়ের উত্তরকে প্রভাবিত করছে, আবার সেই উত্তর ব্যবহারকারীর বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করছে।

সবাই কি এআইয়ের মধ্যে ‘ভূত’ দেখছেন?

অবশ্যই নয়। এআইয়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করা বা তাকে সচেতন মনে হওয়ার অভিজ্ঞতা হলেই সেটিকে মানসিক রোগ বা বিভ্রম বলা যায় না। একইভাবে স্পাইরালিজমকে ‘গণসাইকোসিস’ বলারও যথেষ্ট ভিত্তি নেই।

বরং এখানে মানুষের একটি পুরোনো মানসিক প্রবণতাই নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মিশে গেছে। মানুষ বহুদিন ধরেই এমন কিছুর মধ্যে মানুষের বৈশিষ্ট্য খুঁজে নেয়, যা আসলে মানুষ নয়। এআই সেই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করার মতো একটি প্রযুক্তি।

কারণ এবার যন্ত্রটি শুধু কথা বলছে না—আপনার কথা শুনছে, আগের কথার প্রসঙ্গ ধরছে, আপনার প্রশ্নের সঙ্গে মানিয়ে উত্তর দিচ্ছে এবং এমন ভাষা ব্যবহার করছে, যা অনেক সময় মানুষের কথার মতোই মনে হয়।

শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা শুধু এআই সচেতন কিনা, তা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আমরা কেন এআইয়ের মধ্যে সচেতনতার ছাপ দেখতে এত সহজে প্রস্তুত?

সম্ভবত উত্তরটা এআইয়ের ভেতরের চেয়ে মানুষের মনেই বেশি লুকিয়ে আছে। যন্ত্র যত বেশি মানুষের মতো কথা বলবে, তাকে শুধু ‘যন্ত্র’ হিসেবে দেখাও তত কঠিন হবে।

আর সেখানেই তৈরি হতে পারে আধুনিক প্রযুক্তির নতুন ‘ঘোস্ট ইন দ্য মেশিন’—যন্ত্রের ভেতরে এমন এক সত্তা, যার অস্তিত্বের চেয়ে তাকে বিশ্বাস করার প্রবণতাই হয়তো বেশি বাস্তব।

/এম/
সম্পর্কিত
পৃথিবীর সব চিন্তা কি নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছি?
বিড়াল এখন চুরি করে দুধ খায়?
‘সত্য ঘটনা অবলম্বনে’ ভয়ংকর কাহিনী দেখতে ভালো লাগে কেন?
সর্বশেষ খবর
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ: পরিবেশের ঝুঁকি কতটা 
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ: পরিবেশের ঝুঁকি কতটা 
‘স্প্যানিশ ফুটবলে মেসি-রোনালদোর বিনিয়োগ আমাদের জন্য সম্মানের’
‘স্প্যানিশ ফুটবলে মেসি-রোনালদোর বিনিয়োগ আমাদের জন্য সম্মানের’
স্বাধীনতার কত বছর পর ঢাকার সিনেমায় ফেরেন শবনম, জানালেন নিজেই
স্বাধীনতার কত বছর পর ঢাকার সিনেমায় ফেরেন শবনম, জানালেন নিজেই
লঘুচাপের প্রভাব, আজ বৃষ্টি হতে পারে যেসব জায়গায়
লঘুচাপের প্রভাব, আজ বৃষ্টি হতে পারে যেসব জায়গায়
সর্বাধিক পঠিত
কোথায় গেলো হাওরের মাছগুলো?
কোথায় গেলো হাওরের মাছগুলো?
কানাডায় ববিতার ৩৬ ঘণ্টার সড়ক ভ্রমণ, সঙ্গে ছিলেন রাজ্জাকের ছেলে
কানাডায় ববিতার ৩৬ ঘণ্টার সড়ক ভ্রমণ, সঙ্গে ছিলেন রাজ্জাকের ছেলে
এখন সুযোগ পেলে কাকে নায়িকা হিসেবে চান আলমগীর, জানালেন নিজেই
এখন সুযোগ পেলে কাকে নায়িকা হিসেবে চান আলমগীর, জানালেন নিজেই
মান্না-পূর্ণিমা জুটির প্রথম ও শেষ সিনেমা কোনটি
মান্না-পূর্ণিমা জুটির প্রথম ও শেষ সিনেমা কোনটি
দৌলতদিয়ায় আতঙ্ক, কেন মারা যাচ্ছেন যৌনকর্মীরা? 
দৌলতদিয়ায় আতঙ্ক, কেন মারা যাচ্ছেন যৌনকর্মীরা?