ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে বা অতিরিক্ত ওজন কমাতে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা। এ ক্ষেত্রে দইকে অন্যতম উপকারী খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই খাবার শুধু হজমশক্তি উন্নত করে না, বরং সঠিকভাবে খেলে ওজন নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দইয়ে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া বা প্রোবায়োটিক অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। সুস্থ অন্ত্র বা গাট মাইক্রোবায়োম শরীরের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে শরীরের শক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে।
কেন ওজন কমাতে সাহায্য করে দই
দইয়ের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এতে থাকা উচ্চমাত্রার প্রোটিন। প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে, ফলে ক্ষুধা কম লাগে এবং অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতা হ্রাস পায়। এতে দৈনিক ক্যালোরি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
এ ছাড়া দই ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি-১২, পটাশিয়াম ও বিভিন্ন উপকারী পুষ্টি উপাদানের উৎস। নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে দই গ্রহণ শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
দই খেয়েও কেন অনেকের ওজন বাড়ে
পুষ্টিবিদরা বলছেন, শুধু দই খেলেই ওজন কমবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। ভুল পদ্ধতিতে দই খেলে উল্টো ওজন বাড়তেও পারে।
প্রথমত, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত খাবার হিসেবে দই যোগ করলে মোট ক্যালোরির পরিমাণ বেড়ে যায়। শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করলে তা চর্বি হিসেবে জমা হয়।
দ্বিতীয়ত, অনেকেই মিষ্টি দই বেছে নেন। বাজারের অনেক দইয়ে অতিরিক্ত চিনি থাকে, যা ওজন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
তৃতীয়ত, দইয়ের সঙ্গে মধু, জ্যাম, চকলেট সিরাপ বা অতিরিক্ত মিষ্টি ফল মিশিয়ে খাওয়ার অভ্যাসও ক্যালোরি ও চিনি বাড়িয়ে দেয়।
ওজন কমানোর জন্য কীভাবে দই খাবেন
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে মিষ্টিবিহীন বা প্লেইন দই বেছে নেওয়া ভালো। এটি বিকেলের নাশতা বা রাতের খাবারের পর সীমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।
দইয়ের সঙ্গে বাদাম যেমন—আমন্ড, আখরোট বা কাজুবাদাম যোগ করলে তা স্বাস্থ্যকর হতে পারে। তবে এগুলোও পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে, কারণ বাদামে ক্যালোরির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।
ফল মেশাতে চাইলে স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, রাস্পবেরি বা জাম্বুরার মতো কম চিনিযুক্ত ফল বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা।
যেসব ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি
অনেকেই দ্রুত ওজন কমানোর আশায় প্রধান খাবারের পরিবর্তে শুধু দই খেতে শুরু করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কারণ এতে শরীরে প্রয়োজনীয় প্রোটিন, শর্করা, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
দইকে কখনোই পূর্ণাঙ্গ খাবারের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং একটি সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
এ ছাড়া দ্রুত ফলাফলের আশা করাও ঠিক নয়। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে দই গ্রহণ করলে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন কমানোর জন্য দই কার্যকর হতে পারে, তবে এটি কোনও ‘ম্যাজিক ফুড’ নয়। ওজন নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো সুষম খাদ্য, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
তাই মিষ্টিবিহীন দই, পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ, অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখার মাধ্যমে দইয়ের সর্বোচ্চ উপকার পাওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ, মায়ো ক্লিনিক পুষ্টি নির্দেশিকা ও একাডেমি অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিকস।