কবিতার কমলবনে, স্বপ্নবন্দি এক কবি

এই পৃথিবীকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করতে প্রকৃতি যেমন প্রতিনিয়ত তার সৌন্দর্যের বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে চলেছে, তেমনিভাবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে রঙের ছটায় ভরিয়ে দিতে যুগে যুগে এমন কিছু চরিত্রের আবির্ভাব হয়েছে, যাদের যাপিত জীবনের ছত্রে ছত্রে বাঁক পরিবর্তন পারিপার্শ্বিক সকলকে বিমোহিত করে রেখেছিল মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায়। জীবনের সেইসব বাঁক পরিবর্তনের পেছনে ক্রীড়নক হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল কখনো ব্যক্তি মানুষের অসম্ভব রকমের মানসিক শক্তি, কখনো-বা অদৃষ্টের বিধান। কবি বেলাল চৌধুরীকে যারা কাছ থেকে চিনতেন, জানতেন, তারা সকলেই অবগত আছেন যে, বাহ্যিকভাবে প্রচণ্ড উদাসীন এই কবি জীবদ্দশায় এই উভয় প্রকার পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে গিয়েছেন খুব অনায়াসে। জাদুবাস্তবতার একজন অনুরাগী হিসেবে কি না জানি না, নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন এক জাদুবাস্তবতার জগৎ। যে জগতে তিনি প্রবেশ করতে পারতেন অবাধে, যেকোনো পরিবেশ-পরিস্থিতিতে।

ফেনী জেলার অন্তর্গত শর্শদী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের নয় সন্তানের সর্বজ্যেষ্ঠ হিসেবে কবি বেলাল চৌধুরীর জন্ম। পরিবারটির মধ্যে প্রখর ধর্মীয় মূল্যবোধের আবহ থাকলেও আধুনিক চিন্তামনষ্ক পরিবার হিসেবে ছিল সুপরিচিত। বাবা রফিকউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রেলের কর্মকর্তা হওয়ায় সুবাদে সেইসময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত সব পত্রপত্রিকা, বই নিয়মিত সংগ্রহ করতেন। মা মনিরা আখতার খাতুন চৌধুরী লিখতেন কবিতা। সেই বই, পত্রপত্রিকা আর কবিতার মাঝে বেড়ে ওঠা আশৈশব দুরন্ত কবি ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন রেলগাড়ির চালক হবার। শৈশবের সেই স্বপ্নের ঘোর কাটতে না কাটতেই প্রবল আগ্রহী হয়ে ওঠেন বাম রাজনীতির প্রতি। সেই আগ্রহ ধীরে ধীরে তাকে রূপান্তরিত করেছিল একেবারে সক্রিয় বাম রাজনৈতিক কর্মীতে। ফলস্বরূপ ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়ে তৎকালীন রাষ্ট্রব্যবস্হার রোষানলে পড়ে যেতে হয় দীর্ঘ কারাবাসে। রাজবন্দি থেকেই বিশেষ ব্যবস্হায় দিয়েছিলেন তৎকালীন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা। তারপর কারামুক্ত হয়ে বিভিন্ন ঘটনার ধারাবাহিকতায় পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত প্রবল পাঠস্পৃহা মাদুলির ন্যায় বুকে ধারণ করে এবং যৌবনের মন্ত্র 'ভোজনং যত্রতত্র, শয়নং হট্ট মন্দির' কে ভরসা করে পাড়ি জমান অজানার উদ্দেশ্যে। ট্রলারে চেপে কখনো গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা, কখনো কুমিরের ব্যবসা এরকম নানা মিথের জন্ম দিয়ে এবং ব্যবসার সুবাদে পকেটে বেশকিছু কাঁচাপয়সাসহ একসময় নিজের পরিচয় ঝেড়ে ফেলে নেমে পড়লেন কলকাতায় ১৯৬৩ সালে। মিশে গেলেন সেখানকার শিল্প-সাহিত্যের নক্ষত্রপুঞ্জের মাঝে।

কবি বেলাল চৌধুরীর জীবনে কলকাতা পর্ব অনুসন্ধানী পাঠকদের অনেকেরই কম-বেশি জানা। সেখানকার প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যিকদের অনেকের রচিত উপন্যাস, গল্প, কবিতা এবং আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে তৎকালীন কবি বেলাল চৌধুরীর রহস্যপূর্ণ, বিচিত্র, বোহেমিয়ান জীবনচরিত। মূলত তখনই আত্মপরিচয়ের সংকট ঘুচাতে সক্রিয় লেখালেখির শুরু। ছোট বড় নানান পত্রিকা-সংকলনে দু'হাতে লিখেছেন কবিতা, গদ্যনির্ঝর। সমানতালে করেছেন তরজমা কিংবা সম্পাদনার কাজ। সেসময়েই সম্পাদনা করেছিলেন তরুণ কবিদের কাছে ধর্মগ্রন্থের ন্যায় সমাদৃত কৃত্তিবাস পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যা। সেসুবাদে সেখানকার সাহিত্যজগতে মোটামুটি পরিচিতি লাভ করছেন মাত্রই। হঠাৎ কবির কলকাতার বাউণ্ডুলে জীবনের মাঝে যতিচিহ্নের আবির্ভাব ঘটে।

১৯৭৪ সালে পিতার অসুস্থতার খবর পেয়ে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন। অতঃপর পিতার মৃত্যুর পর কলকাতার দীর্ঘদিনের চর্চিত জীবনের বাঁক বদল করে মাতৃআজ্ঞা শিরোধার্য মেনে আবদ্ধ হলেন বিবাহ বন্ধনে। স্ত্রী এককালের ছাত্রনেত্রী কামরুন্নেসা চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পাস করে তখন একটি বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যক্ষা। বিদুষী স্ত্রী অল্পদিনেই টের পেয়ে যান তাঁর স্বামী অন্য দশজনের মতন নয়, বৈষয়িক বা জাগতিক বিষয়ের প্রতি একেবারেই মোহহীন কবির সকল অনুরাগ, আগ্রহ, ভালোবাসা শুধুই বইয়ের জগতের প্রতি, সাহিত্যের প্রতি, সৃষ্টির প্রতি। সুতরাং, কবির সংসার ও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সরে আসলেন পেশাগত জগৎ থেকে, নিজে বরণ করে নিলেন সংসারের সকল দায়িত্ব পালনের কণ্টকাকীর্ণ পথ, আর কবির জন্য তৈরি করে দিলেন একটি মসৃণ পথ, যেপথ ধরে কবি খুব সহজেই ডুবে থাকতেন আরাধ্য সেই জাদুবাস্তবতার জগতে... বইয়ের জগতে... কাব্যচর্চার জগতে... শিল্পসাহিত্যের জগতে।

এসময় কবি বেলাল চৌধুরী জীবনধারণের জন্য পত্রিকা সম্পাদনাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সেই তালিকায় ছিল পল্লীবার্তা, টুডে, তারকালোক, সচিত্র সন্ধানী, কালি ও কলম এবং ভারত বিচিত্রার মতন মানসম্পন্ন ও জনপ্রিয় পত্রিকা। পরবর্তীতে কিছুদিনের জন্য সম্পাদনা করেছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্যপাতা। নিয়মিত কলাম লিখতেন দেশের অনেক জাতীয় দৈনিক পত্রিকায়। লিখতেন বল্লাল সেন, ময়ূরবাহন, সবুক্তগীন ছদ্মনামেও। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সকল নামি-দামি কবি সাহিত্যিকরা। পাশাপাশি নিজ উৎসাহে তরুণ প্রজন্মের শিল্পী সাহিত্যিকদের প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্র তৈরির কাজে থাকতেন সদা সচেষ্ট। কাজ করতেন দুই বাংলার সাহিত্যের সেতুবন্ধরূপে। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যকে পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের কাছে পরিচিত করানোর ক্ষেত্রে ছিল তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ছিলেন জাতীয় কবিতা পরিষদ ও পদাবলী কবিতা সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর সময়কালে প্রগতিশীল সকল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। নিজের সৃষ্টির প্রতি উদাসীন কবির প্রকাশিত গ্রন্থের মোটামুটি একটা হিসেব করা গেলেও অগ্রন্থিত লেখার সংখ্যা অগণন। কবিতা, গদ্যনির্ঝর, তরজমা, সম্পাদনা, শিশুসাহিত্য সবমিলিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের অধিক।

এহেন সৃষ্টিসুখের আনন্দে মত্ত কবির জীবনে বড় ধরনের বাঁকবদলের খড়গ নেমে আসে ১৯৯৬ সালে স্ত্রী বিয়োগের মাধ্যমে। সদ্য শৈশব পেরুনো তিন সন্তানদের কে কোন ক্লাসে পড়ে, তা নিয়ে সদা বিড়ম্বনায় পড়া কবি তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন নিজের তিল তিল করে গড়া জাদুবাস্তবতার স্বপ্নিল মায়াজাল থেকে। সন্তানদের সঠিক পথে রেখে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য একেবারেই অচেনা পথে চলতে গিয়ে হোঁচটও খেয়েছেন বারকয়েক। তবে প্রচণ্ড মানসিক শক্তির জোরে তাদের আঁকড়ে ধরে এগিয়ে গিয়েছেন লক্ষ্যে। পরবর্তীতে সেকাজেও যে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, সেকথাও বলা যায় না।

কবি বেলাল চৌধুরীকে নিয়ে তাঁর পরিচিত মহলের সবচেয়ে চেনা চিত্রটি ছিল—ঘাবড়ে যাবার মতন, উপচেপড়া বইপত্রের মাঝে, ঘরের আকারের সাথে বেমানান একটি বিশালাকার টেবিলকে সামনে নিয়ে বসে তিনি লিখেছেন বা পড়ছেন। আর পরিবারের মানুষদের কাছে এই দৃশ্যটি দেখার কোনো নির্দিষ্ট সময় ছিল না। এক জীবনে সংগ্রহ করা বই বলতে এখনকার শিক্ষিতসমাজের বৈঠকখানায় পরিপাটি করে রেখে সাজানো বইয়ের মতন নয়। একমাত্র স্নানঘর ছাড়া সকল কামরার দেয়াল দেখাই দুষ্কর ছিল, এমনকি রান্নাঘরের স্থানও কখনো কখনো দখল করে নিত বই। বাংলাদেশ এবং ভারত তো ছিলই, পৃথিবীর উন্নত অনুন্নত যত দেশ ভ্রমণ করেছেন তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু আবর্তিত হতো সেসব দেশের নতুন এবং পুরাতন বইয়ের দোকানে। বেছে বেছে সংগ্রহ করতেন পছন্দের বিরল সেসব বই। তাছাড়া সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কবির বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-অনাত্মীয় শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকেই ছিলেন তাঁর সংগৃহীত বইয়ের জোগানদারের তালিকায়।

পুরস্কার যদি সৃষ্টিশীল কোনো মানুষের সাফল্যের মাপকাঠি হয়, কবির নিজ বয়ানে তিনি সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি পেয়েছেন বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার, বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্হানের খ্যাতিমান বা অখ্যাত অজস্র মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা। আর প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কারের মধ্যে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, নীহাররঞ্জন স্বর্ণপদক, কবিতালাপ পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার, মনিরউদ্দীন ইউসুফ পদক, জাতীয় প্রেসক্লাব সম্মাননা, সংহতি পদক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক সম্মাননা, দৈনিক আমাদের সময় সম্মাননা, কৃত্তিবাস ষাট বছর পূর্তি সম্মাননা, বাংলা একাডেমির মাযহারুল ইসলাম কবিতা পুরস্কারসহ আরও অনেক সম্মাননা।

২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল দীর্ঘ চার বছর নানান ধরনের বার্ধক্যজনিত রোগের সাথে বোঝাপড়া শেষে জীবনে সর্বশেষ বাঁকবদল করে কবি বেলাল চৌধুরী যাত্রা করলেন অনন্তের পথে। সাথে নিয়ে গেলেন মানুষের ভালোবাসা। যার প্রমাণ পাওয়া যায় সেসময়কার জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, ডিজিটাল গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার ও প্রচারণায় এবং অসংখ্য মানুষের শোকগাথা বা স্মৃতিচারণে। কবির সারা জীবনে, বিশেষ করে শেষ চার বছরের অসুস্হতার সময় থেকে শেষযাত্রা পর্যন্ত তাঁর বন্ধু-বান্ধব বা শুভানুধ্যায়ীদের তাঁকে নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, সহযোগিতা ও ভালোবাসার কথা লিখতে গেলে আয়তনে তা একটি ঢাউস উপন্যাসকেও পেছনে ফেলবে। তেমনি আরেকটি বৃহৎ গ্রন্থ রচনা করা যায় শুধু কবি বেলাল চৌধুরী ও তাঁর সংগৃহীত বইয়ের আখ্যানকে বিষয়বস্তু করে। সে দায়িত্ব আপাতত ভবিষ্যৎ সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়ে পরিশেষে একটি তথ্য দিয়ে এই লেখাটির যবনিকা টানা যেতে পারে। কবি বেলাল চৌধুরীর মৃত্যুর পর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে, এক সময় বিরক্তির উদ্রেক মনে হওয়া তাঁর সংগৃহীত বইয়ের বিপুল ভান্ডারটি ধীরে ধীরে অমূল্য রত্নখনি হয়ে উঠেছে। শুধু বিচিত্র জ্ঞানের আধার বা বিরল সংগ্রহের কারণে নয়, এই বইগুলোর প্রতিটির মধ্যে পাওয়া যায় একজন বৈচিত্র্যপূর্ণ কবির সমগ্র জীবনের স্মৃতিমাখা ঘ্রাণ, অনুভব করা যায় হারিয়ে যাওয়া জনকের স্পর্শ।