ফ্রানৎস ফানোঁ-এর জন্ম মার্তিনিক দ্বীপে। তখন এ-দ্বীপ ছিল ফরাসি উপনিবেশে। উপনিবেশে জন্ম, বড়ো হয়ে ওঠা হলেও তিনি ওই জীবন থেকেই বিউপনিবেশায়নের সূত্র সৃষ্টি করেছেন। প্রচলিত শিক্ষার বাইরে তার বিদ্যাবুদ্ধি অর্জিত হয়েছে পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা ও জীবন থেকে। বড়ো হতে হতে তিনি নিবিড় অবলোকন করেছেন ঔপনিবেশিক শাসন, নির্যাতন ও শোষণ। জেনেছেন ঔপনিবেশিক কীভাবে সমাজে ঘৃণা ও হিংসা ছড়িয়ে শাসন চলমান রাখে। ক্ষমতার চারপাশে উপনিবেশিত জনগণের মধ্যেই তৈরি হয় সমর্থকগোষ্ঠী। ফানোঁ লক্ষ করেছেন শ্বেতাঙ্গ শাসকদের প্রতি কালো জনগোষ্ঠীর ভক্তি। তারা সাদাদের মতো চলন-বলন শিখতে শুরু করে। এ সবই হলো ঔপনিবেশিক ক্ষমতা বিস্তারের ফল। একইসঙ্গে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন নিজের ভূমি, সম্পদ ও সংস্কৃতির ওপর অধিকার হারানো মানুষের জীবন। সবই নিয়ন্ত্রিত হতো শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা। গায়ের রং যেখানে নাগরিক অধিকারের মানদণ্ড। ফলত অবনমন ও অপমানে উপনিবেশিতরা মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ জীবন যাপন করেছে বছরের পর বছর। এসব নিয়ে ফানোঁ ব্যাখ্যা ও যুক্তি উত্থাপন করেছেন মূলত 'দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ' ও 'ব্লাক স্কিন হোয়াইট মাস্কস' এ দুটি গ্রন্থে। বলা যায় এ দুটি বই একটি অপরটির পরিপূরক।
পেশায় ফানোঁ ছিলেন চিকিৎসক। তবে তিনি জীবনের ক্ষুদ্র পরিসরে সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি, নৃবিজ্ঞানের প্রয়োজনীয় পাঠ গ্রহণ করেন। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজ বিশ্লেষণে তার গভীরতা স্পষ্ট। বস্তুত চিকিৎসাবিজ্ঞান সহযোগে ক্ষমতাকাঠামো, ব্যক্তি ও সমাজমনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণে সমর্থ হন। এর আলোকে তিনি সহিংসতা ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। যা এখনও পাঠক, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতিকর্মীকে আকৃষ্ট করে। মূলত এখানে ফানোঁ উত্থাপিত সহিংসতা বিষয়ে দ্বিধা ও আলাপ উপস্থাপন করা হয়েছে।
বস্তুত ফানোঁর সহিংসতাতত্ত্বের বিরুদ্ধে আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে সংগত কারণে। তিনি স্বাধীনতা, বিপ্লবের জন্য সহিংসতার সুপারিশ করেও তা স্পষ্ট করেননি। যে কারণে যত প্রশ্ন ও দ্বিধার উদ্ভব। কী ধরনের সহিংস কার্যক্রম, এর চরিত্রই বা কেমন তা ব্যাখ্যা করেননি। বিশেষত বিপ্লব সংঘটনে এমন সহিংস আন্দোলন বা কর্মসূচি লক্ষ করেছি। আবার সকলক্ষেত্রে একই লক্ষ্যে, বিশেষত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় পরিচালিত হয় না। সেক্ষেত্রে বিপ্লবের নামে সন্ত্রাস বা কাঠামো ভাঙার নৈরাজ্যবাদকে উসকানি দেওয়া হয়ে থাকে। স্বভাবত প্রচলিত সন্ত্রাসী ব্যক্তি ও সংগঠন এ সহিংস কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। ফলে ঢালাও তার যুক্তি আমরা গ্রহণ করতে পারি না। কারণ তার সমকালে নিজস্ব ভূগোলে ঔপনিবেশিক যেমন সন্ত্রাসী ছিল; এর বাইরে জনগণের মধ্যেও ছিল স্বপ্রণোদিত সহিংসতা।
২.
ফানোঁ বলেছেন, হিংসাত্মক কার্যক্রমে জনগণের ঐক্য রচিত হয়। তা বাস্তবত সত্য তবে সবসময় সত্য নয়। মানুষ সকল হিংসাত্মক কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ থাকবে এর পেছনে নিশ্চিত যুক্তি নেই। আবার তিনি বলেছেন এ সহিংসতা হলো মানসিক অসুস্থতার ফল। তার যুক্তি হলো, এ সহিংসতার মধ্য দিয়ে বঞ্চিত জনগোষ্ঠী মানসিক অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভ করতে পারে। এর পেছনেও প্রতিষ্ঠিত কোনো যুক্তি নেই। স্বল্প সময়, পরিসর, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা সত্য হতে পারে। সার্বিক মুক্তির জন্য কার্যকর নয়। কারণ মানুষের নিজেকে বদলানো বা পুনর্নির্মাণের পথ কিন্তু সহিংসতা নয়। হেগেল ও মার্কসের ভাষায় তা হলো: সৃজনশীলতা ও শ্রম। এটা সত্য যে, ফানোঁ আন্তরিকতার সঙ্গে স্বাধীনতা অর্জন ও উপনিবেশ উচ্ছেদে সহিংস কর্মসূচির কথা বলেছেন। কিন্তু তার ব্যাখ্যায় মূলত এ ধরনের সহিংসতা বিপ্লবাত্মক কোনো অর্থ বহন করে না। আমরা স্বীকার করি যে, বিপ্লব ও বিক্ষিপ্ত সন্ত্রাসের লক্ষ থাকে। কিন্তু এ দুইয়ের লক্ষ কি এক? নিশ্চয়ই না। বরং সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রতিক্রিয়ায় সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। আমরা তার যুক্তি আপাত মেনে নিয়ে বলি, ফানোঁর সহিংসতাতত্ত্ব মূলত পরিশ্রুতকরণের প্রতিষেধক ও প্রক্রিয়া। কেননা তার লক্ষ ছিল, তার নিজ দেশ ও বিশ্বের মানুষের মুক্তি এবং স্বাধীনতা। যেখানে তিনি দেখান যে, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র নির্মাণে সংস্কার কোনো কাজে আসে না। তার যুক্তি হলো, মুক্তি ও স্বাধীনতা একত্রে হতেই হবে; কারণ একটি অপরটির পরিপূরক। ফলে স্বাধীনতা অর্জিত হলেও বিপ্লবী সংগ্রাম চলমান রাখতে হবে। এ সংগ্রাম অব্যাহত না রাখলে পুরোপুরি মুক্তি নিশ্চিত হয় না। এ জন্য টেকসই সমাজ নির্মাণেও তা বজায় রাখা প্রয়োজন।
৩.
উপনিবেশ-বিরোধী সহিংসতা একার্থে প্রতি-সহিংসতা। কারণ উপনিবেশ নিজেই সহিংস ও সন্ত্রাসী। ইতিহাসের শিক্ষা হলো কোনো উপনিবেশই বিনা সহিংসতায় নিষ্ক্রান্ত হয়নি। ফলে ফানোঁ হিসে ব করেই উপনিবেশমুক্তকরণে সহিংসতার পথ গ্রহণ করেছেন। বিশ্বে উপনিবেশ ও পুঁজিবাদ যৌথ আয়োজনে নানামুখী হিংসা প্রতিষ্ঠা করেছে। হিংসা প্রতিহিংসার প্রতিপাদনে ফরাসি বিপ্লবের কথা বলা যায়। ফরাসি বিপ্লব অহিংস ছিল না। যেখানে ক্ষমতাধর শক্তির বিপক্ষে লড়াই করতে হয়েছে। মার্তিনিকে তখন তো উন্নয়নের নামে সামন্ত ও পর্যায়ক্রমে পুঁজিবাদ প্রচলিত হয়েছে। সেকালের ক্ষমতাবান ও শাসকরা বিপ্লব ঠেকাতে হিংসাত্মক পন্থাই গ্রহণ করেছে। হিংসার বিপরীতে অহিংসা বা হিংসা ঠেকাতে অহিংস কার্যকর কি কোনো পথ হতে পারে? এমন প্রমাণ বিশ্বে নেই। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের উদাহরণ দিতে পারেন। স্মরণীয় এটা কোনো বিপ্লবী কর্মসূচি ছিল না। এ জন্য আলাদা সংগঠন কাজ করেছে। তবে ওই অহিংস আন্দোলনের পেছনে রয়েছে রক্তাক্ত ইতিহাস। ফলত ফানোঁ জাতীয় মুক্তির প্রশ্নে সহিংসতার কথা বলেছেন।
ফানোঁ কি ব্যক্তিগত জীবনে হিংসুটে বা সন্ত্রাসী ছিলেন? তার জীবনী লেখকদের অনেকেই উল্লেখ করেছেন তিনি কখনোই সন্ত্রাসী ছিলেন না। তা হলে কেন তিনি সন্ত্রাসী পন্থার পক্ষে যুক্তি দেখালেন? মূলত তিনি ছিলেন মানবিক। তিনি উপনিবেশ থেকে মুক্তি ও উন্নয়নের নামে শ্রেণিবিভাজনের বিরোধিতা করেছেন মাত্র। যেখানে তার চিন্তা নিয়ে দ্বিধার উদ্ভব হয়েছে। যেটাকে তিনি বলেছেন পুঁজিবাদ ও উপনিবেশের সহিংসতা। এ হিংসা হিংসারই জন্ম দেয়। যে হিংসার হাতিয়ার বিবর্তিত হয়েছে, এর রয়েছে অনেক টুল।
প্রাকৃতিক সম্পদের লোভে উপনিবেশ একধরনের জনসন্তুষ্টির কর্মসূচি পরিচালনা করে। উৎসাহিত করে উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য হিংসামূলক অনেক কার্যক্রম। ফলে এ সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ দ্বন্দ্ব চলমান রাখতে ঔপনিবেশিক শক্তি ও চরদের ব্যক্তি এবং সামষ্টিক স্বার্থ থাকে। ফানোঁ গবেষক আলবার্তো মেম্মি দেখিয়েছেন, সাধারণত উপনিবেশিতরা ডান ও বামপন্থায় বিভক্ত থাকে। যেক্ষেত্রে ডানপন্থিরা উপনিবেশ মেনে নেয়, সহযোগিতা করে। মেম্মির ভাষায় ঔপনিবেশিক শক্তির চরিত্রই হলো নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা। তাহলে উন্নয়ন ও নির্যাতন একসাথে চলমান থাকে কী করে। এক সময় সামন্ত শাসনই দাসপ্রথার জন্ম দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে দাসপ্রথার সুযোগ গ্রহণ করে পুঁজিবাদ।
ফানোঁ স্পষ্ট বলেছেন, উপনিবেশের ভেতর থেকে উপনিবেশিতদের মধ্যে প্রতিরোধী শক্তির জন্ম হয়। এখানেই দ্বন্দ্ব। ওই উপনিবেশের শক্তি, কৌশল জেনে নিতে হয় এর ভেতর থেকেই। উপনিবেশোত্তর মুক্ত সমাজ তৈরি করা যায় যদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়—স্বাধীনতা, নবজাগরণ ও বিউপনিবেশায়ন। এজন্য তিনি সুপারিশ করেছেন ব্যক্তির বিউপনিবেশায়ন ও জাতীয় উত্থানের। এক্ষেত্রে আত্মপরিচিতির প্রশ্নও স্পষ্ট করতে হয়। অবশ্যই নিজের পরিচয় নিয়ে হীনম্মন্যতাকে অপনোদন করে। যদি কোনো জাতি স্বাধীনতা, মুক্তি অর্জন করতে চায়; উপনিবেশমুক্ত হতে চায়, তাহলে প্রতিরোধ, বিপ্লবী কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হয়। দাঁড়াতে হয় দমনের বিরুদ্ধে।
উপনিবেশের ভেতর দিয়ে হয়ে ওঠা মানুষ, কোনো পরিবর্তন চিন্তা করতে পারে না। আফ্রিকার জন্য যে কারণে তিনি নতুন মানুষ দাবি করেছেন। উপনিবেশিত মানুষের মনোজগত বিশুদ্ধ না হলে তাকে দিয়ে নতুন জমি চাষাবাদ করা যাবে না, এটাই সত্য। যাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তা এবং একইসঙ্গে আগামীর স্বপ্ন রয়েছে। ওই বন্দিত্ব থেকে বের হতে গেলে ফানোঁ নির্ণীত করেছেন আত্মসত্তার জাগরণ। যাতে রয়েছে স্বশাসন ও স্বীয় সম্পদ ব্যবহারের সক্ষমতা।
একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি যা দেখেছেন গভীর ও নিবিড়ভাবে। আলজেরিয়ার হাসপাতালে যখন চিকিৎসক তখন তিনি লক্ষ করেছেন, জনগণ শুধু বাহ্যিকভাবেই অসুস্থ নয়, তারা মানসিকভাবেও বিধ্বস্ত। তাদের জীবন বলে কোনো ধারণাই নেই। সেখানেই তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন গেরিলা যুদ্ধের। এ যুদ্ধে অংশগ্রহণে জনগণের উন্নত মানসিক স্বাস্থ্য জরুরি। কারণ তারা মানসিকভাবে অসুস্থ আবার যুদ্ধে শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে যুদ্ধ করতে পারবে না। এক্ষেত্রে আবার মানসিক আঘাতও বিবেচনা করতে হয়।
বস্তুত উপনিবেশিত অসুস্থতার বাস্তবতায় তিনি যে সহিংসতার কথা বলেছেন, তা কতটা বাস্তবসম্মত? যেখানে সংগঠিত কোনো কমান্ড বা রূপরেখা নেই লেনিনের মতো। আমরা তাও দেখেছি রক্তদান হলো, মানুষ স্বেচ্ছায় প্রাণ দিল, তাতে তো সেই স্বাধীনতা ও সংগ্রাম টেকসই থাকছে না। স্বাধীনতা ও বিপ্লবোত্তর সমাজে আবার এর বিরুদ্ধে অভিমত বা পাল্টা বিপ্লবও হয়েছে। লক্ষণীয় যে, বিপ্লবাত্মক কর্মসূচি ব্যতীত শুধু সহিংসতা জনগণের মুক্তি দিতে পারেনি। ফলত সহিংসতা রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক পরিবর্তন করতে পারেনি।
যে কারণে চিকিৎসার বিষয়ে তিনি সুপারিশ করেছেন। যাতে মানুষের মানসিক ভাব চিন্তা স্পষ্ট থাকে। এ ভারতবর্ষ তো সাক্ষাৎ উদাহরণ। উপনিবেশমুক্ত হলো, কিন্তু জনগণের সার্বিক মুক্তি তো হলো না; মনস্তাত্ত্বিকভাবে অসুস্থ থেকেই গেল। উপনিবেশসমূহ যেসব জঞ্জাল রেখে গেল এখানে, তা আরও পল্লবিত হলো নতুনভাবে। বিচিত্র হিংসা নিয়েই যেখানে মানুষের বসবাস।
তবে উপনিবেশমুক্তির লড়াই থেকে চূড়ান্ত মুক্তির লক্ষে ফানোঁর যুক্তি একটি রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করে দেয়। যা দিয়ে নিজেকে নিজের মতো প্রস্তুত করা যায়। উপনিবেশকের সাথে দীর্ঘকাল যাপনের মধ্যে অংশত সাংস্কৃতিক সংযোগ স্বীকার করতে হয়। উপনিবেশের সদর্থক দিক বোঝাতে কেউ কেউ সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এর মধ্যে একটা চালাকি আছে। উপনিবেশের সমর্থক দেশীয় বুর্জোয়ারা সাধারণত এমন প্রচার জারি রাখে। তবে বিভাজন যেখানে জেগেই থাকে সেখানে এই আপাত সংশ্লেষ মূল্যহীন। ফানোঁ দেখালেন যে, গায়ের রঙ যেখানে বিভাজনের চিন্তাকে সকল সময় বহমান রাখে। যা কিনা পরিচয়ের মানদণ্ড হয়ে ওঠে। ফলে কৃষ্ণাঙ্গরা দেহের রঙের জন্য অপমানিত হয়েছে, নিজেকে অবনমিত করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মানসিক অধঃপতনকে নিরীক্ষা করেছেন ফানোঁ। তিনি দেখেছেন কৃষ্ণাঙ্গরা নিজের অপমানকে ঢেকে রাখতে সাদা মুখোশ পরেছে, ভান করছে শ্বেতাঙ্গদের অনুসরণে। এ অনুসরণ, অনুকরণ, মিথ্যা পোশাক একটি জাতিকে ট্রমার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তারা আর নিজের সাংস্কৃতিক, জাতিগত পরিচয়ে দাঁড়াতে পারছে না। নিজের ভাষা ভুলে ব্যবহার করছে ফরাসি ক্রেয়ল। এই যে দেখা-না-দেখা শৃঙ্খলের বিপক্ষে মূলত তিনি বিপ্লব বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়েছেন। এটা সহজ নয় বলেই তার পক্ষপাত সশস্ত্র সংগ্রামে। অর্থাৎ ট্রমা, আবরণ, জাদু মুছে ফেলতে প্রয়োজন হিংসাত্মক কার্যক্রম। এরপর নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাসের ওপর স্বতন্ত্র ভিত্তি রচনা করা।
সংকট হলো উপনিবেশ এমনিতেই বিভাজিত সহিংসতা তৈরি করে। শঙ্কা যেখানে থাকে যে, স্বাধীনতা ও বিপ্লবের পর এ সহিংসতা আবার জেগে ওঠা স্বাভাবিক। আমরা দেশে দেশে তা লক্ষ করেছি। ফলত ফানোঁ নিজেও এ সহিংসতার পক্ষে থাকলেও তিনি আবার এটাকে নিরঙ্কুশ করেননি। এখানেই তার দ্বৈরথ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বস্তুত এ বিপ্লবী কার্যক্রম ও সহিংসতার মাধ্যমে বিউপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া স্পষ্ট হয় না বলেই এসব প্রশ্ন ও ভিন্নমতের উৎস। যে কারণে পাঠকের কাছে দ্বিধা তৈরি হয় যে সহিংসতা যেখানে সর্বাত্মকভাবে সমাধান নয়; সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণই মুখ্য, সেখানে সহিংসতা কেন? এছাড়াও ক্ষমতার সঙ্গে একাট্টা থাকে নাগরিক অংশ ও স্বার্থপর গোষ্ঠী। যারা উপনিবেশের সমর্থক হিসেবে সুবিধা পেয়ে থাকে। অতএব তিনি নিজেও বলেছেন প্রাথমিকপর্বে উপনিবেশ মুক্ত করতে দরকার সহিংস পন্থা। এছাড়া বিপ্লবী সহিংসতা ব্যতীত ক্ষমতার সহিংসতাকে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র তার এ-বক্তব্যকে সমর্থনও করেছেন।
ফানোঁর সতর্কতা হলো, যারা একসময় নাগরিক সমাজের সুবিধালোভী অংশ উপনিবেশের সমর্থক থাকে উন্নয়নের অভিনয়ে। তারা আবার সহিংসতার সুযোগে নেতৃত্বে ফিরে আসে কিনা। সাধারণত এই বর্ণচোরা বুর্জোয়ারা আবার কর্তৃত্বে ফিরে আসে। তাহলে উপনিবেশোত্তর সমাজের কোনো মূল্যই থাকে না। সন্দেহ ওইখানেই দানাবাঁধে যে, উপনিবেশবিরোধী লড়াই সংগ্রাম, সহিংসতা ওই শ্রেণির স্বার্থে নতুন জমি তৈরি করে দিতে পারে। তা হলে সাধারণ মানুষের কোনো লাভ হয় না। এজন্য তার যুক্তি হলো মানসিক অবস্থা শোধনে সাংস্কৃতিক প্রতিষেধক ব্যবহার। যে সংস্কৃতি জাতির পরম্পরায় বহমান। উপনিবেশ মূলত এই স্থানিক সংস্কৃতিকে অদৃশ্য করে ফেলে। বিউপনিবেশায়নের চলমান সংগ্রামে স্বীয় সংস্কৃতির বোঝাপড়া অত্যন্ত প্রয়োজন। না হলে ওই রাজনৈতিক জটিলতা থেকেই যায়। বস্তুত ফানোঁর সহিংসতাতত্ত্বে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলেও চিন্তার নতুন জানালা খুলে দেয়।