অমর একুশে বইমেলা ২০২৬

মুনাফা মুখ্য, মান-সম্পাদনা গৌণ : অহ নওরোজ

উমামা জামান মিম: মেলায় আপনার নতুন কী বই প্রকাশিত হচ্ছে?

অহ নওরোজ: এ বছর বইমেলায় আমার অনূদিত নোবেলজয়ী জার্মান লেখক হ্যারমান হেসের প্রবন্ধগ্রন্থ 'নির্বাচিত বিশ্বসাহিত্য : পাঠ ও গ্রন্থাগার পরিকল্পনা' প্রকাশিত হয়েছে। বইটি আমি মূল জার্মান থেকে সরাসরি বাংলায় অনুবাদ করেছি। এছাড়া আগে প্রকাশিত কবিতার বই মেলায় পাওয়া যাবে।

প্রশ্ন: বইগুলো নিয়ে পাঠকদের কিছু বলুন? বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কি এই বইগুলোর বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করেছে?

উত্তর: হ্যারমান হেসে যদি বিশ্বসাহিত্যের একটি পাঠাগার করেন তাহলে সেখানে কোন বই রাখবেন এবং কেন সেসব আলোচনা থেকেই বইটি লেখা। প্রথম পড়ার পরেই মনে হয় এরকম বই বাংলা ভাষার পাঠকদের জন্য বহুদিনের আকাঙ্ক্ষিত। এজন্য বইটি অনুবাদ করে ফেলি। পরে বইটির কপিরাইট বিষয়ক অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকাশকের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া গেছে। বিশ্বসাহিত্যের বইয়ের দুনিয়ায় বইটি পাঠকদের জন্য কম্পাসের মতো কাজ করবে বলে আমাদের ধারণা। 

এছাড়া বইমেলায় থাকছে আমার সম্প্রতি প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘কম্বুরেখপদাবলি’। সাধারণত সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আমার কবিতাকে প্রভাবিত করে না। ঠিক এই ব্যাপারগুলোকেই এড়িয়ে আমাদের জীবনের ভেতর যে প্রাকৃতিক আক্ষরিকতা জমে আছে সেগুলো আমি কবিতার মাধ্যমে খুঁজতে চাই।

কিছু বোধ আছে যেগুলো আমাদের বিদিত, আপাতভাবে তাদেরকে সহজ মনে হলেও তাদেরকে বুঝতে গেলে জড়িয়ে আসে, ঠিক এরকম কিছু ব্যাপারকে ভাষার শরীরে আয়ত্ত করার প্রচেষ্টার ভেতর দিয়ে ‘কম্বুরেখপদাবলি’র কবিতাগুলো রচিত।

প্রশ্ন: শুরু থেকেই মেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছিল, এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইভেন্টের প্রতি কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা আছে? 

উত্তর: অবহেলা আছে বলে মনে হয় না। চেষ্টা তাদের থাকে, কিন্তু মনোযোগ ও প্রয়াসের অভাব থাকায় মেলা সুষ্ঠু হয় না। সেসবের পেছনে দক্ষতা প্রবলভাবে দায়ী। বিগত বইমেলাগুলোর দিকে তাকালে সেটা স্পষ্ট হবে। প্রতিবছরই মেলায় একাধিক অব্যবস্থাপনা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। আমার ধারণা, এর কারণ, কর্তৃপক্ষ মেলা পরিচালনার জন্য যে দল তৈরি করে, তাদের মধ্যে করিৎকর্মা লোকের অভাব। অধিকাংশেরই এ বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই। বাংলা একাডেমিতে চাকুরির সুবাদে অনেকে মেলা পরিচালনার দায়িত্ব পায়, কিন্তু একাডেমিতে চাকুরি করার যোগ্যতা আর মেলা পরিচালনার দক্ষতা তো এক নয়। এ জন্য উচিত তাদেরকে বইমেলা বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ করিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করা।

প্রশ্ন: সময় কমিয়ে আনা ও রমজানের কারণে মেলায় কেমন প্রভাব পড়বে?

উত্তর: আমার মনে হয় না বিশেষ প্রভাব পড়বে। রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূলে থাকলে পাঠক-লেখক-প্রকাশক সবাই আসবেন। আসর জমে উঠবে। বইমেলা কেমন হবে এটা মূলত নির্ভর করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর, অন্য কিছুর উপরে নয়।

প্রশ্ন: মেলায় এবং সারা বছর যত বই প্রকাশিত হয় তার ডিজিটাল ডেটাবেইজ কি বাংলা একডেমি বা কোনো কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করতে পারে?

উত্তর: সেটা বাংলা একাডেমি করতে পারে। একাডেমি ইচ্ছা করলে সেটা কঠিন কিছুও না।

প্রশ্ন: প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে কিন্তু বইয়ের মান ও সম্পাদনা নিয়ে প্রকাশকরা কতটা সচেতন বলে মনে করেন?

উত্তর: এ বিষয়ে বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ প্রকাশক অসচেতন। তারা অর্থ গ্রহণ করে বই করে। লেখক বইয়ের পেছনে লগ্নি করে, প্রকাশক সেই অর্থ দিয়ে কাগজ কিনে, ছেপে, বাঁধাই করে লেখককে লগ্নি অনুসারে বই সরবরাহ করে। একদম সরল ব্যবসা। এই ক্রীড়ার ভেতরে প্রকাশকের মুনাফা লুকিয়ে থাকে। এসবের বিনিময়ে বইমেলায় প্রকাশক তার স্টলে লেখকের এক-দুই কপি বই রাখে। এখানে লেখককে বই সরবরাহ করে পাওয়া মুনাফার ব্যাপার মুখ্য, মান-সম্পাদনা গৌণ। অধিকাংশ প্রকাশক-লেখকের ব্যাপার এরকমই।