১.
আমি শান্ত—
এক নির্জন দুপুরে
পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা
তালগাছটির মতো।
আমার ভেতর দিয়ে
হাওয়া যায়,
কিন্তু সব কথা
পাতার শব্দ হয়ে ওঠে না।
আমি শান্ত—
সন্ধ্যার আগে নদীর বুকে
স্থির হয়ে থাকা
শেষ আলোটির মতো।
কেউ যদি কাছে আসে
আমি ঢেউ নই,
জলের গভীরে জমে থাকা
একটি নীরব প্রতিচ্ছবি।
আমার অভিমান
মেঘ হয়ে আকাশ ঢাকে না,
শিশির হয়ে
ঘাসের ডগায় নেমে আসে।
আমি শান্ত—
তবু এই শান্তিরও
একটি গভীর শব্দ আছে,
যা শোনা যায় শুধু
যারা হৃদয় দিয়ে শোনে,
তাদের নিঃশব্দ প্রার্থনায়।
২.
জানালা দিয়ে সন্ধ্যা দেখি—
সূর্যজ্যোতি আলিঙ্গন করে দিগন্তে
দলবেঁধে পাখিরা নীড়ে ফেরে
পতঙ্গের স্পর্শে কেঁপে ওঠে ঘাসের শরীর
কিশোরেরা বাড়ি ফেরে খেলার মাঠ থেকে
আর দূরত্ব ঘুচায় বসন্ত আসবে আসবে বলে।
অথচ আমাদের দূরত্ব যেন জানুয়ারি মাসের মতো দীর্ঘ।
আর অশ্বত্থ গাছটির দিকে চেয়ে দেখি
আমার অপেক্ষার মতো ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে।
৩.
একদিন ভোরের আগে দেখলাম আমার ছায়া আমাকে ছেড়ে গেছে,
ধানক্ষেতের ওপারে পড়ে আছে তার পুরোনো জন্মসনদ।
কেউ তাকে কুড়িয়ে নেয়নি; কেবল শালিকেরা ঠোঁটে করে
নিয়ে গেছে আমার নামের শেষ অক্ষরটি।
তারপর নদী এলো, জলের বদলে বহন করছিল অন্ধ জানালা,
প্রতিটি জানালার ভেতর একটি করে নিঃশব্দ ঘর।
আমি হাত বাড়ালাম; জল নয়, ফিরে এলো বহুদিনের মৃত বিকেল,
তার গায়ে লেগে ছিল পোড়া মাটির গন্ধ।
সেই রাতে রাজা এলেন, পায়ে কোনো শব্দ নেই,
হাতে একটি মুকুট, যেন টুপ করে আকাশ থেকে পড়া লোহার পাখি।
বললেন, এই শহর, এই ক্ষত, এই মৃত মানুষের হিসাব—সব তোমার।
আমি দেখলাম মানচিত্রের ভেতর ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে আরেকটি কবর।
আমি রাজভাষা জানি না; জানি কেবল শীতের শেষে
কোন গাছের নিচে দাঁড়ালে নিজের মৃত্যুকে একটু কম একা লাগে।
স্বর্ণের থালা আমার দিকে এগিয়ে এলে তার ভেতর দেখলাম
একটি ক্ষুধার্ত শিশু যে নিজের মুখটাকেই চিনতে পারছে না।
রাত তখন পৃথিবীর শেষ দরজায় কড়া নাড়ছে;
কেউ দরজা খুলছে না, তবু ঘরগুলো একে একে ভরে যাচ্ছে অন্ধকারে।
দূরে একটি প্রদীপ নিভে গেল—আমি বুঝলাম, সেটিই আমার ঠিকানা।