সকালে উঠেই হাঁটতে বেরিয়ে যাই। লিছু আমার পেছনে কিছুক্ষণ হেঁটে, আগে আগে দৌড়াতে লাগল। এক পর্যায়ে আমি কিছুটা ভীত হয়ে উঠলাম এই কারণে যে, যদি কোনো গাড়ির নিচে চাপা পড়ে! আমি তাকে নিয়ে আবার বাড়ি ফিরে এসে ক্যাতারজিনাকে বললাম, “কী করি বলো তো, লিছু তো আমার পিছু ছাড়ছে না।”
“কোনো চিন্তা করো না। এভাবে লিছু মানুষের সাথে সাথে হাঁটে, বৃদ্ধদের রাস্তা পার করে দেয়। গাড়ি দেখলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। খুবই সতর্ক।”
আমি ক্যাতারজিনার কথা শুনে আবারও রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি, এবং লক্ষ্য করি, গাড়ি রাস্তায় এলেই লিছু সতর্ক হয়ে যায় এবং এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে গাড়ি চলে না যাওয়া পর্যন্ত। কয়েক দিনে যেতে না যেতে এমন হলো যে, লিছু অনেক দূরে চলে গেলে আমি দুইবার তালি বাজালেই সে দাঁড়িয়ে যায়। আমি যদি হাত ইশারায় বলি যে আমি ওদিকে আর যাবে না, সে তখন ফিরে এসে আমাকে পাশ কাটিয়ে আমার সামনে দিয়ে বাড়ির দিকে দৌড়ায়। কখনো কখনো আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে আদর চায়। গায়ে হাত বুলিয়ে দিলে খুব খুশি হয়ে আবারও দৌড়াতে থাকে। রাস্তা ছেড়ে ক্ষেতের ভেতর ঢুকে কি যেন খোঁজো। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখি।
রাতে ঘুম হাওয়ায় অনেকটা ফ্রেশ লাগে। তবে ম্যালাটোনিন খেয়ে যদি ঘুম না হয়, তখন আমার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়ে। কিন্তু বাসায় ফেরা পর্যন্ত আমি বেশ ভালোই কাটাই। অতএব, একটা বিশ্বাস জন্মে যে গত কদিন ধরে যে অসম্ভব মাথা ব্যথা ছিলো আজ হয়ত সেটা থেকে রেহাই পাবো। ক্যাতারজিনা আমার করা অমলেট দিয়ে সকালের নাস্তা খেতে ভালোবাসেন। গত বছর এখানে এসে তাকে অমলেট করে দিয়েছিলাম। ফলে, বাসায় ফেরার সাথে সাথে তিনি বলেন, “হাসানআল, আজ বাসায় কিন্তু অনেকগুলো ডিম আছে।”
আমি বলি, “হ্যাঁ, আমি অমলেট বানাবো।”তিনি বাচ্চাদের মতো খুশিতে লাফিয়ে ওঠেন।
ইতোমধ্যে লক্ষ্য করি ক্ষেতের বড়ো বড়ো মরিচ ছিঁড়ে একটি ঝুড়িতে রাখা আছে, যদিও এগুলোতে ঝাল নেই। অতএব মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে আমার অমলেট তৈরি হয়ে যায়। সাথে দুই পিস পাউরুটি দিয়ে দুই প্লেটে দুজনের নাস্তা নিয়ে খাবার টেবিলে চলে আসি।
গতকালই ক্যাতারজিনার সাথে কথা বলে রেখেছিলাম যে আমার কম্পিউটার চার্জ করার জন্যে একটি অতিরিক্ত এডাপটার কিনতে হবে, তাছাড়া আমি একটি মোটা সোয়েটপ্যান্ট কিনতে চাই, কারণ রাতেই লক্ষ্য করেছি আমার রুম বেশ ঠান্ডা। পোল্যান্ডে যদিও এখনও হেমন্ত চলছে, নিউইয়র্কের চেয়ে তবুও বেশি ঠান্ডা। কাল থেকে যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে তাও থামার কোনো লক্ষণ দেখছি না। অন্যদিকে ক্যাতারজিনারও পোস্ট অফিসে যাওয়া দরকার। তাঁর বাড়ি থেকে মিলিস শহরের দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। সেখানেই আমরা দুপুরের আগে পৌঁছে যাই। স্থানীয় চাইনিজ রকমারি দোকানে আমাকে নামিয়ে দিয়ে তিনি পোস্ট অফিসে যাবার সময় বলে যান যে এখানে এসে আমাকে তিনিই খুঁজে নেবেন। কিন্তু দোকানে আমার দরকারি এডাপটার পাওয়া গেলো না, অগত্যা আমি একটি সোয়েটপ্যান্ট কিনে ক্যাশিয়ারকে জিজ্ঞেস করি পোস্ট অফিস কত দূরে? তিনি বলেন রাস্তার ওপারেই। ফলে, আমি নিজেই সেখানে চলে যাই এবং দেখি বিশাল লাইনের মাঝখানে ক্যাতারজিনা দাঁড়িয়ে বিরক্ত হচ্ছেন। আমাকে দেখেই বললেন, “দেখো তো উটকো ঝামেলা, প্রতি সোমবারেই এমন বড়ো লাইন হয়, তার উপরে ক্যাশিয়ার থাকে মাত্র একজন।”
আমি বলি, “চিন্তা করো না। আমরা এটাতে অনেক আগেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তোমার লাইন তো ছোটোই, কখনো আমাদের ঘণ্টাখানেকও লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।”
পোস্ট অফিসে কাজ সারা হলে তিনি আমাকে কিক নামে একটি স্টোরে নিয়ে যান। আমি একটি থার্মাল ও দুটি আন্ডারওয়ার কিনি। চিহানোভ কবিতা উৎসবের সর্বশেষ রাতে একটি কাণ্ড ঘটে গেছে। আমি রাতে উঠে আলো না জ্বালিয়ে বাথরুমে গিয়ে কমোড থেকে ওঠার সময় মনে হলো আমার পুরো প্যান্ট ভিজে গেছে। প্রথমে ভাবলাম হয়ত অন্ধকারে কমোডে হিসু করতে গিয়ে কিছুটা বাইরে পড়ে থাকবে। অতএব ঘুম চলে যাবার ভয়ে যে আলো জ্বালানো হলো না সেই আলোই জ্বালাতে হলো। পরিষ্কার করতে হলো বাথরুমের মেঝে আর আমার মাজার নিচ পর্যন্ত ধুতে হলো শাওয়ারে দাঁড়িয়ে। কোনোভাবে সকাল পর্যন্ত প্যান্টটি অর্ধ শুকনো হলেও আন্ডারওয়ার ভেজা বিধায় গার্বেজ করে দিয়ে এসেছি। ভ্রসলোভ আসার পথে একথা ক্যাতারজিনাকে বললে তিনি তো হেসে কুটিকুটি। আমি বলি, “জানো আমি পৃথিবীর অনেক দেশেই এভাবে আন্ডারওয়ার ডোনেট করে এসেছি।”আমার কথা শুনে তিনি আরো জোরে হাসেন। আমি বলি, “আচ্ছা সকালে বা রাতে গোসল সেরে প্লেন ধরতে গেলে আমি কখন ওটাকে শুকাবো! তাই এর আগে ভারতে, গ্রিসে, এমনকি কদিন আগে গোয়তেমালায়ও আমি আন্ডারওয়ার ফেলে এসেছি।”ক্যাতারজিনার হাসির দমক থামে না। আমি বলি, “শোনো এরপর একটি কবিতা লিখবো যার শিরোনাম হবে, আমার ফেলে আসা আন্ডারওয়ারগুলো!”
আমরা এভাবে মজা করতে করতে কিক থেকে বেরিয়ে পাশের দোকানে ঢুকি যেখান থেকে ক্যাতারজিনা তার বিড়াল ও কুকুরের খাবার কেনেন। আমি দুই প্যাকেট কাজু বাদাম আর একটি পিনো গ্রেজিয়র বোতল কিনি চেক রিপাবলিকে ভ্যারার বাসায় নিয়ে যাবার জন্যে। ভ্যারা তার বাসাতেই আমার ও ক্যাতারজিনার থাকার ব্যবস্থা করেছেন। তবে, এই ব্যবস্থা যে কত দুরবস্থা তা আগে জানলে আমরা কোনো হোটেল ঠিক করেই সেখানে যেতাম। ভ্যারা কোপেসকা ২৬ বছর ধরে এই আয়োজন করে আসছেন এবং তিনি প্রতিবছরই তাঁর বাসায় কাউকে না কাউকে রাখেন। কিন্তু তিনি যেহেতু একা থাকেন। তাই খরচ কমাতে সেন্ট্রাল হিটিং ব্যবহার করেন না। একতলায় হিটিং সিস্টেমের ভেতর কাঠের বার্নার আর দোতলায় দুই রুমের জন্যে আমাকে ও ইউক্রেনের কবি সারগেইকে দেওয়া হয় একটি ছোট্ট ইলেকট্রিক হিটার। যাহোক সেই আলোচনায় পরে আসছি। আগে আরো কটা দিনের ঘটনাবলি জানা যাক।
বিড়াল ও কুকুরের খাবার কেনা শেষ হলে ক্যাতারজিনা বললেন, “চলো আমরা কিছু রুটি নিয়ে যাই। আমাদের এখানে খুব ভালো রুটি বানায় এমন একটি বেকারি আছে।” সেই বেকারির খবর আমি গতবছরই জেনেছি, কারণ ওখান থেকেই খাবারের জন্যে রুটি নেওয়া হয়েছিল। তা ছাড়া কিছু গ্রোসারিও করা দরকার। ক্যাতারজিনা যেহেতু কোনো চাকরি করেন না, বাড়ির পাশের সামান্য সবজিক্ষেত ও ভেষজ ওষুধ ও বই বিক্রি তার আয়ের উৎস, কখনো কখনো স্থানীয়ভাবে আয়োজিত সেমিনার থেকেও সম্মানী পান। তাই আমাদের ভেতরে একটি আন্ডারস্ট্যান্ডিং এই যে আমি যতদিন তাঁর ওখানে থাকবো ততদিন গাড়ির তেল ও গ্রোসারি যাবতীয় যা কিছু লাগবে সেই খরচ আমার। প্রথমে তিনি বাধা দিলেও শেষ পর্যন্ত আমার এই অনুরোধ তিনি গত বছর থেকেই মেনে নিয়েছেন। আমি বলি, “রুটি বা গ্রোসারি করার আগে আমাদের কোথাও বসে একটু চা খাওয়া দরকার।” ফলে তিনি স্থানীয় একটি রেস্তোরাঁয় নিয়ে যান যেখানে খুব ভালো চা বানায়। আমি একটি দুধ চা ও চিকেন স্যান্ডউইচ আর তিনি একটি লেবু চা নেন। এই রেস্টুরেন্টের দুই কেসিয়ার গত বছর থেকেই আমার পরিচিত। তাদের সাথে সৌহার্দ্য বিনিময়ের পর ক্যাতারজিনা জানালেন যে মেলিস লাইব্রেরিতে আগামী ২৫ তারিখ আমার নতুন বই নিয়ে বুক টকের আয়োজন করা হয়েছে, তারা যদি সময় পান তো আসবেন। দাওয়াত পেয়ে দু’জনেই খুশি হন। আমরা প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে রসিয়ে রসিয়ে চা খেয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে বেকারি থেকে রুটি আর গ্রোসারি থেকে দুধ, প্রয়োজনীয় সবজি, ফল, পিঁয়াজ, পানি ইত্যাদি কিনে বাসায় ফিরি। ক্যাতারজিনা সিনিয়রদের সাথে তাঁর ভেষজ ওষুধের ওয়ার্কশপের জন্য কেনেন বেশ কয়েক প্যাকেট লবণ। আমাদের বাসায় ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে গেলো। কিন্তু তিনি বাসায় এসেই বলেন যে বনের ভেতর থেকে মাশরুম কুড়াতে যাবেন। আমি মানে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শেষ হেমন্তে বাড়ির আশেপাশের ফরেস্টে প্রচুর মাশরুম হয়। যে কেউ ইচ্ছা করলে সেগুলো তুলে আনতে পারে। তিনি এগুলো তুলে এনে পরিষ্কার করে দুইভাগে ভাগ করেন, একভাগ শুকিয়ে ওষুধ বানানোর কাজে লাগান এবং অন্যভাগ নিজেদের খাওয়ার জন্যে রাখেন। আমি বলি, “আমি বরং একটু শুয়ে বসে কাটাই, তুমিই যাও।”
“ঘরের দরজার ভেতরে চাবি ঢোকানো থাকলো। তালা কিন্তু খোলা রেখে গেলাম। এর মাঝে যদি তুমি ঘুমিয়ে যাও তো তালা দিয়ে ঘুমিও।” ক্যাতারজিনা আমাকে সতর্কতার ইনস্টাকশন দিয়ে হাই বুট পরে বেরিয়ে যান। বলেন যে তিনি ঘণ্টা দুইয়ের ভেতরে ফিরবেন।
আমি কিছুক্ষণ ফেসবুকিং করার পর ঘুমিয়ে যাই। ঘণ্টাখানেকের ভেতরে ঘুম থেকে জেগে কিছু একটা রান্না করার প্রস্তুতি নেই। বাজার থেকে কিনে আনা ফুলকপি আর ক্যাতারজিনার বাগানের বিশাল বিশাল ঝালহীন মরিচ, সঙ্গে ফ্রিজে রাখা মাশরুম সহকারে সবজি চড়িয়ে দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত ছেড়ে বেশ আনন্দে সময় পার করতে থাকি। ইতোমধ্যে ঢাকা থেকে ছোটোবোনের ফোন এলে কথা বলতে বলতে রান্নার তদারকি করি। দেশের অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। রাজাকারের বাড়াবাড়ি, জিনিসপত্রের দাম অত্যধিক, আইনশৃঙ্খলা বলতে আদতে কিছুই নেই ইত্যাদি ইত্যাদি হাহাকারের কথা। কথা বলতে বলতে ক্যাতারজিনা এক ঝুড়ি মাশরুম নিয়ে ঘরে ঢোকেন। আমি ফোন ছেড়ে জিজ্ঞেস করি, “তোমার ঘরে চাল আছে?” তিনি বড়ো উৎসাহ নিয়ে বললেন, “আলবত আছে। বেশ কয়েক প্রকার চাল।” ইতোমধ্যে আমার সবজি রান্না দেখে তিনি একেবারে আনন্দে আটখানা। জিজ্ঞেস করলেন, “কী দিয়ে খাব।” আমি বললাম, “চাল বের করো, ভাত রান্না করবো।”
আমি তাঁর বের করা দুই তিন প্রকার চাল থেকে ইন্ডিয়ান বাসমতি বেছে নিলাম। আর রান্না হতে না হতেই দু’জনে বসে গেলাম খাবার টেবিলে। বেশকয়েক দিন পর ভাত খেয়ে মনে বেশ ফুর্তি এলো। কবিতার খাতা নিয়ে বসলাম। ওদিকে মহা কর্মঠ ক্যাতারজিনা মাশরুম পরিষ্কারে বসে গেলেন। আমাকে ডেকে দেখালেন কোনগুলো ঔষধ তৈরির জন্যে শুকাবেন আর কোনগুলো খাওয়ার জন্যে রাখবেন। অতএব কবিতার বিষয় হাতের সামনে চলে এলো: মাশরুম ফর মেডিসিন।
As I opened the door,
she came in with a basket full of
mushrooms gathered from the woods.
“I’ll clean them now,” she said,
“and will make two piles—
one for eating,
and the other for medicine.”
She took off her winter coat,
sat down at the table,
and began cleaning the mushrooms.
“This one,” she showed me,
“I’ll dry for making medicine.”
Then, pointing to a bowl, she added,
“And this is for you—to cook with eggs
in the morning.”
It is autumntime, and I am
enjoying the quiet rhythm of Polish
village life. It’s different from the one
I left in my boyhood—
but so interesting, lively, honest, and neat
that if I hadn’t come here,
I would have missed it a lot.
রাতে লক্ষ্য করলাম যে এবার ইয়োরোপে আসার সময় নিজের বই ছাড়া পড়ার জন্যে কোনো বই সাথে করে আনিনি। ক্যাতারজিনাকে বললাম, “তোমার কাছে কোনো ইংরেজি বই আছে?”
তিনি তৎক্ষণাৎ বইয়ের র্যাকগুলো খুঁজতে শুরু করে দিলেন। এবং বেশ কিছুক্ষণ খুঁজে অনেকগুলো বই আমার সামনে এনে হাজির করলেন। এরমধ্যে ঈশপের গল্প ও পাওলো কোয়েলার উপন্যাস পাওয়া গেলো। তিনি বললেন, “সবগুলো বইই তোমার ঘরে নিয়ে যাও। যেটা ভালো লাগে পড়বে।”
আমি সেই রাত থেকে কোয়েলার ‘দ্যা উইচ অব পোর্টাবেলো’ উপন্যাস পড়া শুরু করে দিলাম।
পরদিন সকালে নাস্তার পরে ক্যাতারর্জিনা আমাকে আগামী কয়েক সপ্তাহের অনুষ্ঠানমালা আমার সামনে হাজির করলেন। বললেন, “এগুলো খাতায় টুকে রাখো। তা ছাড়া আমিও মাঝে মাঝে স্মরণ করিয়ে দেবো।”
অনুষ্ঠান সূচি মানে মহাকর্মযজ্ঞ। ইতোমধ্যে চেহানোভের কবিতা উৎসব করে এসেছি। সামনে, এই মাসেই আছে চেক রিপাবলিকের ব্রানোভ শহরে কবিতা উৎসব। তা ছাড়া আমার নতুন বই ‘দ্যা স্ক্যাটার্ড ডিসপ্লে অব লিমস’ নিয়ে আছে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান: দুটি লাইব্রেরিতে বুক টক, মিলিস সিটির মেয়রের উপস্থিতিতে বুক প্রিমিয়ার, এবং আমার অনুরোধ রক্ষায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প আউশভিৎস ভিজিটে যাবার পরিকল্পনা করেছে। তবে, সেই দিন বিকেলে তাঁর একটি ওয়ার্কশপ আছে সিনিয়রদের নিয়ে। তিনি জানালেন যে সেই ওয়ার্কশপ শেষে তারা আমাকে কবিতা পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি অবশ্য ছিলো ক্যাতারজিনার জন্যে একটি পেইড ওয়ার্কশপ। প্রায় তিরিশ জনের মতো সিনিয়র উপস্থিত ছিলেন টাসিয়া ওসাডা রেস্টুরেন্টে। আমরা একটার দিকে সেখানে চলে যাই। দোতলার কনফারেন্স রুমে ক্যাতারজিনা তাঁর ভেষজ ওষুধপত্র একদিকে আর অন্যদিকে বই সাজান। পৌনে দুইটা বাজতেই তিনি আমাকে বলেন, “চলো নিচে যাই, আগে লাঞ্চ করে আসি।” এই ওয়ার্কশপ আয়োজনের জন্যে গ্রান্ট পেয়েছেন রেস্টুরেন্টের মালিক, যার আওতায় আজ অংশগ্রহণকারী সবাই এবং অতিথি হিসেবে আমারও লাঞ্চ ফ্রি।
খাবারের আগেই উপস্থিত সব সিনিয়রদের সাথে আমাকে পরিচয় করে দিলেন ক্যাতারজিনা। আমি জিনদবব্রে বলে সৌহার্দ্য বিনিময় করলাম। খাওয়া শেষে একে একে সবাই সেমিনার কক্ষে পৌঁছে গেলেন। ক্যাতারজিনার লেকচার চললো একটানা পৌনে দুই ঘণ্টা। এরপর আমার ডাক পড়লো। আমাকে যথাযথভাবে পরিচয় করিয়ে দেবার পর বেশ কয়েকটি একক ও সম্মিলিত কবিতা পড়লাম। আসর শেষে আমার বই কিনলেন দু’জন, অটোগ্রাফ নিলেন ও আমার সাথে ছবি তুললেন। সব কিছু নিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে প্রায় সাড়ে পাঁচ বেজে গেলো। আমি ক্যাতারজিনাকে বললাম, “আমার ল্যাপটপের এডাপটারটি আনতে যাবার কি সময় হবে?” গতকালই মিলিস কম্পিউটার দোকানে অর্ডার করে এসেছিলাম। আজ দুপুরের পর সেটি চলে আসার কথা।
প্রথমে ক্যাতারজিনা না করে দিলেন। কারণ ছয়টার সময় দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়। মাত্র তিরিশ মিনিটে ১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছানো যাবে না বলেই তিনি মত দিলেন। কিন্তু তৎক্ষণাৎ আবার বললেন, “আচ্ছা ফোন করে দেখছি।”
ফোন শেষে তিনি বললেন, “এডাপটার এসে গেছে। আর আমাদের হাতে আছে ২৫ মিনিট। চলো গাড়ি ছোটাই।” বলেই গাড়ি ভোঁ টান দিলেন। একশ’ বিশ কিলোমিটার বেগে গ্রামের রাস্তায় গাড়ি চলছে। অবশ্য বাধ্যতামূলক কোথাও কোথাও গতিসীমা কমাতে হচ্ছে, নতুবা টিকিট খেয়ে যাবেন, আবার রাস্তার পাশে কোথাও ক্যামেরাও আছে। আমি বললাম, “গাড়ি তো বাতাসের চেয়েও বেগে চলছে।”
তিনি বললেন, “কোনো কথা বলো না, চুপচাপ বসে থাকো। গিয়ে যদি দেখি আমাদের মুখের সামনে দোকানের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, এই কষ্টের কোনো মূল্য থাকবে না।” একথা বলার পর তিনিই গল্প জুড়ে দিলেন কীভাবে পুলিশ একবার স্পিডিং টিকিট মাপ করে দিয়েছিলো সেই ঘটনার। একই গতিতে একদিন বাড়ির দিকে গাড়ি ছোটাচ্ছিলেন। তা পুলিশ গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এতো তাড়াতাড়ি কোথায় যাচ্ছ?” তিনি বললেন, “বাড়ি যাচ্ছি। আমার বিড়ালগুলো না খেয়ে আছে।” পুলিশ আবারও জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছো তা কি জানো?” তিনি নির্দ্বিধায় উত্তর দিলেন, “অবশ্যই। একশ’ চল্লিশ কিলোমিটার।” সাথে সাথে যোগ করলেন, “দেখুন অফিসার, আমি একজন কৃষক ও কবি। সামান্য আয়ে একটু শান্তিতে জীবনযাপন করতে চাই, এখন আপনি যদি আমাকে দুইশ’ স্লটের টিকিট দেন সেটাও আমি পে করে শান্তিতেই কাটাতে পারবো, যদিও সামান্য অসুবিধা হবে। অতএব দিন, টিকিট লেখে দিন।”
অফিসার বললেন, “ঠিক আছে আমি সতর্কতার টিকিট দিচ্ছি। এরপরে আর এতো জোরে গাড়ি চালাবেন না। তা ছাড়া, এই ঘটনা নিয়ে কবিতা লিখবেন।” ক্যাতারজিনা একটি ট্রাককে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বললেন, “একেবারে ডিটেইল কবিতা লিখে পত্রিকায় ছেপে দিলাম যাতে পুলিশের চোখে পড়ে।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “পুলিশের চোখে পড়েছিলো?”
“মিলিসের দৈনিকে কবিতা ছাপা হবে আর পুলিশের চোখে পড়বে না। এই অঞ্চলের সব পুলিশই আমাকে চেনে।” বলতে বলতে তিনি কম্পিউটার দোকানের দরজায় পৌঁছে গেলেন। “তাড়াতাড়ি নেমে দৌড়ে যাও। আমি পার্ক করে আসছি।”
আমি দোকানে ঢুকে দেখি কোনো কাস্টোমার নেই। দু’জন ক্যাশিয়ার সামনে তাদের তিন অতিথিকে বসিয়ে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। ক্যাতারজিনার কল করা ও আমাদের আসার কারণ জানিয়ে বলি যে গতকাল অর্ডার করা এডাপটার নিতে এসেছি। একজন ক্যাশিয়ার এগিয়ে এসে বললেন, “অর্ডার নাম্বার দিন।” কিন্তু সেটা তো আমার জানা নেই। আমি আমতা আমতা করতে করতে ঝড়ের বেগে ঢুকলেন ক্যাতারজিনা। পকেট থেকে রিসিট বের করে বলেন, “এই নিন এখানে নাম্বার আছে।”
বিশ স্লটে পে করে এডাপটার নিয়ে আমরা আবার বাড়ির পথে রওনা দিলাম। আমি বললাম, “চলো এবার আস্তে ধীরে গাড়ি চালাও।”
তিনি হাসতে হাসতে বললেন, “আমি আস্তে গাড়ি চালাতে পারি না। আমার মা-ও কখনো আস্তে গাড়ি চালান না।”