ভাস্কর চৌধুরীর বয়ান-পদ্ধতি বনাম প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যের অ্যালার্জি

নাফিউল হক
৩০ জুন ২০২৬, ১৬:২৬আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ১৬:২৬

যে সমাজ নিজেই নিজের ইতিহাসের সাথে প্রতিনিয়ত এক ধরনের সুবিধাবাদী লুকোচুরি খেলে, সেখানে একজন কবি বা কথাসাহিত্যিকের টেক্সটকে কীভাবে পাঠ করা হবে, তা মূলত নির্ধারিত হয় প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার সমীকরণ দিয়ে। আমরা যখন ভাস্কর চৌধুরীকে নিয়ে কথা বলতে বসি, তখন প্রথম ধাক্কাটা লাগে এই খোদ ‘পাণ্ডিত্যপূর্ণ’ আলোচনার তরিকাটার ওপরেই। বাংলা একাডেমি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে তৈরি হওয়া যে ‘নন্দনতত্ত্ব’, যা আসলে মধ্যবিত্তের এক ধরনের সুশীল ড্রয়িংরুম কালচারকে টিকিয়ে রাখার ব্যাকরণ মাত্র, ভাস্কর চৌধুরী তার সাহিত্যিক ডিসকোর্স দিয়ে সেই ব্যাকরণের গোড়াতেই একটা বড় ধরনের লাথি মেরেছিলেন। তিনি এমন এক সময়ে লিখছেন, যখন সাহিত্যের ‘জাত’ বাঁচাতে একদল লোক কলকাতার ‘হাংরি’ অবশিষ্টাংশ চিবোচ্ছেন, অন্য দল ক্ষমতার আশীর্বাদ লাভের আশায় রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের পেছনে ছুটছেন। ভাস্কর চৌধুরী এই দুই খোপের কোনোটাতেই ফিট করেন না। তিনি শুরু থেকেই এক ‘আউটসাইডার’, এক চিরস্থায়ী স্থানচ্যুত যাযাবর।

প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য যাকে ‘অভিজাত ডিকশন’ বলে জাতে তোলে, ভাস্কর চৌধুরী সেই আভিজাত্যের প্যান্ট-শার্ট খুলে তাকে একদম উদোম করে ছেড়ে দেন। তার কবিতা বা কথাসাহিত্যের ভাষা কোনো অভিধানের দাসত্ব করে না; তা তৈরি হয় বরেন্দ্রভূমির রুক্ষ লালমাটির ধুলো, সাঁওতালপল্লীর হাঁড়িয়ার গন্ধ ও নাগরিক মধ্যবিত্তের অবদমিত নোংরামির মেলবন্ধনে।

বাঙালি বুদ্ধিজীবী শ্রেণির সবচেয়ে বড় ভণ্ডামির জায়গাটা হলো তাদের শরীরী মনস্তত্ত্ব। তারা গোপনে পর্নোগ্রাফি গিলবে, শয্যায় চরম বর্বরতা দেখাবে, কিন্তু কবিতায় বা উপন্যাসে শরীর নিয়ে লেখার সময় এমন এক রূপকের চাদর বিছিয়ে দেবে যেন মানুষ বাতাস খেয়ে বেঁচে থাকে। ভাস্কর চৌধুরী এই ভণ্ড সুশীল সমাজকে একটা বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন। তার কাছে কাম কোনো ক্যাফেটেরিয়ার মোলায়েম ফ্লার্টেশন কিংবা এনজিও-মার্কা নিরাপদ সেক্স এডুকেশন নয়। তা তীব্রভাবে আদিম, রূঢ় এবং রক্তমাংসের সত্য।

"এ কোন মনস্তাপে, কান্দো তুমি মধ্যরাতে
কাম ঘটেনি কোমল শয্যাতে
ঘাসের উপর রেখেছিলে শিশিরের মতো মন
সূর্যটা উঠতেই তুমি হারালে কখন?"

এই পঙ্‌ক্তিগুলো বুঝতে পারলে আমাদের পুরো প্রাতিষ্ঠানিক নন্দনতত্ত্বের ভিতটা নড়ে যাবে। “কাম ঘটেনি কোমল শয্যাতে”— এই যে মোলায়েম মধ্যবিত্ত শয্যাকে খারিজ করে দেওয়া, তা আসলে ক্ষমতার এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্পেসকে প্রত্যাখ্যান। বুর্জোয়া সমাজ কামকে বন্দি করতে চায় এয়ারকন্ডিশনড বেডরুমে, লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কে বা করপোরেট ডিল-এ। কিন্তু কবি তাকে নিয়ে যাচ্ছেন কোথায়? “ঘাসের উপর”। এই যে স্পেসের মেটামরফসিস, যেখানে শরীর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃতির রুক্ষতার সাথে লীন হতে চায়, সেটাই নাগরিক ভদ্রলোকের লিংগুইস্টিক অ্যালার্জির কারণ।

ভদ্রলোকেরা যখন ভাস্কর চৌধুরীর টেক্সট পড়েন, তখন তাদের চামড়ায় এক ধরনের চুলকানি শুরু হয়, কারণ তিনি শরীরকে কোনো রোমান্টিক ড্রেসিং টেবিলের প্রসাধন বানান না। তিনি যখন নারীর অবয়ব আঁকেন, তখন ফরসা চামড়া বা লিপস্টিকের সুড়সুড়ি থাকে না, থাকে মেহনতি মানুষের পেশির টান ও মাটির গন্ধ। এই কাম অত্যন্ত রাজনৈতিক, কারণ তা কোনো রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক অনুশাসন মেনে জন্ম নেয় না। তা জন্ম নেয় অবাধ্য অরণ্যের মতো, যা কাঁটাতারের বেড়া চেনে না।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অ্যাকাডেমিক ও এনজিও সার্কেলে একটা বিশেষ শব্দের খুব রমরমা ব্যবসা চলছে—‘সাবঅল্টার্ন’ বা নিম্নবর্গ। গায়ত্রী স্পিভাকের তত্ত্বের সস্তা ফটোকপি করে যারা বড় বড় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেমিনারে প্রান্তিক মানুষের হাহাকার বিক্রি করেন এবং সেই বিক্রিলব্ধ টাকায় নিজেদের বুর্জোয়া জীবন নিশ্চিত করেন, ভাস্কর চৌধুরীর ‘ধনসা মাতি’ ডিসকোর্স তাদের মুখে এক বালতি চুনকালি লেপে দেয়। আমরা প্রায়ই দেখি, সমাজ বা ক্ষমতার ভেতরে কোনো চতুর সুবিধাবাদী যখন নিজের কোনো অপরাধ বা দুর্নীতি লুকাতে চায়, তখন সে নিজের অতীত বা প্রান্তিক পরিচয়ের এক ধরনের ‘ভিকটিম কার্ড’ বা ব্র্যান্ডিং তৈরি করে—যাতে তার দিকে আঙুল তোলা মানেই যেন গোটা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ মনে হয়। সংজ্ঞার রাজনীতি আমাদের শেখায় যে, শোষক সবসময় প্রান্তিক মানুষের ভাষাটাকে কেড়ে নিয়ে নিজের মতো করে রি-ব্র্যান্ড করে।

ভাস্কর চৌধুরী ধনসা মাতির চরিত্রটিকে যখন তার কবিতার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন, তখন তিনি কোনো এনজিও-মার্কা দয়া বা করুণার বয়ান তৈরি করেন না। ধনসা মাতি সাঁওতাল বিদ্রোহের ঐতিহ্য থেকে উঠে আসা এক এমন লিংগুইস্টিক আইকন, যে নিজেই নিজের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে—

“ধনসা মাতি কয়
জাত মাইনো পাত মাইনো
মানুষ ভাইঙ্গো না।”

এই যে ‘মানুষ ভাইঙ্গো না’—এই সরল বুলিটি কিন্তু কোনো নিষ্পাপ মিনতি নয়। এটি আসলে রাষ্ট্র এবং পুঁজির যে বড় বড় আইডেন্টিটি পলিটিক্স, যা মানুষকে জাত, ধর্ম বা শ্রেণির নামে টুকরো টুকরো করে শাসন করতে চায়, তার বিরুদ্ধে এক চরম কাউন্টার-অ্যাক্টিভিজম। অ্যাকাডেমিক বুদ্ধিজীবীরা ধনসা মাতিকে একটা গবেষণার কেস-স্টাডি বানিয়ে তাকে জাদুঘরের কাচের বাক্সে বন্দি করতে চান। কিন্তু ভাস্কর চৌধুরীর ধনসা মাতি সেই কাচের বাক্স ভেঙে বের হয়ে আসে। যখন বলা হয়—

“আগুনে পুড়িছে সাঁতালুরে ধনসা
কোনঠে যাইবো?
ম্যাঘটা আনোরে ধনসা
মানুষ ধুয়াইবো।”

তখন এই ‘মেঘ এনে মানুষ ধোয়ানোর’ রূপকটি সেরেফ কোনো প্রাকৃতিক বৃষ্টির প্রার্থনা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার নোংরামি ও বুর্জোয়া সভ্যতার জঞ্জালকে ধুয়ে ফেলার এক আদিম রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। ভাস্কর চৌধুরী প্রান্তিক মানুষের এই দ্রোহকে কোনো ড্রয়িংরুমের শোপিস বানাননি, বরং একে সমকালীন রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক জলজ্যান্ত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

আজকের বাংলাদেশে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা শব্দ দুটোকে যেভাবে ক্ষমতার একচেটিয়া বাণিজ্যিক পুঁজিতে রূপান্তর করা হয়েছে। একদল লোক একাত্তরকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে, আর অন্য দল তার ভেতর থেকে কেবল নিজের সুবিধাজনক বয়ানটুকুই ছেঁটে নেয়। কিন্তু ভাস্কর চৌধুরীর কাছে একাত্তরের ঘরোয়া বয়ানটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা, যা কোনো সরকারি ক্রনিকলে জায়গা পাবে না—

“আমার মায়ের আঁচলে বাঁধা
একাত্তর।
চুলোতে আগুন
ভাত ফুটছে, গুলির মতোন।”

রান্নাঘরের ভাতের হাঁড়িতে চাল ফোটার যে অতি-পরিচিত ঘরোয়া শব্দ, তাকে একাত্তরের বুলেটের শব্দের সাথে একীভূত করে দেওয়ার এই যে চাক্ষুষতা, তা কোনো প্রথাবদ্ধ কবির মাথায় আসবে না। এখানে ভাত কোনো বিলাসী মেন্যু নয়, ভাত এখানে অবরুদ্ধ জীবন সংগ্রামের এক চরম ক্রাইসিস, যেখানে জীবনের প্রতিটি নিশ্বাসই এক একটা মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক।

কিন্তু কবি যখন সমকালের দিকে তাকান, তখন তার মোহভঙ্গ ঘটে। তিনি দেখেন, কীভাবে স্বাধীনতার পর বিপ্লবের বড় বড় বুলি আওড়ানো যোদ্ধারা ক্ষমতার সামান্য উচ্ছিষ্ট পেয়েই নির্লিপ্ত হয়ে গেছে। ‘আজ’ কবিতায় সেই সুবিধাবাদী মধ্যবিত্তের মুখোশ তিনি ছিঁড়ে ফেলেছেন—

“এখন প্রদীপের আলোর নিচে
মরা পোকার মতো
এক অনন্ত ঘুমে পড়ে কেবলি ঘুমাই।”

এই ‘মরা পোকার মতো অনন্ত ঘুম’ হলো আমাদের সিভিল সোসাইটি ও তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের সেই আপোশকামী নীরবতা, যা আসলে ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় জ্বালানি।

জনতাকে খেপিয়ে তোলা সহজ কিন্তু তার ভেতরের হিংস্রতাকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব—এই মনস্তাত্ত্বিক সত্যটি আমরা আজ বাংলাদেশের সমকালীন মব-কালচার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বিশৃঙ্খলার দিকে তাকালে হাড়েমজ্জায় টের পাই। যে মব নিজেকে নিপীড়িত দাবি করে, সেই মবই যখন অন্য কোনো ভিন্নমতাবলম্বীর ওপর চড়াও হয়, যখন সাংস্কৃতিক কর্মীদের ‘ফ্যাসিস্ট’ লেভেল সেঁটে দিয়ে রাজপথে হেনস্তা করে, যখন মব জাস্টিসের নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়—তখন সেই সাবঅল্টার্ন নন্দনতত্ত্ব নিজেই নিজের মাথায় কুড়াল মারে। কবিতায় ভাস্কর চৌধুরী এই মব-সন্ত্রাসের এক নিখুঁত মেমোরি ম্যাপ এঁকেছেন—

“রাতে এলাকায় গুলি, ছত্রখান
দিগন্তরেখায় আগুনের হলকা
পুড়ছে মানুষের বাড়িঘর
... কে যেন আগুন থেকে ডাক দিলো
ইনকিলাব।”

এই যে ‘ইনকিলাব’ বা বিপ্লবের মতো একটা মহৎ রাজনৈতিক শব্দকে স্লোগান বানিয়ে মানুষের ঘরবাড়ি পোড়ানো আর লাশ গুম করার মতো পৈশাচিক মব-ক্রাইমকে বৈধতা দেওয়া—এই নির্মম সত্যকে উন্মোচন করার সাহস কেবল ভাস্কর চৌধুরীর মতোই একজন স্বাধীনচেতা কবির পক্ষেই সম্ভব। তত্ত্বের কারবারিরা যখন এই মব-ভায়োলেন্স দেখে নিজেদের সুবিধাবাদী আখের গোছাতে ব্যস্ত, তখন এই কবি এক চরম কাউন্টার-স্ট্র্যাটেজি ছুঁড়ে দেন সমকালের গালে। ‘সময়ের আয়ুষ্কাল’ কবিতায় তার সেই অমোঘ ও সাহসী উচ্চারণ—

“শোনো হে মানুষ
ধড় মাথাটা নামিয়ে নিতে
যতটুকু সময় লাগে
তারচে' কম সময়েই
এঁকে দেয়া যায়
প্রগাঢ় চুম্বন।”

একটি মানুষের ধড় থেকে মাথা আলাদা করতে, অর্থাৎ তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বা ‘দালাল’ লেভেল দিয়ে খুন করতে বা মব জাস্টিস করতে যতটুকু সময় লাগে, তার চেয়েও কম সময়ে তাকে ভালোবেসে একটা প্রগাঢ় চুম্বন দেওয়া যায়। এটি হলো চরম ফ্যাসিবাদের মুখে দাঁড়িয়ে, এই তীব্র ঘৃণার রাজনীতির মুখে দাঁড়িয়ে ভালোবাসার এক চরম র‍্যাডিক্যাল পলিটিক্যাল রেজিস্ট্যান্স।

বাংলা কবিতার একটা মস্ত বড় রোগ হলো শব্দের পেছনে লুকিয়ে থাকা। কবিরা যখন নিজের বক্তব্যের ফাঁপা রূপটা বুঝতে পারেন, তখন তারা ডিকশনারি খুলে এমন সব জটিল, বোমাবাজ শব্দ আমদানি করেন, যেন পাঠক লাইনটা পড়ে ভড়কে যায় এবং কবিকে একজন মহাপণ্ডিত ভাবেন। এই যে ভাষার সাহায্যে পাঠককে এক ধরনের হীনমন্যতায় ভোগানো, এটা আসলে এক ধরনের নন্দনতাত্ত্বিক ঔপনিবেশিকতা। ভাস্কর চৌধুরী এই শাব্দিক সন্ত্রাসকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তার ছন্দের মেটামরফসিস বুঝতে হলে আমাদের প্রথাবদ্ধ ব্যাকরণের চশমাটা খুলতে হবে।

তিনি গদ্যছন্দকে এমন এক সাবলীল ভঙ্গিতে ব্যবহার করেছেন, যা প্রথম দেখায় মনে হবে খবরের কাগজের রিপোর্টিং বা কোনো গ্রামীণ আড্ডাখানার গল্প। কিন্তু তার ভেতরে একটা সুক্ষ্ম অভ্যন্তরীণ স্পন্দন বা ইন্টারনাল রিদম ওত পেতে থাকে। ‘আমরা’ কবিতার এই পঙ্‌ক্তিগুলো খেয়াল করা যাক—

“মানুষ বাহিরে বাঘ অন্তর ছাগ
নিজেকেই নিজে ধরে খায়।
আমি বহি পিতার শবদেহ
আমাকে বহিবার লোক
আছে পেছনেই।”

এখানে কোনো বিশেষণের জঞ্জাল নেই, কোনো জোর করে চাপানো উপমা নেই। “মানুষ বাহিরে বাঘ অন্তর ছাগ”—এই যে তীব্র বিদ্রুপাত্মক উক্তি, তা মানুষের ভেতরের সেই ভণ্ড মনস্তত্ত্বকে এক লহমায় নগ্ন করে দেয়, যা বাইরের মব কালচারে বাঘের মতো গর্জন করে কিন্তু ভেতরে ক্ষমতার সামান্য চাবুকের ভয়ে ছাগলের মতো ম্যাঁ ম্যাঁ করে। ভাস্কর চৌধুরীর ছন্দ পাঠককে ধাঁধায় ফেলার জন্য কোনো গোলকধাঁধা তৈরি করে না। তিনি পঙ্‌ক্তিগুলোকে ছোট ছোট তরঙ্গে ভাগ করেন, যা পড়তে গিয়ে অবচেতনেই মগজের গভীরে সুরের মতো প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। এই সহজ অথচ তীক্ষ্ণ বাণীবন্ধই আমাদের সিভিল সোসাইটির উচ্চাঙ্গের সাহিত্যিকদের অস্বস্তির কারণ, কারণ এই ভাষাকে সাধারণ মানুষ সহজেই নিজের প্রতিবাদের ভাষা বানিয়ে নিতে পারে।

ভাস্কর চৌধুরী কেবল কবি নন, তিনি একজন কথাসাহিত্যিকও বটে। আর এই কথাসাহিত্যিক সত্তাটি যখন তার কবিতার ক্যানভাসে প্রবেশ করে, তখন কবিতার সেই সংকীর্ণ আত্মগত সীমানাটা ভেঙে একবারে চৌচির হয়ে যায়। প্রথাবদ্ধ কবিতায় কবি সাধারণত নিজের ভাঙা মন, নিজের হাহাকার আর নিজের প্রেম নিয়েই জাবর কাটেন। কিন্তু ভাস্কর চৌধুরীর কবিতা এক একটা আস্ত লিভিং ডকু-ফিকশন। তিনি তার কবিতার ক্যানভাসে বিচিত্র সব চরিত্রের ভিড় জমান।

স্মৃতি আর সমাজ থেকে উঠে আসা নূরনাহার, অনিতা, কুসুম, অতনু, অনামিকা রায়, সবিতা কিংবা নার্গিস—এরা কেউ কাল্পনিক চরিত্র নয়। এরা প্রত্যেকেই এক একটা সামাজিক শ্রেণির, এক একটা মনস্তাত্ত্বিক সংকটের জীবন্ত ফটোগ্রাফ। কবি এদের সাথে নিজের প্রেম-অপ্রেমের যে জটিল সম্পর্ক, তাকে অত্যন্ত নির্মোহভাবে ডিকোড করেন। ‘সাক্ষাৎ’ কবিতায় নারীর নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক ডিফেন্স মেকানিজম বা আত্মরক্ষার কৌশলকে তিনি যেভাবে আঁকেন, তা পুরুষতান্ত্রিক চাহনিকে একবারে উপড়ে ফেলে—

“তুমি জানতে না হে অতনু
নারী আগে বচন ও বসন
কিছুই খোলে না।”

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মনে করে নারী বুঝি কেবলই ভোগের বস্তু, যা পুরুষের ইচ্ছামতো উন্মোচিত হবে। কিন্তু কবি দেখাচ্ছেন, নারী নিজের সত্তা, নিজের গোপন ভাষা (বচন) ও শরীর (বসন) সহজে খোলে না। এটি তার এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরিখা, যা তাকে শোষকের আগ্রাসন থেকে বাঁচায়। ভাস্কর চৌধুরী এই চরিত্রগুলোর মুখের সংলাপ, তাদের দৈনন্দিন হাহাকারকে কবিতার শরীরে এমনভাবে বুনে দেন যে, কবিতা আর কেবল নান্দনিক বিলাস থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক একটা জীবন্ত দলিল।

ভাস্কর চৌধুরীর চিত্রকল্পের শক্তি হলো, তিনি পরাবাস্তবতা ধার করতে প্যারিস বা কলকাতায় যান না। তিনি আমাদের ঘরের কোণের খুব চেনা, তুচ্ছ বস্তুকে এমন এক জ্যামিতিক বিন্যাসে দাঁড় করান যে, চেনা জগৎটাই হঠাৎ করে এক অজানা ফাঁদ বলে মনে হয়।

“গোলার্ধ থেকে গোলার্ধে হাঁটে বিড়ালের মতো কালক্রম”— ইতিহাস বা সময়কে এক নিঃশব্দ, চতুর বিড়ালের সাথে তুলনা করা, যে ওত পেতে আছে একটা থাবা মারার জন্য, তা সময়ের সেই নির্মম বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে যা কোনো রাজকীয় ক্রনিকল ধরে রাখতে পারে না।

“উঠোনে তুলসী তলায় বসে আছে কালের কুনোব্যাঙ”— তুলসীতলা যা সনাতন বাঙালি সংস্কৃতির পবিত্রতা আর প্রগতির প্রতীক, সেখানে ‘কালের কুনোব্যাঙ’ বসে থাকার এই যে মেটাফোর, তা আসলে সমাজ ও সংস্কৃতির চরম স্থবিরতা, বন্ধ্যাত্ব ও এক ধরনের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনস্তত্ত্বকে নির্দেশ করে।

তিনি বিশেষণ ব্যবহার করেন অত্যন্ত পরিমিতভাবে। বিশেষণ দিয়ে কবিতার শরীরকে ঢেকে দেওয়ার যে করপোরেট প্রবণতা আজকের বাজারে দেখা যায়, ভাস্কর চৌধুরী তার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেন। তার প্রতিটি শব্দ এক একটা ইটের মতো কংক্রিট, যা প্রথাবদ্ধ নন্দনতত্ত্বের দেয়ালে এসে সজোরে আঘাত করে।
যাদের নামে বাজারে সবচেয়ে বেশি কান্নাকাটি করা হয়, তারা আদতে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকা লবিস্টদের একটা হাতিয়ার মাত্র। আজকের বাংলাদেশে তথাকথিত ‘প্রান্তিক’ বা ‘সাবঅল্টার্ন’ তত্ত্বে যাদের জায়গা হয় না, তারা হলো সেই নীরব মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা প্রতিদিন সকালে লোকাল বাসে ঝুলে অফিসে যায়, যাদের ছাঁটাই হলে কোনো এনজিও বিবৃতি দেয় না, যাদের ট্যাক্সের টাকায় রাষ্ট্র চলে অথচ রাজপথে কোনো মব তাদের হয়ে স্লোগান তোলে না। অন্যদিকে, শহরে যাদের আমরা ‘প্রান্তিক’ বলে ব্র্যান্ডিং করি, তাদের অনেকেরই গ্রামীণ ক্ষমতার নেটওয়ার্কে বা মব ভায়োলেন্সে এক ধরনের সক্রিয় অংশীদারিত্ব থাকে। তাহলে এই তত্ত্বের আসল ফায়দাটা তুলছে কে?

ভাস্কর চৌধুরীর সাহিত্য এই তাত্ত্বিক কুয়াশাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়। তিনি কোনো অ্যাকাডেমিক সংজ্ঞা ধার করে প্রান্তিকতার সার্টিফিকেট দেননি। তিনি বরেন্দ্র অঞ্চলের সেই সাঁওতালদের জীবনকে সরাসরি অবলোকন করেছেন, যেখানে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজকের করপোরেট যুগ পর্যন্ত শোষণের চরিত্রটা একই রয়ে গেছে, কেবল শোষকের গায়ের পোশাকটা বদলেছে। তার কথাসাহিত্যিক ডিকশন কোনো ল্যাবরেটরির কৃত্রিম ফসল নয়, তা মানুষের জীবনসংগ্রামের এক নিখুঁত ও আপোশহীন দলিল।

আজকের সাহিত্যিক বাজারে এক ধরনের ‘শাব্দিক ফ্যাসিবাদ’ কাজ করে। আপনি যদি পাঁচটা দুর্বোধ্য শব্দ আপনার বাক্যে না গুঁজে দিতে পারেন, তবে সুশীল সমাজ আপনাকে ‘মেধাবী’ বলে স্বীকৃতি দেবে না। এই ফ্যাসিবাদ আসলে ক্ষমতার সেই পুরোনো কৌশল, যেখানে রাজদরবারের ভাষা সাধারণ মানুষের ভাষা থেকে আলাদা রাখা হতো যাতে প্রজারা সবসময় এক ধরনের হীনমন্যতায় ভোগে। ভাস্কর চৌধুরী এই রাজদরবারের ভাষাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন।

তার বাণীবন্ধ ছড়ানো, কিন্তু আলগা নয়। তা জড়তাহীন এবং বাহ্যিক অলংকার বর্জিত। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে, যে ভাষা মানুষের বুক থেকে উঠে আসে না, তা যতই অলংকারে মোড়ানো হোক না কেন, তা আসলে এক ধরনের মৃত ভাষা। তিনি কবিতাকে সেই মৃতদেহের কফিন থেকে বের করে এনে এক মুক্ত নন্দনতত্ত্বের জন্ম দিয়েছেন। তার কাব্যভাষা পড়তে গেলে কোনো ডিকশনারি লাগে না, কিন্তু তা পাঠকের চেতনার চামড়ার নিচে এমন এক সূক্ষ্ম কাঁটা ফুটিয়ে দেয় যা তাকে দীর্ঘ দিন ধরে এক মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তির মধ্যে রাখে। এই অস্বস্তিটাই হলো একজন প্রকৃত লেখকের আসল রাজনৈতিক সার্থকতা।

সাহিত্যের দরবারে যারা কেবল জটিল রূপকের জঞ্জাল, কষ্টকল্পিত ভাবালুতা ও প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কারের ওজনকে ‘মহৎ সাহিত্য’ বলে রায় দিতে অভ্যস্ত, ভাস্কর চৌধুরী তাদের সেই বুর্জোয়া রুচিকে এক নির্মম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। তিনি কোনো কল্পস্বর্গ বা পলায়নবাদী নিসর্গ-প্রীতির সস্তা আফিম বিক্রি করেননি। তার বৌদ্ধিক ও অন্তরঙ্গ কলমের আঁচড়ে জীবন, স্বদেশ, কাম এবং সময়ের যে স্কেচ তিনি এঁকেছেন, তা একাধারে নিষ্ঠুরভাবে বাস্তব এবং অনন্য নান্দনিকতায় ভরপুর।

তিনি পূর্বসূরিদের তৈরি করা সেই চর্বিতচর্বণ কাব্যভাষাকে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়ে এক নতুন ‘সরলতার রিয়েলপলিটিক’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেখানে অন্য কবিরা শব্দের জটিল পরিখায় নিজেদের আড়াল করে ক্ষমতার সুবিধা নিচ্ছিলেন, সেখানে ভাস্কর চৌধুরী নিজের নগ্নতা ও মেঠো নিশ্বাসকে একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছেন। এই ভাষা কোনো মেকি সুশীলতা চেনে না, তা শরীর ও মনকে তাদের সমস্ত আদিম পবিত্রতাসহ আবাহন করে। আর এখানেই, প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যের সমস্ত অ্যালার্জিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, তাত্ত্বিক ব্যবসায়ীদের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলে, ভাস্কর চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক মহিমময়, সার্বভৌম ও চিরস্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত হন।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে এক কারখানার অর্ধশতাধিক শ্রমিক
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে এক কারখানার অর্ধশতাধিক শ্রমিক
নিকৃষ্টতম অবিচার ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার ইনু: জাসদ
নিকৃষ্টতম অবিচার ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার ইনু: জাসদ
আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের খবরে গাছ ফেলে মহাসড়ক অবরোধ
আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের খবরে গাছ ফেলে মহাসড়ক অবরোধ
দুই দফা বৃদ্ধির পর কমলো ফার্নেস অয়েলের দাম
দুই দফা বৃদ্ধির পর কমলো ফার্নেস অয়েলের দাম
সর্বাধিক পঠিত
যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি হারালেন সহকারী অধ্যাপক ফাতেমা
যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি হারালেন সহকারী অধ্যাপক ফাতেমা
বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের জবাবে যা বললো চীন
বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের জবাবে যা বললো চীন
রিসোর্টে নারী পর্যটককে হেনস্তা, স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা ছিনিয়ে নিলেন ম্যানেজার
রিসোর্টে নারী পর্যটককে হেনস্তা, স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা ছিনিয়ে নিলেন ম্যানেজার
মৃত্যুর আগে খুনির নাকে চিহ্ন এঁকে দিলেন গৃহবধূ, রহস্য জানালো র‌্যাব
মৃত্যুর আগে খুনির নাকে চিহ্ন এঁকে দিলেন গৃহবধূ, রহস্য জানালো র‌্যাব
খামেনির জানাজায় অংশ নেবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন
খামেনির জানাজায় অংশ নেবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন