বাংলাদেশের কথাসাহিত্য বা উপন্যাস সাহিত্য বিষয়ে যেসব ধারণা প্রচলিত আছে তা সার্বিক অর্থে মিশ্র বলা যায়: কখনো কারো মুখে বা লেখায় জানা বা শোনা যায় যে আমাদের উপন্যাস এখনো শিশু, ভালোভাবে তা পরিপুষ্টি লাভ করেনি। '৪৭ এর দেশভাগের পর যে অঙ্গুলিমেয় ঔপন্যাসিকের কথা আমরা জানি তাদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন ও পরবর্তীকালে সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ-এর নাম গর্বভরে উচ্চারিত হতে দেখি। তার মধ্যে আবার মীর সাহেবকে সবাই আধুনিক ঔপন্যাসিক বলবেন না। কারবালার বিয়োগান্ত ঐতিহাসিক ধর্মীয় কাহিনিতে মীরের গদ্যশক্তি ও কল্পনাক্ষমতার প্রশংসা অনেকে করলেও তারা বঙ্কিমচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে তাকে ন্যূন করে দেখেন। আমাদের নজিবর রহমান বা অন্য ঔপন্যাসিকের কথা মনে পড়তে পারে তবে তা কাচা পাঠকের মনে হালকা একটা আন্দোলন তুলেছিল মাত্র। আবার অন্য পক্ষ আমাদের উপন্যাস নিয়ে বিশেষত স্বাধীনতা পরবর্তী উপন্যাস নিয়ে বেশ আশাব্যঞ্জক মন্তব্য করেন। কারো মুখে এমনও শুনেছি যে আমাদের উপন্যাস বিশ্বমানের এবং নোবেল পুরস্কার পাবার মতো আমাদের অনেক ঔপন্যাসিক রয়েছেন। নোবেল পুরস্কার উপন্যাসের একমাত্র মানদণ্ড নয় সেটা মেনে নিয়েও বোধ হয় বলা চলে বা ভাবনা করা চলে যে আমাদের উপন্যাস সারা বিশ্বের পটভূমিতে কোন জায়গাতে আছে।
উপন্যাস যেভাবে সাহিত্যের একটি শক্তিশালী শাখা হিসেবে বিচিত্রভাবে এগিয়েছে সে হিসেবে আমাদের উপন্যাস খুব প্রসারিত নয়। তবে সার্বিকভাবে আমাদের দেশকাল সমাজ ইতিহাস ও ব্যক্তিমানুষের নানা টানাপড়েন নিয়ে আমরা যে রচনা পেয়েছি তার এক ধরনের মূল্য রয়েছে। অনেক সস্তা হালকা জনপ্রিয় উপন্যাসের বাইরে উপন্যাসের মূল চরিত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এমন উপন্যাসও আমাদের রয়েছে। তবে সংখ্যায় তা খুবই সামান্য। আমরা নেতিবাচকতার দিকে খুব বেশি ঝুঁকে পড়তে চাই না, তবে স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক পরে আমরা অবশ্যই গুণপনার দিকে নজর দিতে চাইব। আমাদের সমৃদ্ধ ভাষাকে ব্যবহার করে আমাদের জাতীয় জীবনের নানা উত্থান পতন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, আমাদের জনপদের সামগ্রিক জীবনাচরণ ও সামূহিক পরিবর্তনশীল জীবনধারার তাৎপর্য নিয়ে মানসম্পন্ন উপন্যাস রচনার সময় বোধহয় এসে গেছে।
যারা আমাদের এই সত্যিকার পথ নির্মাণ করেছেন, তাদেরকে আমরা কখনো কখনো মূল্যায়ন করতে ভুল করেছি, তাদের আলো নিয়ে প্রদীপ জ্বালাতে পারিনি। একটা বেপথু পাঠকগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে আমাদের জন্য। আমাদের পঞ্চাশ ষাট বা সত্তরের যেসব মহান লেখক আমাদের পথ দেখিয়েছিলেন, উপন্যাসকে জীবন সময় সমাজ সভ্যতা মানবতা ও বুদ্ধি-প্রজ্ঞার সাথে যুক্ত করেছিলেন তাদের মধ্যে নিশ্চয় আহমদ ছফা অন্যতম। তিনি অনেকগুলো শাখায় লিখেছেন, তবে তাকে প্রাবন্ধিক হিসেবে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন অনেকে। কবি বা অনুবাদক হিসেবে তিনি বেশ পরিচিত। কথাসাহিত্য তাকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। তিনি কখনো প্রচল ছকে উপন্যাস লেখেননি। তার মেধা, মনন, যুক্তি ও প্রজ্ঞা যা তার প্রবন্ধেরর অন্যতম শক্তি সেই উপাদান তিনি উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন। স্বাধীনতা ও তৎপরবর্তী বাংলাদেশের পরিবর্তন তিনি তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি করেছিলেন। কিছুটা বিমর্ষ হতাশ আর রাগি আহমদ ছফা উপন্যাসে তার এইসব মানবিক প্রত্যয়ের ছবি তৈরি করেছেন। তিনি বেশ সাহসী ছিলেন। যেসব কথা কেউ সাহস করে তার সময়ে অন্যরা বলতে পারেননি তা তিনি অকপটে বলেছেন।
তাকে শক্তিমান ঔপন্যাসিক বলতে গিয়ে কুণ্ঠাবোধ করতে হয় না। তার নিজস্ব চিন্তাচেতনা, পঠনপাঠন ও সামাজিক পর্যবেক্ষণ তার উপন্যাসকে স্বতন্ত্র করেছে। তিনি বাংলা ভাষায় ইউরোপীয় উপন্যাস লিখতে চাননি। ঘটনার বাড়াবাড়ি ও দেখা যায় না সেখানে। আহমদ ছফার লেখক সত্তার সাথে তার সাধারণ জীবনযাপনের পার্থক্য নেই বলা চলে। তিনি নিজেকে মুসলমান বাঙালি ভাবতে ভালোবাসতেন। কৃষক পরিবারের সন্তান হয়ে তার মধ্যে মহৎ মানবের গুণাবলি লক্ষ্য করা যায়। বিস্তর পঠন-পাঠনই তাকে লেখক করে তুলেছে সেটা বলা বোধ হয় ঠিক হবে না বরং বলা ভালো দেশের প্রতি, সাধারণ মানুষের প্রতি তার যে ভালোবাসা এবং দায়বোধ তা থেকেই তিনি লেখক হয়ে উঠেছেন। একজন লেখক যত প্রকার ফর্মেই লিখুন না কেন তার মূল মানসচেতনার জায়গা স্থির থাকে, স্থির থাকে তার বোধের বিন্যাস ও মানবিক এষণা। যে নিরাভরণ সহজ সরল জীবনযাপন তিনি করতেন তা থেকেই তার ব্যক্তিত্বের আলো চেনা যায়। স্বাধীনতার মূল চেতনাকে তিনি খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তার উপন্যাসসত্তা বিষয়ে কিছু কথা বলার সময়ে আমরা সলিমুল্লাহ খানের শরণাপন্ন হতে চাই সংগত কারণেই। তিনি তাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন বলে আমার বিশ্বাস। তার একটি মন্তব্য পড়ে নেয়া যাক— "নিজের জাতিকে এমন গরিমার সহিত ভালোবাসেন আহমদ ছফার তেমন সমান বা দ্বিতীয় কোনো লেখক আজও আমার এই অল্প জীবনের সজ্ঞার মধ্যে পড়ে নাই। তার সকল লেখার গোড়ায় ভালোবাসা। এই ভালোবাসার জোরেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের সশস্ত্র-সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, স্বাধীনতা বাংলাদেশের হাজার বছরের পুরনো সমাজে নতুন জীবন গড়ার সুযোগ নিয়ে আসবে। সে আশা পূরণ হয় নাই তার। বাংলাদেশের সমাজ তবু থেমে থাকে নাই। আহমদ ছফার প্রায় সকল কাহিনি এই ভালোবাসার, এই নিরাশা আর কষাঘাতের সাক্ষী।"
ধারণা করতে পারি হতাশার কারণে তিনি খানিকটা খেপে গিয়েছিলেন এবং প্রবন্ধে যেমন সরাসরি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন উপন্যাসে সেটা করতে পারেননি; সে কারণে তিনি শ্লেষাত্মক ভঙ্গি ব্যবহার করেছেন অনেক সময়। ছফা সে সব কাহিনি লিখেছিলেন তার মধ্যে ‘সূর্য তুমি সাথী'-কে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। সলিমুল্লাহ খান নিজে একথার সত্যতা বিষয়ে জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে সলিমুল্লাহ খান আরো মনে করেন, ‘সূর্য তুমি সাথী' তার একমাত্র প্রথম এবং শেষ উপন্যাস। প্রশ্ন হতে পারে দুটো: ছফা এটিকে তার সেরা উপন্যাস বলেছিলেন, বাকিগুলোকে খারিজ করে দেননি। তাহলে সলিমুল্লাহ খান কোন যুক্তিতে বাকি উপন্যাসগুলো খারিজ করে দিলেন। দ্বিতীয় প্রশ্ন হতে পারে, ছফা আরো যে কখানা উপন্যাস লিখেছেন সেগুলোকে আমরা কী নামে অভিহিত করব? সেখানে কী উপন্যাসের কোনো গুণাবলি নেই? মনে করতে পারি মন্তব্য করার সময় তাদের মনে আবেগের মাত্রা বেশি ছিল। অন্তত 'ওঙ্কার' বা 'অলাতচক্র'-কে আমরা উপন্যাস বলতে চাই। এটা ঠিক যে উপন্যাসের ফর্মের কোনো বাঁধাধরা নিয়ম না থাকলেও পৃথিবীর সেরা উপন্যাসকে ভিত্তি ধরে একটা ফর্ম দাঁড়িয়ে গেছে, ছফা সেটা জানতেন না বলব না, তিনি সেটা হয়তো মানতে চাননি। উপন্যাস এখন যে জায়গায় পৌঁছেছে সেখানে তাকে নির্দিষ্ট ঘেরাটোপে বাঁধা কঠিন। ঔপন্যাসিকের কাছে পাঠকের একটা দাবি থাকে যা মেটাতে হয়। জীবনের গভীর কথকতার বৈচিত্র্যময় ও ঘণপিনদ্ধ বয়ানই হয়তো মহৎ উপন্যাস হয়ে ওঠে। ছফার ক্ষেত্রে আমরা দেখি তিনি প্রতিবাদ করছেন, স্যাটায়ার করছেন, তীরষ্কার করছেন এবং এর ভিতর দিয়ে তার বলবার কথাটি বের হয়ে আসছে। চরিত্র প্লট আবহ বয়ানশৈলী, প্রেক্ষণবিন্দু এমনকি সময়কে ব্যবহার করার নিয়মও তিনি অনেক ক্ষেত্রে মানেননি। চরিত্রের মধ্যকার সংলাপকে তিনি যেভাবে ব্যবহার করেছেন তা প্রচলিত তবে পাঠকের জন্য তিনি ভাবেননি, পাঠক হোঁচট খান প্রায়শ। তবে তার লেখা এরপরও পাঠককে আকর্ষণ করে কারণ তিনি বাংলাদেশের বাস্তবতাকে তুলে আনতে কখনো রূপকের আড়ালে কখনো সরাসরি কাহিনি বর্ণনা করেছেন এবং এর মধ্যে তার নিজস্ব যুক্তি তর্ক দর্শন বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন রেখে গেছেন। তার নিজের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত উপলব্ধিকে তিনি শানিত করে তুলতে পেরেছেন নির্দিষ্ট ভাষাভঙ্গির মাধ্যমে।
আহমদ ছফার উপন্যাসের মধ্যে ‘পুষ্প বৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ' একটি ছোট কলেবরের কম আলোচিত রচনা। তবে তার অন্য উপন্যাস নিয়ে যেমন আলোচনা হয়েছে এই উপন্যাস নিয়েও সেরকম আলোচনা হওয়া খুব জরুরি। আপাতভাবে মনে হতে পারে ফুল বৃক্ষ পাখি নিয়ে তিনি রসিয়ে রসিয়ে দুটো গল্প এখানে উপস্থাপন করেছেন। এটা ঠিক যে ফুল বৃক্ষ ও পাখি নিয়ে দুটো আখ্যানের মধ্যে বেশ সাযুজ্য থাকলেও একটি উপন্যাসের জন্য এরকম দুটো প্রসঙ্গ একই সাথে রাখার তেমন উপন্যাসোচিত যুক্তি নেই। অন্তত উপন্যাসের তাত্ত্বিক দিয়ে এটা সমর্থনযোগ্য নয়। আবার আমরা যদি ধরেই নিই যে তিনি প্রচল ধারার উপন্যাসের ফর্ম মানেন না তাহলে বলতে হবে এটি বিশেষ ধরনের একটি উপন্যাস। আমার কেন জানি মনে হয়, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সামূহিক মানবিক বিপর্যয়ের অবর্ণনীয় ছবি আহমদ ছফাকে অসম্ভব উত্তেজিত করে তুলেছিল। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব ধরনের মানুষের যে অধঃপতন সেখান থেকে মুক্তি পাবার জন্য ফুল বৃক্ষ ও পাখিফুলের প্রতি তিনি ঝুঁকে পড়েছেন বা এদের আশ্রয় করে তার প্রতিবাদ জারি রাখতে পেরেছেন।
পুষ্প বৃক্ষ ও পাখিকে তিনি যে রচনা আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন তাকে হয়ত সমালোচকের সঠিক অর্থে উপন্যাস বলবেন না। তাতে অবশ্য খুব বেশি কিছু আসে যায় না। এটিতে ছফা পুষ্প বৃক্ষ ও বিহঙ্গ নিয়ে কোনো বৃত্তান্ত লেখেননি বরং আপাতভাবে মনে হয় বা তার জীবনী থেকে যতটুকু জানা যায় এটি তার বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল। তিনি যেভাবে বলেছেন, যে যে নাম ব্যবহার করেছেন প্রায় ক্ষেত্রে তা বাস্তব। এ থেকে মনে হতে পারে বাস্তবতা ও শিল্পের মধ্যে যে ব্যবধান লেখকেরা মানেন ছফা তা মানেনি। তিনি দুএকটি ছোটোখাটো পরিবর্তন (স্মৃতি বিস্মরণজনিত কারণেও হতে পারে) করেছেন। তবে এই উপন্যাসের প্রধান শক্তি হলো ঔপন্যাসিকের নিজস্ব মনোপ্রতিন্যাস। আপাতভাবে খ্যাপাটে রাগী আহমদ ছফা এখানে প্রকৃতি কীটপতঙ্গ বা বিহঙ্গের প্রতি যে অনুরাগ দেখিয়েছেন বা তাদের মধ্য দিয়ে মানবজীবনের গভীর সত্যকে উপলব্ধি করেছেন; এই উপলব্ধিজাত অনুভবকে তার দার্শনিক সজ্ঞা বলা যেতে পারে, বলা যেতে পারে তিনি আবিষ্কার করেছেন এক গভীর অনুধ্যানের জগৎ যা মানবজীবনের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে ভাবা যায়। এই চেতনা খুব যে নতুন তা হয়তো বলা যাবে না। কারণ আমাদের ঔপনিষদিক চিন্তাবিভূতির সাথে এর হুবহু মিল পাওয়া যাবে। গাছের প্রাণ বা পাখিদের সাথে মানবের সংলাপ বা তাদের আঁতের কথা বের করে আনার যে কাজ আহমদ ছফা করেছেন তা আরো একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। ধারণা করা বোধ করি অন্যায় হবে না তিনি মানবপ্রজাতির অবিরাম অমানবিক ও অসামাজিক কাজের প্রতিবাদ করতেই হয়তো প্রকৃতির এই মুক মুখে ভাষা খুঁজে পেয়েছিলেন। অবশ্য অন্য একটি সত্য যে ফুল বৃক্ষ পাখিদের সংস্পর্শে তিনি এসেছিলেন স্বাভাবিকভাবে বা ঘটনাক্রমে এবং তাদের মধ্যে এই সব সত্য আবিষ্কার করার পরে তা বিন্যস্ত করার চেষ্টা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় তিনি সত্যি সত্যি সবজি চাষ করেছিলেন। বীজ সংগ্রহ মাটি তৈরি সার সংগ্রহ এবং ধীরে ধীরে নিবিড় যত্নে তিনি যেভাবে ফুল বা সবজি তৈরি করেছিলেন তার যাবতীয় খুঁটিনাটি তিনি বর্ণনা করেছেন। যাদের কাছে এই ফুল ফোটানো বা গাছ বড় হয়ে ওঠার ব্যাপার কোনো আনন্দময় ঘটনা মনে হয় না তাদের কাছে বিষয়টি বাহুল্য বা ক্লিশে মনে হতে পারে। তবে মানবচৈতন্যে আনন্দযোগের নানা রকম হেতু থাকে; আমাদের আকাঙ্ক্ষার যে বৈচিত্র্যপূণর্ বাতাবরণ আছে তার প্রমাণ এই জাতীয় আখ্যান। বড় দাগের বা স্থূল বিষয়ের বাইরে আমাদের সূক্ষ্ম বোধ বা বিষয় নিয়ে আখ্যান রচিত হতে পারে এবং তা মানুষকে পুলকিত করতে পারে সেটা এই রচনায় লক্ষ্য করা যাবে। এই বোধ শুদ্ধবোধ এবং নান্দনিক বোধ। এরই আশ্লেষে আমরা মানবজীবনের গভীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বুঝে উঠতে পারি।
আহমদ ছফার শরণাপন্ন হতে পারি আমরা। উপন্যাস থেকে একটু পড়ে নিতে পারি— "শাহানার একেবারে কোলের বাচ্চাটি, যার নাম রিয়াদ, সেই আবিষ্কার করল কার্নিশের পাশের একটি বেগুনগাছে পাঁচ সাতটি বেগুনি ধরনের ছোট ছোট ফুল এসেছে। ফুলগুলো পাতার অন্তরাল থেকে উঁকি দিচ্ছে। একেবারে অতর্কিতে এসে পড়েছে বলে একটুখানি লজ্জা এবং একটুখানি গর্বের আভাস ভাবেভঙ্গিতে প্রকাশ পাচ্ছে। এই এতটুকুন বাচ্চা ছোট ছোট চোখ দিয়ে দেখতে পেল কেমন করে, পাতার আড়ালে থাকা ফুলগুলো।...আমার ক্ষেতের বেগুনগাছে ফুল ফুটেছে, ইচ্ছে হলো এই অপূর্ব সংবাদটি জনে জনে জানাই। হোস্টেলের করিডোরে অনেকক্ষণ হাঁটলাম। যে সমস্ত মানুষ আসা-যাওয়া করছে তাদের চোখের দিকে তাকাই, মুখের দিকে তাকাই। অবশেষে হতাশ হয়ে মেনে নিতে হলো, এই সমস্ত ব্যস্তবাগীশ মানুষের কাউকেই আমার গাছে ফুল ফোটার সংবাদটি প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু এই অসহ্য আনন্দ তো আমি মনের মধ্যে ধারণ করতে পারছি নে।"
বোঝা যায় এই আনন্দ সবিশেষ, নির্বিশেষ নয়। আর এখানেই এই রচনার বিশেষত্ব।
শেষের দিকে আমরা লক্ষ্য করি ইত্তেফাকের সাংবাদিক মোস্তান নিয়ে তিনি বস্তিবাসী ছেলেমেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় চালু করেন। মোস্তান নিজের সন্তানদেরও বস্তির ছেলেমেয়েদের সাথে বসিয়ে দেন। তার ধারণা এদের সাথে না মিশলে তার ছেলেময়ে মানুষ হয়ে উঠতে পারবে না। অনেক কষ্টে সেখানে একটি ঘর তিনি বানাতে পারেন। নিজের লাগানো ক্ষেতের সবজি দিয়ে বস্তিবাসির সবাইকে নিয়ে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করেন লেখক। উদ্দেশ্য এই মূল্যবান সবজি প্রথম এই অসহায় ছেলেমেয়েদের খাওয়ানো উচিত।
পাখি নিয়ে তার যে পর্যবেক্ষণ এবং পর্যবেক্ষণজাত অভীক্ষা তাকে নিঃসন্দেহে একেকটি থিসিস হিসেবে বিবেচনা করা যায়। দুই পর্বের প্রসঙ্গের মধ্যে আপাতভাবে পার্থক্য থাকলেও ছফা সেটা থাকতে দেননি তার রচনার শক্তি দিয়ে। যাইহোক, পাখি নিয়ে এই কাণ্ডকারখানা নতুন নয়। সব কবি ও কাহিনিকার এ নিয়ে নানা রচনা তৈরি করেছেন। ফরিদউদ্দীন আত্তার 'কনফারেন্স অব দি বার্ড' নামে সেই মধ্যযুগে একটি রূপক কাব্য লিখেছিলেন। রূপকথায় তো পাখি নিয়ে তেলেসমাতি রয়েছে শত শত। পাখি নিয়ে ছফা যা করতে পেরেছেন তা কম কিছু নয়। পাখিপুত্র হিসেবে তিনি একটি পাখিকে গ্রহণ করেছেন। যে হারিয়ে গিয়েছিল, আবার ফিরে আসে। কাক নিয়ে তার যে সব কথাবার্তা তা কতদূর অনুমোদনযোগ্য বা বিশ্বাস্য তা নিয়ে নতুন ধরনের ব্যাখ্যা দাবি করে। বুলবুলি, ঘুঘু ও শালিক নানাজাতের পাখির চরিত্র তিনি নির্মাণ করেছেন। পাখি সমাজের নানা স্বভাব সংস্কৃতি তিনি আবিষ্কার করেছেন, এমনকি কখনো কখনো ভাষা আবিষ্কারও করে ফেলেছেন।
শেষের দিকে তিনি বলেছেন, মনুষ্যজাতির হিংস্রতা দেখে তিনি বৃক্ষ পাখি সমাজের আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে ও বিভেদ ও হানাহানি আবিষ্কার করলেন। তিনি মানুষ বলেই তাকে আবার মানুষের জগতে ফিরে আসতে হবে। তবে তার এই অভিজ্ঞতা অতুলনীয়। অন্য কোনোভাবে কোথাও থেকে এটা তিনি পেতেন না। তার বয়ান থেকে শোনা যাক; এই পুষ্প এই বৃক্ষ, এই তরুলতা, এই বিহঙ্গ আমার জীবন এমন কানায় কানায় ভরিয়ে তুলেছে, আমার মধ্যে কোনো একাকিত্ব, কোনো বিচ্ছিন্নতা আমি অনুভব করতে পারিনি। সকলে আমার মধ্যে আছে, আমি সকলের মধ্যে রয়েছি। আমি আমার পাখি পুত্রটির কাছে বিশেষভাবে ঋণী। আমার পাখিপুত্রটি আমাকে যা শিখিয়েছে কোনো মহৎ গ্রন্থ, কোনো তত্ত্বকথা, কোনো গুরুবাণী আমাকে সে শিক্ষা দিতে পারেনি। একমাত্র অন্যকে মুক্ত করেই মানুষ নিজের মুক্তি অর্জন করতে পারে। আমার পাখিপুত্র মুক্ত, আমি মুক্ত, আমাদের সম্পর্ক থেকে প্রত্যহ অমৃত উৎপাদন হয়। এই আকাশের জীবনের সঙ্গে আমার জীবনের যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেটা কি সমুদ্রে অবগাহন নয়?
উপন্যাস শেষ পর্যন্ত একটি দর্শন দ্বারা শেষ হয়েছে। সেই দর্শনের যুক্তি কতটুকু পোক্ত তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। তবে এটি ঠিক যে জীবন তিনি এই সব উদ্ভিদ ও প্রাণীদের মধ্যে যাপন করেছে সেই জীবনকে তিনি ভালোভাবে চেনেন বা জানেন; সেই জীবনের গভীর উপলব্ধিকে তিনি মূল্য দিয়েছেন। এই বোধ বা উপলব্ধি তার ব্যক্তিগত হলেও তা সমানভাবে আমাদের প্রভাবিত করে বা আক্রান্ত করে। আমাদের ভাবতে হবে যে এই বোধ মৌলিক। মানবজীবনের অনেক সত্য থাকে, তাকে আবিষ্কার করতে হয়। এই আবিষ্কারের চোখ সবার থাকে না। আমাদের চারপাশে কত গুরুত্বহীন জিনিসের মধ্যে মানবজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। এই উপন্যাস ব্যতিক্রমী এই অর্থে এটি মানবজীবনের গভীর একটি সত্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। উপন্যাসের কাঠামোগত দুর্বলতা লক্ষ্য করা গেলেও নতুনত্বের জন্য, নতুন বিষয়বস্তুর জন্য উপন্যাসটি মহৎ হয়ে উঠেছে।









