ক্রোধ মানুষের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উৎপাদ
যুবক: গতকাল অপরাহ্ণে একটি কফিশপে বসে বই পড়ছিলাম। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একজন ওয়েটারের হাত থেকে কফি ছলকে আমার জ্যাকেটে পড়ে। মাত্র কয়েকদিন হলো জ্যাকেটটি কিনেছি; এটি খুবই সুন্দর এবং আমার অতি পছন্দের। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না, মাথা গরম হয়ে গেল। আমার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে রাগারাগি করতে লাগলাম। সচরাচর উন্মুক্ত জনসমাগমস্থলে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করার মতো লোক আমি নই। কিন্তু গতকাল আমার চিৎকারে পুরো শপটি গমগম করে উঠল। রাগের মাথায় শিষ্টাচার ভুলে গিয়েছিলাম। এমন কেন হলো? এমন আচরণের মধ্যে কি কোনো লক্ষ্য নিহিত ছিল? যে-কোনো দৃষ্টিতেই দেখা হোক না কেন, নিশ্চয় এমন আচরণের পিছনে কোনো কারণ রয়েছে, তাই নয় কি?
দার্শনিক: আচ্ছা! তুমি রাগের অনুভূতি দ্বারা তাড়িত হয়ে চ্যাঁচামেচি করেছিলে। যদিও তুমি সচরাচর শান্তশিষ্ট স্বভাবের, কিন্তু তাৎক্ষণিক রাগ হওয়া থেকে বিরত থাকতে পারনি। এটি একটি অনিবার্য ঘটনা ছিল এবং তোমার কিছুই করার ছিল না; এটাই তো বলতে চাইছ?
যুবক: হ্যাঁ, ঠিক তাই! এমন আচমকা সবকিছু ঘটে গেল যে, কিছু চিন্তা করার আগেই শব্দগুলো আমার মুখ থেকে তীব্র বেগে বের হয়ে গেল।
দার্শনিক: ধরো, ঘটনাক্রমে তখন তোমার হাতে একটি ছুরি ছিল; এবং রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে তুমি ওয়েটারকে ছুরিকাঘাত করে বসলে। তারপরও কি বলবে যে, ‘এটি একটি অনিবার্য ঘটনা ছিল এবং তোমার কিছুই করার ছিল না’?
যুবক: নাহ্…! এটা একেবারেই চরমপন্থী যুক্তি!
দার্শনিক: এটি মোটেই চরম যুক্তি নয়। তোমার ব্যাখ্যা অনুযায়ী রাগের মাথায় করা কোনো অপরাধের জন্য ‘রাগ’কেই দায়ী করা হবে এবং কোনোভাবেই তা ব্যক্তির দায় হবে না। কারণ তোমার মতে মানুষ আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
যুবক: তাহলে, আমার এই রাগকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
দার্শনিক: সহজ! তুমি অযথা রেগেও যাওনি এবং চিৎকারও শুরু করনি। রাগ করেছ যাতে তুমি চিৎকার করতে পার। অন্যভাবে বলতে হয় ‘চিৎকার করার লক্ষ্য’ অর্জনের জন্যই তুমি রাগের অনুভূতিকে তৈরি করেছ।
যুবক: কী বলতে চাইছেন?
দার্শনিক: অন্য কোনো কিছুর আগেই তোমার মাথায় ‘চিৎকার করার লক্ষ্য’ স্থিরীকৃত হয়। অর্থাৎ বলতে হয়, চিৎকার-চ্যাঁচামেচির মাধ্যমে তুমি চাইছিলে ওয়েটার যেন তোমার কাছে নতজানু হয়, ক্ষমাপ্রার্থনা করে এবং তোমার সকল কথা মেনে নেয়। এই লক্ষ্য অর্জনের একটি উপায় হিসেবে তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে রাগের অনুভূতি তৈরি করেছিলে।
যুবক: উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাগের অনুভূতি তৈরি করেছি? অবিশ্বাস্য! আপনি নিশ্চয়ই মজা করছেন!
দার্শনিক: তাহলে গলা চড়ালে কেন?
যুবক: আগেই বলেছি। আমি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য এবং চরমভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম।
দার্শনিক: মোটেও তা নয়। তুমি গলা না চড়িয়েও বিষয়টি তাঁকে বলতে পারতে। হয়তো, ওয়েটার আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইত, তোমার জ্যাকেট ভালোভাবে পরিষ্কার করে দিত অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করত। এমনকি সে তোমার জ্যাকেট ‘শুষ্ক প্রক্ষালনেরও’ ব্যবস্থা করতে পারত। ওয়েটার এই কাজগুলো করতে পারে তা তুমিও জানতে; কিন্তু তারপরও তুমি রাগারাগি করেছ। সহজভাবে বিষয়টি বোঝানো ঝামেলার হতে পারে ভেবে সে পথ মাড়াতে চাওনি। বরং চেয়েছিলে সেই প্রতিরোধহীন অনুতপ্ত ব্যক্তি তোমার কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা ভিক্ষা করুক। সমগ্র প্রক্রিয়ায় তুমি যে অস্ত্র ব্যবহার করেছ তার নাম হলো ‘রাগের অনুভূতি’ (emotion of anger)।
যুবক: অসম্ভব! আপনি আমাকে বোকা বানাতে পারবেন না। তাঁকে বশ্যতা স্বীকার করানোর জন্য আমি ইচ্ছাকৃতভাবে রাগ তৈরি করেছি? জোর দিয়ে বলছি - এই রকম কিছু ভাবারও সময় ছিল না তখন। এমন নয় যে, আমি বিষয়টি নিয়ে ভেবেচিন্তে তারপর রাগ করেছি। রাগ এমন একটি আবেগ যা আকস্মিকভাবে, পরিকল্পনা না করে এবং পরিণতির কথা না ভেবেই হয়ে থাকে।
দার্শনিক: এটা ঠিক বলেছ; রাগ একটি তাৎক্ষণিক অনুভূতি। এখন একটি ঘটনা বলছি, শোন! একদিন মা ও তাঁর মেয়ে উচ্চস্বরে ঝগড়া করছিল। সে সময় ঘরের টেলিফোন বেজে উঠল। হ্যালো! মা তড়িঘড়ি করে ফোনটি উঠালেন…তাঁর কণ্ঠ তখনও রাগে ভারী হয়ে ছিল। ফোন লাইনের অপর প্রান্তে ছিল মেয়ের গৃহশিক্ষক। কে ফোন করেছে তা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কণ্ঠ পরিবর্তিত হয়ে গেল এবং তিনি অত্যন্ত সৌজন্যপরায়ণ হয়ে উঠলেন। পরবর্তী কয়েক মিনিট তিনি অত্যন্ত আন্তরিক ও মধুর কণ্ঠে কথা বললেন। কিন্তু যেইমাত্র তাঁর কথোপকথন শেষ হলো, মুহূর্তেই তিনি আবার আগের মেজাজে ফিরে গেলেন এবং কন্যাকে উচ্চৈঃস্বরে বকাঝকা করতে শুরু করলেন।
যুবক: আচ্ছা! কিন্তু এটা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।
দার্শনিক: তুমি কি বুঝতে পারছ না? রাগ এমন একটি আবেগ যা প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফোন বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই এটাকে পরিত্যাগ করা যায় এবং কথা শেষ করেই আবার ফিরিয়ে আনা যায়। মা এমন কোনো রাগে বকাবকি করছেন না, যাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তিনি রাগকে ব্যবহার করছেন নিতান্তই উচ্চস্বরে বকাবকি করে কন্যাকে বশ্যতা স্বীকার করানো এবং তাঁর মতামতকে মেনে নেওয়ার জন্য।
যুবক: তাহলে ব্যাপারটি দাঁড়াচ্ছে যে, রাগ হলো লক্ষ্য অর্জনের একটি উপায়, তাই কি?
দার্শনিক: টেলিওলজি তা-ই বলছে।
যুবক: ওহ্! এতক্ষণে বুঝতে পারছি। মায়াবী ছদ্মাবরণে আপনি চরমভাবে নৈরাশ্যবাদী (nihilistic) একজন ব্যক্তি। রাগ অথবা আমার গৃহবন্দি বন্ধু যা নিয়েই কথা বলি না কেন আপনার দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের জন্য অবিশ্বাস্য সব উপাদানে ভরপুর।
অতীত-মুক্ত বাঁচার উপায়
দার্শনিক: আমি কীভাবে নৈরাশ্যবাদী হলাম?
যুবক: ভাবুন। সোজাসুজিভাবে বলতে গেলে আপনি মানুষের আবেগকে অস্বীকার করছেন। আপনার মতে মানুষের আবেগ ‘লক্ষ্য’ অর্জনের একটি উপায় ব্যতীত অন্য কিছু নয়। আবেগকে অস্বীকার করার অর্থ হলো এমন একটি মতবাদকে সমর্থন করা যা মানবতাকে অস্বীকারের প্রয়াস চালাচ্ছে। এটা আমাদের আবেগ… সত্য হলো আমরা এই ধরনের সকল অনুভূতি ও উপলব্ধি দ্বারা আলোড়িত হই এবং এজন্যই আমরা মানুষ। মনুষ্যত্ব থেকে যদি আবেগকে বাদ দেওয়া হয় তাহলে মানুষ কেবল একটি ইতর যন্ত্রের অবিকল প্রতিরূপ বৈ অন্য কিছু নয়। এটি যদি নৈরাশ্যবাদিতা না হয় তাহলে নৈরাশ্যবাদ আসলে কী?
দার্শনিক: আমি বলছি না যে, আবেগের অস্তিত্ব নেই; এ কথা বলারও অপেক্ষা রাখে না। সকলেরই আবেগ আছে। কিন্তু যদি বল মানুষ এমন একটি জীব যে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; তাহলে আমার অবস্থান সবসময় তার বিপক্ষে। অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞান হলো এমন একটি চিন্তাধারা, এমন একটি দর্শন - নৈরাশ্যবাদের বিপরীতে যার সুস্পষ্ট অবস্থান। অর্থাৎ আমরা মোটেই আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নই। এই মতবাদ প্রমাণ করে যে, ‘মানুষ আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়’, এবং অতিরিক্ত হিসেবে আরও নির্দেশ করে যে, ‘আমরা অতীত দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত নই’।
যুবক: তাহলে বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে - আমরা যেমন আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নই, তেমনি অতীত দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত নই।
দার্শনিক: উদাহরণ হিসেবে এমন একজনের কথা ধরা যাক, অতীতে যার বাবা-মার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে। এটি সেই নলকূপের পানির তাপমাত্রা সবসময় একই অর্থাৎ ১৮ ডিগ্রি হওয়ার মতো নয় কি? কিন্তু তারপরও বিচ্ছেদের ঘটনা শীতল নাকি উষ্ণতার অনুভূতি দেয়? অর্থাৎ এটি হলো একটি ‘বর্তমানের বিষয়’, একটি ‘বাস্তবতার বিষয়’। অতীতে যা কিছুই ঘটুক না কেন, তাকে কীভাবে বা কোন অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে তা-ই একজনের বর্তমান কেমন হবে সেটা নির্ধারণ করে।
যুবক: প্রশ্ন হলো- কী ঘটেছে তা নয় বরং কীভাবে সেটাকে সমাধান করা হয়েছে, তাই কি?
দার্শনিক: একদম ঠিক। আমরা সময় যন্ত্রে চেপে অতীতে ফিরে যেতে পারি না। সময়ের চাকা কোনোভাবে উলটো পথে ঘুরিয়ে দিতে পারি না। যদি তুমি ঈটিওলজি-তেই বসতি স্থাপন কর, তুমি অতীতের নিগড়ে বন্দি হয়ে পড়বে এবং কখনই সুখ খুঁজে নিতে পারবে না।
যুবক: ঠিক বলেছেন। আমরা অতীতকে পরিবর্তন করতে পারি না এবং ঠিক এজন্যই জীবন এত কঠিন।
দার্শনিক: জীবন আসলে অতটা কঠিন নয়। যদি অতীত সবকিছু নির্ধারণ করে দিত এবং তা যদি অলঙ্ঘনীয় হতো, তাহলে বেঁচে থাকা এই আমরা, সারা জীবনেও ভবিষ্যতের দিকে একটি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারতাম না। সেক্ষেত্রে ফলাফল কী হতো? আমরা এমন নৈরাশ্যবাদ ও হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়তাম যে, পৃথিবী ও প্রাণের প্রতি সকল আশা পরিত্যক্ত হয়ে যেত। আসলে ‘ট্রমা বিতর্ক’ দ্বারা পরিচিত ফ্রয়েডের ঈটিওলজি হলো একটি ভিন্ন ধরনের ‘নির্দিষ্টবাদ’ (determinism); যা নিতান্তই নৈরাশ্যবাদের দিকে ধাবিত করে। তুমি কি এ ধরনের মূল্যবোধ গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছ?
যুবক: না, তা গ্রহণ করতে রাজি নই; কিন্তু অতীতের স্মৃতি খুবই প্রখর।
দার্শনিক: সম্ভাবনার কথা ভাব। ‘মানুষ পরিবর্তন হতে পারে’- কেউ যখন এই তত্ত্ব গ্রহণ করে, তখন ঈটিওলজি ভিত্তিক একগুচ্ছ মূল্যবোধ বাতিল হয়ে যায়। ফলে, সে টেলিওলজি মতাদর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।
যুবক: তাহলে আপনি বলছেন যে, ‘মানুষ পরিবর্তন হতে পারে’ এই ভাবধারা সকলেরই গ্রহণ করা উচিত?
দার্শনিক: একদম ঠিক! অনুগ্রহ করে অনুধাবন করার চেষ্টা কর যে, ফ্রয়েডের ঈটিওলজি আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাকে অস্বীকার করে এবং মানুষকে নিতান্তই যন্ত্র মনে করে।
যুবক এখানে একটু বিরতি দিয়ে দার্শনিকের পড়ার ঘরের চারিদিকে নজর বোলায়। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু বইয়ের তাকে দেয়ালগুলো ঢাকা এবং একটি কাঠের ডেস্কের ওপর একটি ঝরনা কলম ও একটি অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি রয়েছে মনে হয়। দার্শনিকের দাবি হলো- ‘মানুষ তাঁর অতীতের কর্ম দ্বারা পরিচালিত হয় না বরং নিজেদের নির্ধারিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলে।’ তাঁর আচরিত ‘টেলিওলজি ভাবধারা’ একটি মহিমান্বিত মনোবৈজ্ঞানিক কার্যকারণকে সমূলে বাতিল করে দেয়; এবং তা গ্রহণ করা যুবকের পক্ষে অসম্ভব মনে হয়। যুবক তাই ভেবে অস্থির; কোন অবস্থান থেকে এখন তাঁর বিতর্ক শুরু করা উচিত? নতুন করে শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে সে বুক ভরে শ্বাস নেয়।
সক্রেটিস ও অ্যাডলার
যুবক: ঠিক আছে। আপনাকে আমার ‘ম’ নামের অন্য এক বন্ধু সম্পর্কে বলছি। সে মোহনীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। যে-কারও সঙ্গেই অতি সহজে আলাপ করতে পারে। সে ঠিক সূর্যমুখী ফুলের মতো উচ্ছল, প্রাণবন্ত; সকলেই তাঁকে পছন্দ করে। তাঁর উপস্থিতি অন্যদের মধ্যে খুশির সঞ্চার করে। অন্যদিকে, আমার কথা ধরুন - আমি কখনও সামাজিক পরিবেশে সহজ হতে পারি না, অন্তর্মুখী এবং নানাভাবে হতবিধ্বস্ত। এখনও কি আপনি দাবি করবেন যে, অ্যাডলারের টেলিওলজি চর্চার মাধ্যমে মানুষ পরিবর্তন হতে পারে, অর্থাৎ আমি নতুনভাবে শুরু করতে পারি?
দার্শনিক: অবশ্যই। তোমার, আমার এবং সকলেরই পরিবর্তন সম্ভব।
যুবক: সেক্ষেত্রে আপনার কি ধারণা আমি বন্ধু ম-এর মতো হতে পারি? মনের গভীর থেকে আমার আন্তরিক প্রত্যাশা - যদি তাঁর মতো হতে পারতাম!
দার্শনিক: তাহলে বলতেই হয়- এই বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে আমাদের আলোচ্যসূচির বাইরে।
যুবক: আহ্…হা! এতক্ষণে আপনার প্রকৃত জাত চেনাচ্ছেন। তাহলে আপনার তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে পিছু হটছেন?
দার্শনিক: না, তা কখনই নয়। দুর্ভাগ্যবশত তুমি এখনও অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞান বুঝে উঠতে পারনি। মনে রেখ, পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো জানা।
যুবক: আচ্ছা! আমি যদি অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানের কিছুটাও বুঝতে পারি তাহলে কি ম-এর মতো একজন আকর্ষণীয় ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারব?
দার্শনিক: উত্তরের জন্য এত তাড়াহুড়ো করছ কেন? অন্য কারও নিকট থেকে প্রাপ্ত কোনোকিছুর ওপর নির্ভর করে নয় বরং তোমার নিজেকেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। অপরের নিকট থেকে প্রাপ্ত সমাধান কেবল সাময়িক তৃপ্তি এনে দিতে পারে এবং এর আসলে কোনো মূল্য নেই। মহান সক্রেটিসের কথা ধরো, তিনি লিখিত আকারে কিছু রেখে যাননি। তিনি এথেন্সের নাগরিক বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে উন্মুক্ত বিতর্কে লিপ্ত হয়ে দিন পার করতেন। তাঁর বিখ্যাত শিষ্য প্লেটো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সক্রেটিসের দর্শনকে লিখিত রূপ দান করেন। মহান সক্রেটিসের মতো অ্যাডলারেরও লেখালেখিতে আগ্রহ ছিল না; বরং তিনি ভিয়েনার ক্যাফেতে ব্যক্তিগত সংলাপ ও ছোট ছোট দলীয় আলোচনায় সময় কাটাতে পছন্দ করতেন। অর্থাৎ তিনি কোনোক্রমেই বাস্তব জ্ঞান বিবর্জিত তাত্ত্বিক বুদ্ধিজীবী ছিলেন না।
যুবক: তাহলে মহান সক্রেটিস ও অ্যাডলার উভয়ই কথোপকথনের মাধ্যমে তাঁদের মতবাদ প্রচার করতেন?
দার্শনিক: একদম ঠিক। এই কথোপকথনের মাধ্যমে তোমার সকল অস্পষ্টতা ও ভ্রান্তি দূর হবে এবং তোমার পরিবর্তন শুরু হবে। এটি হবে আমার কথার দ্বারা নয় বরং তোমার নিজের কার্যক্রমের মাধ্যমে। তাই, সংলাপের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সেই মূল্যবান প্রক্রিয়াটি আমি কোনোভাবেই হারাতে চাই না।
যুবক: তাহলে এই ছোট্ট পড়ার ঘরে বসে আমরা কি মহান সক্রেটিস ও অ্যাডলারের সংলাপের কার্যকারিতা পরীক্ষা ও পুনরায় চালু করতে যাচ্ছি?
দার্শনিক: তোমার জন্য সেটাই কি উপযুক্ত নয়?
যুবক: হ্যাঁ, আমি তা-ই খুঁজে পাওয়ার প্রত্যাশা করছি। তাহলে চলুন আমাদের যাত্রা শুরু করা যাক, যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি আপনার তত্ত্ব থেকে সরে আসেন অথবা আমি আপনার বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য হই।
আরো পড়ুন:
ধারাবাহিক উপন্যাস।। পর্ব—২