পুরাণ, স্মৃতি ও ক্ষতের ভেতর জন্ম নেয় ‘সে এক ফলের ঘ্রাণ’

আনোয়ার ইসলাম
২১ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০০আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০০

কবিতা কোথা থেকে আসে? স্মৃতি থেকে, ইতিহাস থেকে, নাকি শূন্যতা থেকে? আবদুর রহমান জিদানের কাব্যগ্রন্থ ‘সে এক ফলের ঘ্রাণ’ পড়তে গিয়ে বারবার এই প্রশ্ন সামনে আসে। কবিতাগুলোতে পূর্বপুরুষ, পুরাণ, নদী, নক্ষত্র, প্রেম, মৃত্যু, শ্রম, শরীর, স্মৃতি এবং কবিতার নিজস্ব সংকট একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে।

জিদানের কবিতার একটি বড়ো বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর মানব-ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে প্রকাশ করেন। ‘শূন্যে কেমন দেখো’ কবিতায়, “শূন্যে কেমন দেখো চেয়ে আছে আমাদের পূর্বপুরুষেরা!” এই ‘পূর্বপুরুষ’ কি শুধুমাত্র কবির অস্তিত্বের আদিম উৎস, নাকি আমাদেরও অংশ—এমন দ্বান্দিক প্রশ্ন বার বার আসে। আবার কবি যখন “পরিচিত প্রতি তারকায়” শিকার করেন, তখন আসলে নিজের উৎসকেই খুঁজছেন। “আদি পিতামাতাদের লোহু” নিজের শরীরে ধারণ করার যে অনুভূতি, তার সবটাই কাল অতিক্রমী।

এখানে জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে একটি দূরবর্তী তুলনা করা যায়। জীবনানন্দের কবিতায় অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য যাতায়াত আছে। মানুষ বর্তমানে থেকেও বহু পুরোনো সময়ের অংশ। জিদানের কবিতাতেও সেই বোধ আছে। তবে জীবনানন্দ যেখানে প্রকৃতি ও সময়ের স্তরে স্মৃতিকে আবিষ্কার করেন, জিদান সেখানে নক্ষত্র, রক্ত, হাড় এবং পূর্বপুরুষকে একই বৃত্তে নিয়ে আসেন।

এই মহাজাগতিকতার আরেকটি দিক দেখা যায় ‘সেইবার নদী থেকে ঢেউ’ কবিতায়। একটি ঢেউয়ের মধ্যে কবি দেখতে পান “তারকার ছায়া” এবং “আমার পুরোনো ছবি-পূর্বকালের।” ঢেউটি তাই স্মৃতির বাহন। আবার কবি জানেন, ঢেউকে ধরে রাখা যায় না। তাকে ফিরে যেতে হয় “স্বাভাবিক সময়ের স্রোতে।” এই প্রবাহমানতার সঙ্গে তুলনা করা যায় টি. এস. এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর সময়চেতনার। এলিয়টের কাছে অতীত বর্তমানের ভেতর ক্রমাগত ফিরে আসে। জিদানের কবিতাতেও অতীত বর্তমানকে ছেড়ে যায় না। তবে এলিয়টের কবিতায় সভ্যতার ভাঙন ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি প্রধান হয়ে ওঠে, জিদানের কবিতায় স্মৃতি অনেক বেশি শরীরী এবং ব্যক্তিগত।

পুরাণও এই বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ‘অ্যান্ড্রোমাকে’ কবিতায় ট্রয়ের হেক্টর ও অ্যান্ড্রোমাকে এসে হাজির হন আধুনিক পৃথিবীতে। “হেক্টর নিহত হলো” থেকে কবিতা দ্রুত চলে যায় লাশ, বাজার, শিবির ও ময়লার স্তূপের দিকে। পুরাণের যুদ্ধ কি আধুনিক যুদ্ধ থেকে আলাদা? কবি অবশ্য আলাদা করে দেখেন না। হেক্টরের মৃত্যু যেন সকল যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু।

অ্যান্ড্রোমাকে আবার “জাহাজের ডেকে, একাকী” বা “যুগান্তের অনূদিত ক্রৌঞ্চীর দল”—দৃশ্যগুলো জিদানের কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। তা হলো, তিনি পুরাণকে পুনরাবৃত্তি করার বদলে বর্তমানের মধ্যে অনুবাদ করেন।

এই জায়গায় ডেরেক ওয়ালকটের সঙ্গে জিদানের একটি আকর্ষণীয় তুলনা করা যায়। ওয়ালকটও গ্রিক পুরাণকে ক্যারিবীয় ইতিহাস ও ঔপনিবেশিক বাস্তবতার সঙ্গে মিশিয়েছেন। তার ‘ওমেরোস’-এ হোমারের চরিত্রেরা নতুন ভূগোলে নতুন জীবন পায়। জিদানের ‘অ্যান্ড্রোমাকে’ও একইভাবে পুরাণের চরিত্রকে আমাদের পরিচিত পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে। তবে জিদানের পরিসর আরও ঘন এবং স্বপ্নময়।

‘অহল্যার প্রতি’ কবিতায় ভারতীয় পুরাণের অহল্যা নতুন অর্থ পাওয়া যায়। কবি লিখেছেন, “হলো ভবিতব্যও স্থির-তেমনই পুরুষ এক আসন্ন উদ্ধারে, কোনো নারী নয়।” অহল্যার অপেক্ষা তাই এমন এক সভ্যতার প্রতীক হয়ে ওঠে, যেখানে মুক্তির কাহিনিও পুরুষকে কেন্দ্র করে লেখা হয়। জিদানের পুরাণচর্চা তাই বর্তমানকে বোঝার ভাষা।

‘কবিতা আসে না’ কবিতায় কবি নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে কবিতার অনুপস্থিতি আবিষ্কার করেন। তিনি লিখেছেন, “আমার এ হাত, আজন্ম যার রোমে লাগেনি ফসলের মৃতদেহ,/নাড়ী ছিঁড়ে আসেনি দ্যোজাত সন্তান—এ আঁজলায়।” যে হাত মাটির সঙ্গে যুক্ত হয়নি, কলের ঘাম দেখেনি, বৈঠার কাঠ চিরেনি—সে হাত কেন কবিতা লিখবে? এই আত্মজিজ্ঞাসা কবিতাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।

এই জায়গায় পাবলো নেরুদা বা নজরুলের মতো কবিদের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যাদের কবিতায় শ্রম ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন কাব্যিকতার এসেছে। তবে জিদান সেখানে নিজের অবস্থান নিয়ে সংশয়ে থাকেন। তার সংকট হলো, কবিতা লিখতে চাওয়া হাতটি বাস্তব শ্রম থেকে দূরে। ফলে কবিতা তার কাছে নিজের সামাজিক ও শারীরিক অবস্থানও।

“কেবলই ব্যর্থ হই, কেবলই ব্যর্থ হই, পৃষ্ঠায় ঢাকি শুধু ক্ষত তাই বেদনার”—এই পঙ্‌ক্তিতে সেই সংকট আরও স্পষ্ট। কবিতা এখানে ক্ষত ঢাকে, আবার সেই ক্ষতই কবিতার জন্ম দেয়।

এই আত্মসন্দেহ আমাদের জীবনানন্দের “কবিতা কী?” ধরনের আত্মজিজ্ঞাসার কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার পল সেলানের কবিতার সঙ্গেও একটি দূরবর্তী সম্পর্ক তৈরি হয়। সেলানের কাছে কবিতা ছিল ইতিহাসের ভয়াবহতার পরেও ভাষার দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা। জিদানের কবিতাতেও ভাষা অনেক সময় ক্ষত ও ব্যর্থতার জায়গা থেকে জন্ম নেয়।

‘মেথির ফলের ঘ্রাণ’ কবি বারবার প্রশ্ন করেন—“কেন পাথর এমন হয়”, “কেন নদী, জল সকলই এমন বাষ্প হয়ে ওড়ে”, “কেন কুয়াশারও প্রাণ থাকে।” পৃথিবীর প্রতিটি বস্তু যেন একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। জিদানের প্রকৃতি শান্ত নয়। তার ভেতরে আছে আগুন, বাষ্প, মৃত্যু, ট্রেনের বাঁশি, কুকুরের ডাক, আজানের শেষ পঙ্‌ক্তি এবং অদৃশ্য কোনো ঘ্রাণ। প্রকৃতি এখানে দৃশ্যের চেয়ে বেশি। অস্তিত্বের রহস্য।

আর সেই রহস্যের কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায় “মেথির ফলের ঘ্রাণ”। ঘ্রাণকে কবি “দেখতে” চান, আবার “দূর কল্পনায়” পেতে চান। ইন্দ্রিয়ের স্বাভাবিক সীমা এখানে ভেঙে যায়। ঘ্রাণ দৃশ্যমান হয়, স্মৃতি বস্তু হয়ে ওঠে ও কল্পনা বাস্তবের মতো অনুভূত হয়। এই ইন্দ্রিয়-অদলবদল জিদানের কবিতাকে সুররিয়াল আবহ দেয়।

‘সকল ভূমিই কে দেয়’ কবিতায় “সকল ভূমিই কি দেয় প্রকৃত ফসল”—এই প্রশ্ন কৃষিজীবন, শ্রম এবং মানুষের প্রত্যাশাকে একসঙ্গে তুলে ধরে। ফল ও ফসলের কাছে মানুষের দাবি থাকে। কিন্তু সব জমি ফলনশীল নয়। এই অসমতা শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেও ফিরে আসে।

শেষ পর্যন্ত ‘সে এক ফলের ঘ্রাণ’ কাব্যগ্রন্থে মানুষ হারায়, ইতিহাস হারায়, প্রেম হারায়, শরীর ক্ষয়ে যায়, নদীর ঢেউ ফিরে যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই থেকে যায়—একটি স্মৃতি, একটি ঘ্রাণ, একটি আলো, একটি নক্ষত্র, কিংবা পূর্বপুরুষের অদৃশ্য আশীর্বাদ।

তাই বইটির সবচেয়ে সুন্দর উপলব্ধি হয়তো তার নিজেরই একটি পঙ্‌ক্তিতে পাওয়া যায়—“হত্যার প্রচণ্ড বেদনা বুঝি—তার আনন্দ অগাধ বলেই।”

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
অন্ধকারের ভেতর আলো 'জানালাবিহীন ঘর'
নাজি জেনারেলের মুখে শোনা গণহত্যার কাহিনি নিয়ে লেখা বই
মাটি, মানুষ ও মিথের আখ্যান ‘রায়টপুরের উপকথা’
সর্বশেষ খবর
আমরা ১১ মাসে যা করেছি, ঢাবিতে ১০৫ বছরে কেউ তা করেনি: সাদিক কায়েম
আমরা ১১ মাসে যা করেছি, ঢাবিতে ১০৫ বছরে কেউ তা করেনি: সাদিক কায়েম
দিল্লিতে পাকিস্তানি মিশনের ব্যারিকেড উচ্ছেদ নিয়ে যা বললো ভারত
দিল্লিতে পাকিস্তানি মিশনের ব্যারিকেড উচ্ছেদ নিয়ে যা বললো ভারত
২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ৩ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ৯৪০
২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ৩ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ৯৪০
যুদ্ধ বদলে দিচ্ছে আকাশপথ, এশিয়ায় বাড়ছে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট
যুদ্ধ বদলে দিচ্ছে আকাশপথ, এশিয়ায় বাড়ছে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট
সর্বাধিক পঠিত
অবশেষে সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপে অচলাবস্থার অবসান
অবশেষে সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপে অচলাবস্থার অবসান
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কবর দেওয়া হবে: চিফ হুইপ
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কবর দেওয়া হবে: চিফ হুইপ
যে ৩ কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি রুমিন ফারহানা
যে ৩ কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি রুমিন ফারহানা
বিএনপির বাইরেও  ১১ ভোট বেশি পেয়েছেন মির্জা ফখরুল
বিএনপির বাইরেও ১১ ভোট বেশি পেয়েছেন মির্জা ফখরুল
তীব্র গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ, একসঙ্গে ২০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা
তীব্র গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ, একসঙ্গে ২০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা