সবার কাছে বিষয়টি পাগলের প্রলাপ হলেও রেবা চৌধুরী মোটামুটি নিশ্চিত, খুব শিগ্রই তিনি ইন্তেকাল করবেন। আপনজনদের বেদনা বাড়িয়ে জগতের ওজন কমানোর দিনটি আসন্ন প্রায়। ব্যাপারটা যার পর নাই পরিতাপের হলেও তিনি বিচলিত নন। কারণ, আকস্মিক মৃত্যুর বার্তা সেই কলেজ-জীবন থেকেই বয়ে আসছে। তার জ্যোতিষ-বিশ্বাসী দাদুর খপ্পরে পড়ে হস্তরেখা বিশারদ শ্রী দেবানন্দ বসাককে যখন নিজ হস্ত দেখিয়েছিল। সাক্ষাৎ মনে আছে, জ্যোতিষ-রাজ অশেষ মনোযোগে কপালে আশ্চর্য ভাঁজ ফেলে বলেছিল—সৌভাগ্যের সব লক্ষণ দিবালোকের ন্যায় প্রস্ফুটিত, তবে আয়ুরেখা বড্ড বিচিত্র, মাঝপথে এসে একেবারেই উধাও! ধীমান বিশারদের কথা ঈশ্বরের বাণী হয়ে রেবার অস্তিত্বে রীতিমতো বসত-বাড়ি গড়েছে। আর তখন থেকেই মৃত্যুচিন্তা চেতনে-অবচেতনে সর্বদা সজাগ রেখেছে। যারা বুঝিয়েছে, এসবের কোন বাস্তব ভিত্তি নেই, সেই তাদের বিরুদ্ধে রেবার জিজ্ঞাসাও তির্যক। যদি কোন ভিত্তি না-ই থাকতো, তাহলে সুদূর রাজস্থান থেকে এই গণনাবিদ বছরে একবার, তাও সপ্তাহখানিকের সংক্ষিপ্ত সফরে দেশে আসলেই কেনো তবে আগাম সিরিয়ালে নাম লেখানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়? সেই অবাক প্রতিযোগিতায় বিশিষ্টজনদের সাথে মন্ত্রী-আমলাও দেখেছে! কারো কারো সাথে বাক্যালাপ ও জনশ্রুতিতে জেনেছে—গুরুজি যা বলেন সবই অক্ষরে-অক্ষরে বাস্তবে প্রতিফলিত হয়। ভবিষ্যৎবাণীর ব্যত্যয় ঘটেছে এমন নজির কেউ হাজির করতে পারেনি আজ অবধি! গড গিফটেড বলে একটা মারাত্মক বিষয় প্রকৃতিতে বহাল আছে! কোন কিছুকেই উড়িয়ে দেয়া ঠিক নয়। তাছাড়া তার দাদু ছিল আপাদমস্তক আধুনিক, উপরন্তু ভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক—কোন কার্যকারণ না থাকলে কি আর মরার আগ পর্যন্ত আস্থায় অবিচল থাকতে পারতো? নিজের দাদুকে ঠিকই চিনেছিল রেবা, যার যুতসই প্রমাণ লোকটা রূপকথার মতো জীবিত রেখে গেছে। ঘরের দরজা ভেঙে যেদিন লাশ খাটিয়ায় তোলা হয়েছিলো। দাদু তো সব সময়ই বলতো—দেখবি, আমার মৃত্যুর সময় কেউ পাশে থাকবে না। আমি পড়বো আর মরবো। হুবহু সেটাই ঘটেছিলো! রেবাসহ বাড়ির সবাই সেদিন বিয়ের দাওয়াতে। জ্যোতিষ জ্ঞান যদি কার্যকর না হতো, তাহলে দাদু কীভাবে মৃত্যুর আগেই সম্ভাব্য পরিণতির কথা এমন কঠিন নিশ্চয়তায় প্রচার করে বেড়াতো? জীবনে কত যে জ্যোতিষীকে হাত দেখিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এইতো, গেলো মাসে জ্যোতিষ-রাজ কুতুব হিলালীর স্মরণাপন্ন হয়েছিলো। যিনি এহেন বিদ্যায় বিদেশ হতে একাধিক স্বর্ণপদক জয় করে যশ-খ্যাতির সবটাই নিজের দখলে নিয়ে অতুলনীয় হয়ে আছেন। তিনিও আয়ু নিয়ে আশংকা প্রকাশ করলে রেবার সংশয়ের বিন্দুমাত্র আর অবশিষ্ট থাকলো না। মৃত্যুচিন্তা তাই বাতাসের ঢেউ ছাড়াই অহর্নিশ দোল দেয়। তাছাড়া আমলে নেবার মতো আরও ব্যাপার আছে। জ্যোতিষ শাস্ত্র নিয়ে তার নিজের পড়াশোনার বহর একত্র করলে দেহের ওজনকেও বহুগুণে ছাড়িয়ে যাবে। তিলতত্ত্বে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, যদি মেয়েদের বাম পায়ের তালুর মাঝ বরাবর তিল গজায় সেটা অকাল মৃত্যুর লক্ষণ! যা রেবা জন্মগতভাবে পায়নি। ঠিক তিন বছর আগে হতবাক কায়দায় হঠাৎ গজিয়েছে! ইতমধ্যে দৈনিক পত্রিকার ছুটির ঘণ্টা নামক রঙঢালা চটি ম্যাগাজিনে জেনেছে—বাঙ্গালীর গড় আয়ু মাত্র ৫৭ বছর! রেবা সাতচল্লিশের ঢালু ঋতু পাড়ি দিচ্ছে। একঅর্থে বোনাস খরচ। পরশু রাতে, সুবহে সাদেকের পবিত্র প্রাক্কালে দেখা দুঃস্বপ্নের কথাই ধরা যাক। তিনি চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছেন, হৃৎপিণ্ড ফাটিয়ে উদ্ধার চাইছিলেন। কিন্তু কোন সহায় পাচ্ছিলেন না। খোয়াবনামার ছহি বিশ্লেষণ এককথায় বললে শুধু মৃত্যু শব্দটিকেই খুঁজে পাওয়া যায়। এতোসব বিবেচনার পর আর কি কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে? মনোজগতের ঝড় সয়ে রেবা সম্পূর্ণ নিশ্চিত—যে কোন দিন, যে কোন মুহূর্তে তার মৃত্যু সংঘটিত হতে যাচ্ছে।
ভাগ্যবিশ্বাসের অন্ধভক্তি থেকে জন্ম নেয়া হাস্যকর মৃত্যুভাবনা তাড়াতে স্বামী হিশেবে জামান চৌধুরীর সুনাম অনেক উঁচুতে। কতই না অদ্ভুত, প্রেমময় কলা-কৌশল খাটিয়ে কয়েকদফা প্রফেসর লেবেলের সাইক্রিয়াট্রিস্ট দেখিয়েছে। আর সবাই স্বাভাবিকভাবেই একই বচন কাউন্সিলিংসমেত আওড়েছে। বিষয়টা নিতান্তই মানসিক, যা রেবা নিজেই নিজের ভেতর নির্মাণ করতে করতে রীতিমতো ক্রনিক মনোব্যাধিতে পরিণত করেছে। ব্যক্তিগত পুরুষটিকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতে ডাক্তারদের মুখস্থ মোটিভেশনের নিমতিতা বচন সানন্দে সামলায় ঠিকই। কিন্তু নগদে আরেক কানে বের করতে কালক্ষেপণ করেনা ভুলেও। প্রেসক্রিপ্সনের ওষুধগুলোর একমাত্র গন্তব্য বাথরুমের কমোড, আঙ্গুলের আদুরে চাপে জলসন্ত্রাসে নিরুদ্দেশ। নিত্যদিনের অবশ্যকপালনীয় এই স্পর্শকাতর ব্যাপারটাকে ঘুণাক্ষরেও কখনও টের পেতে দেয়নি রেবা। জামান রেবাকেন্দ্রিক সামান্যতম আহত হবে এমনটা ভাবাও পাপের মতো ঠেকে। মানুষটা রেবাকে অসম্ভব অনুভব করে, ভালবাসে তুমুল। বউপাগলা খেতাবের খ্যাতি পরিচিত কারোরই আর অজানা নয়। বউপাগলা না হলে কেউ কি জামাই হয়ে এমন শরমের কথা নিজের শ্বশুরকে কখনো বলতে পারে—বাবা, আমি তো রেবাকে ছাড়া ঘুমাতেই পারি না! জামান ৫২ ছুঁইছুঁই। এ বয়সেও যা রোমান্টিক! বসন্তবর্ণিল বিহঙ্গপ্রাণ! পতিকে তাই সতর্ক-শাসনে রাখতে হয়। মাঝে মাঝেই রেবা কানেমুখে স্মরণ করিয়ে দেয়—সন্তানরা বড় হয়েছে, ছেলে সেভ করে নিয়মিত, মেয়ে বুকে ওড়না চাপায়। রেবা অবধারিত মৃত্যুর কথা আত্মীয়-পরিজনের কানে পুনঃশুনানি দিয়ে লোক হাসাতে চায় না আর। জীবনে এ কথা এতই প্রচার করেছে যে, ব্যাঙ্গ ও বিরক্তি ছাড়া ভিন্ন কিছু আশা করা অবান্তর। অতএব, নিজের কাজ নিভৃতে নিজেকেই সমাপ্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে তাই নিজের ইচ্ছে পূরণের বিষয়টি নিয়ে ভাবা যেতে পারে। বিকেলের বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে চোখ মুদে তারই জল্পনা-কল্পনা চলছে। অনেক ভাবনা-বিবাদের পর আবিস্কার করলো, ইচ্ছেপূরণের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই! এ যাবত যা চেয়েছে, সবই পেয়েছে। অপূর্ণতা শব্দটির মুখোমুখি হতে হয়নি কখনো। মনের মতো স্বামী, লালমাটিয়ায় নিজেদের বিশাল বাড়ি, রয়েছে একাধিক দামি গাড়ি। তাছাড়া সচ্ছল ব্যাংক ব্যালেন্স তো আছেই। ছেলে অরিন সাভার সেনানিবাসে, লেফটেন্যান্ট। মেয়ে মৌলী ডাক্তারি পড়ছে। ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েও অপ্রাপ্তির কিছুই খুঁজে পেলো না। ভাগ্যবতীর সব লক্ষণই প্রাপ্তির ভেতর উপভোগ করে চলেছে। মৃত্যুর আগে মানুষের নাকি বেশিরভাগ আশা-আকাঙ্ক্ষাই কোন না কোনভাবে ধরা দেয়। তারতো সবই পূরণ হয়েছে। শূন্যস্থান বলে কিছু নেই। এটাও মৃত্যুর উত্তম নিশ্চয়তা হতে পারে। কাজেই এখন মৃত্যুযাত্রাকে কীভাবে পরিপাটি রূপ দেয়া যায়, সেটাই প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিৎ। রেবা পরিকল্পনার নিবিড় পরিচর্যায় আচ্ছন্ন, বশীভূত। মৌলী এসে নাক চেপে ধরলে বাস্তবে ফেরে।
-সেই দুপুর থেকে যেন ধ্যান করছ, কি হয়েছে মা বলো তো?
-আমি চলে গেলে তোদের খুব কষ্ট হবে, তাই না রে?
-কোথায় যাবে তুমি?
-মরার পর সবাই যেখানে যায়।
-মা, তোমার মাথা থেকে মরণভূতটা কোনকালেই যাবে না দেখছি।
-আমার সময় হয়েছে।
-তোমাকে কিছুদিন পাগলাগারদে রেখে আসা উচিৎ। এসব আজগুবি গল্পে ওখানকার পাগলগুলো সুস্থ হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে।
তীব্র তিক্ততায় মৌলী স্থান ত্যাগ করলে রেবা পুনরায়, পুরোদমে নিজের ভাবজগতে বিচরণ বাড়ায়। রেবার প্রস্থানে জামানের দায়িত্ব দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। প্রয়োজনে সন্তানদের জন্য পৃথিবী রক্ষা করবে। এতে কোন ঘাটতি হবে না নিশ্চিত। কিন্তু জামানকে দেখভাল করবে কে? রেবার সান্নিধ্য ছাড়া বরাবরই অসম্পূর্ণ। খুব মায়া হয় মানুষটার জন্য। ভাবতেই বুকের ভেতরটায় মোচড় দেয়। নিজের অজান্তেই চোখের জল মেঝের উপর মুক্তোদানার সমান জ্বলজ্বল করে।
প্রস্তুতি সন্তোষজনক বলেই মনে করছে রেবা। বর্তমানে ওমরারত বড়মামাকে কাফনের কাপড় আর আতর আনার বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে। সঙ্গে হাবে জমজম কূপের পানি। হাতে এলো বলে। পাঁচ কলেমা এখন ঠোঁটের আগায়। শুনেছে কবরে ফেরেশতা প্রথমে কলেমা জিজ্ঞাসা দিয়ে বাক্য বিনিময় শুরু করে। তখন গড়গড় করে বলে দেয়া যাবে। রেবা কোনকালেই আরবি শেখেনি। তবে ইদানিং সময় পেলেই প্রযুক্তির ব্যবহারে নিয়মিত কোরআন তেলওয়াত শোনে। প্রশান্তি অনুভূত হয়। সুরা-কালাম জানা নেই বলে নামাজের বিষয়টি ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আদায় করতে পারছে না। নামাজ যদি বেহেশতের চাবি হয়, তাহলে তালা খুলবে কীভাবে? এ দুর্ভাবনায় অসম্ভব তাড়িত রেবা। মৃত্যুর আগে আল্লাভীতি বোধ হয় এভাবেই জাগান দেয়? নইলে রেবা এতো পরিমাণে উদ্বিগ্ন কেন? অশান্তিনির্ভর এ জটিল অস্থিরতা মাথার মধ্যে গ্রীষ্মের প্রদাহ ঢেলে শরীরে বিন্দু বিন্দু ঘামের আয়োজন যুগিয়েছে। প্রতিমুহূর্তে কেবল তারই সন্ধান করছে যারে কখনোই দেখে নাই। আল্লাকেন্দ্রিক রহস্য-জটিলতার নিরাকার আবর্তে ঘোরপাক খাচ্ছে অহর্নিশ। মৃত্যুর পর কবরস্থ করার স্থান নির্বাচন করে, চিরকুট কায়দায় গত ক’দিন ধরেই ব্লাউজের ভেতর সংরক্ষণ করছে। এখন একটাই মনোবাঞ্ছা মন ও মগজে—তা হলো নিরাপদ মৃত্যু! মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে অব্যাহতির ছহি বাসনায় আজ জামেলিয়া এতিমখানার সবাইকে পুরান ঢাকার রাজকীয় সব খাবার খাইয়েছে। এতিম জিম্মাদার মাওলানা সাহেবকে দিয়ে বেদম মাপের দোয়ায় শামিল হতে গিয়ে কনুই ব্যথা করছিলো। বাসায় ফিরে বেহেস্ত লাভের দুর্বার বাসনায় নিজের সচ্ছল ডিপিএস—যা উত্তোলনের মেয়াদ প্রায় আসন্ন। তার পুরোটাই যেন এতিমখানায় দান করা হয়, সেটা অছিয়তনামায় স্বহস্থে সংযোগ করে প্রশান্তি লাভের উৎস খুঁজে। সঙ্গোপনে আল্লার ৯৯ নামের জিকির তো শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দে চলছে। গোপন ইবাদতের পাশাপাশি সামগ্রিক পরিকল্পনায় কোন ঘাটতি আছে কিনা সেটাও সতর্ক মনোযোগে যাচাই করছে। রেবা সুপ্রস্তুত। অবয়বহীন আজরাইল যে কোন মুহূর্তে জান কবজ করতে পারে। এশার আজান হচ্ছে। মাথায় শাড়ির আঁচল তুলে পরম মগ্নতায় ধ্বনি শুনছে, জপ করছে। আজানের ধ্বনির সাথে ধেয়ে আসছে অচেনা ভয় আর ভয়।
বেডরুমে জামানের অসময়ের উপস্থিতি রেবাকে হঠাৎ চমকে দিয়েছে। সর্বাঙ্গে ক্লান্তির ছাপ যেন দাগ বসিয়ে দিয়েছে। অবসাদের শরীরটা ঠিক সামাল দিতে পারছে না। মানুষটার কোন ধরণের বদ-অভ্যাসও নেই। জীবনে একবারই রেড ওয়াইন পান করেছিল। বিয়ের পর প্যারিস ভ্রমণে, হানিমুনে—তাও রেবার বিশেষ অনুরোধে।
-কি হয়েছে? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? জামান অপারগ তন্দ্রালু দেহটা বিছানায় ছেড়ে দেয়।
-তেমন কিছু নয়। সামান্য খারাপ লাগছে মাত্র। রেবা স্বামী সোহাগের শীর্ষটা দিয়ে জামানের ঘর্মাক্ত মাথা নিজের নিঃশ্বাসের কাছে নিয়ে উৎকণ্ঠার জানান দেয়।
-এবার বলো তো, কি হয়েছে আসলে?
-কিচ্ছু হয়নি সোনা। হঠাৎ করে খুব টায়ার্ড লাগছিল, এই যা। বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
-তাহলে জামা-কাপড় ছেড়ে নাও।
-ইচ্ছে করছে না রে।
জামানের অনিচ্ছাসত্ত্বেও রেবা বস্ত্র ছাড়িয়ে ভেজা তোয়ালায় সর্বাঙ্গ মুছে দেয়। মাথায় বিলি কাটতে থাকে। কিছুটা এবার হালকা অনুভব করছে, যা প্রতিউত্তর থেকেই বোঝা যাচ্ছে।
-ঠাণ্ডা পানি খাবো। আর এসিটা বাড়িয়ে দাও।
-তোরা কে কোথায় আছিস?
রেবার তালাশমূলক হুংকার শুনে শানু আর মানু বিদ্যুৎ বেগে হাজির। ওরা জমজ বোন। গৃহস্থালির সবকিছু আপন মনে করে ঘরময় করে রাখে। অচেনা যে কেউ ওদের দেখলে এ বাড়ির সদস্যই ভাববে। রেবাও ওদের সেভাবেই তৈরি করেছে। একজনের হাতে ঠাণ্ডা পানির বোতল, আরেকজনের হাতে জামানের নির্ধারিত মগ। রেবা মগভর্তি পানি জামানের ঠোঁটের সামনে ধরে বলে—
-তোরা তোদের কাজে যা।
শানু-মানুর প্রস্থানমুহূর্তে মৌলী তার বাবার এমন বিপন্ন অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে পড়ে। এর আগে কখনো এমন বিমর্ষ-কাহিল দেখেনি। নিজের অজান্তেই মৌলী কেঁদে চলছে। চোখে-মুখে হাত বুলিয়ে অস্থির অনুনয়ে মৌলী কারণ জানতে চায়।
-বাপি, তোমাকে ভীষণ কাবু দেখাচ্ছে। প্লীজ, আমাকে খুলে বলো। ডাক্তার ডাকবো? এ্যাম্বুলেন্স খবর দেই? মেয়ের অনেক প্রশ্নের জবাব এককথায় প্রকাশ করে মৌলীকে শান্ত করতে সচেষ্ট হয়।
-মেডিক্যালে পড়ছিস, তুই-ই তো আমার সবচে বড় ডাক্তার। হন্তদন্ত মৌলী নিজের ঘর থেকে স্টেথিসকোপ এনে জামানের বুক-পিঠে বসিয়ে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস নেবার নির্দেশনা দেয়। নিশ্চিত হবার জন্য পরপর তিনবার প্রেসার যাচাই করে। প্রাথমিকভাবে সুস্থ ঘোষণা করে নিজের ডাক্তারি ফলায়।
-ব্রমাজিপাম দিচ্ছি, খেয়ে নাও। লক্ষ্মী ছেলের মতো ঘুমাবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।
-দাবা খেলবি?
বাবার উচ্ছলতাকে পাত্তা না দিয়ে মৌলী অনেকটা শিশুসমেত শুইয়ে দিয়েও রেহাই পাচ্ছে না। মেয়ের মন গলাতে আবারো পাঁয়তারা করে।
-মা’মনি আমার এখন বেশ স্বাভাবিক লাগছে।
-ওহ বাপি, কোন কথা নয়। এক্কেবারে চোখ বন্ধ । আম্মু তুমি বাপিকে বিরক্ত করোনা, বাপির বিশ্রামের প্রয়োজন। কড়া হুকুমত জারি করে মৌলী টিভির সামনে গিয়ে বসে।
-দেখলে রেবা, আমার মেয়ে কেমন মা হয়ে উঠেছে?
-খাবে না? আমি তোমাকে খাইয়ে দেই।
-একটুও ক্ষুধা নেই।
-মৌলী ঘুমের ওষুধ দিয়ে গেছে, সেটা অন্তত খাও।
-আমার এমনিতেই ঘুম আসছে, তাছাড়া তুমিই তো আমার ঘুমের ওষুধ। সকালে একটু তাড়াতাড়ি ডেকে দিও। ফরেনারদের সাথে জরুরি মিটিং আছে। বিশাল প্রোজেক্ট, চুক্তিপত্র হবে। আমাকে উপস্থিত থাকতেই হবে।
রেবার কোমল আঙ্গুলের নিবিড় মমতা জামানের কপালে নির্ভরতার স্পর্শ দিয়ে যাচ্ছে। যে আনন্দময় স্পর্শ মানুষকে গাঢ় ঘুমের তলদেশে নিরুদ্দেশ করে রাখে। জামানের নিঃশ্বাসের আওয়াজ তেমনটাই সাক্ষ্য দিচ্ছে। রেবার জীবনে জামানই সেই সার্থক মানুষ, যার কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোন দুঃখ বা আঘাত কোনটাই পায়নি কখনো। আর দাম্পত্য জীবনে সন্দেহ বা ঝগড়াতুল্য তুচ্ছ বিষয়ও ঘেঁষতে পারেনি। আনন্দ, প্রাপ্তি আর উপভোগে মাতিয়ে রেখেছে। অথচ নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, সেই জামানকে ছেড়েই রেবাকে চলে যেতে হবে! হয়তোবা আজ রাতেই! জামানকে দেখার কেউ থাকলো না—এই দুঃখবোধ রেবাকে সর্বক্ষণ একা করে চলেছে। চোখের উষ্ণ নোনাজল যাতে জামানের মুখাবয়ব স্পর্শ করতে না পারে, সে সতর্কতায় শাড়ির আঁচলে অগোচরে তা শুষে নিচ্ছে। বিকেলের স্টেশন পেরিয়ে সন্ধ্যাটা মধ্যরাতে গিয়ে ঠেকেছে। জামানের ডান হাতের মাংসল পেশীকে বালিশ বিবেচনা করে রেবাও যুগল ঘুমের দখলে চলে যায়।
সকালটা সমস্ত শুভ্রতা নিয়ে আজ যেন একটু আগে-ভাগেই উপস্থিত। পর্দার ফাঁক দিয়ে জানালার কাচ ভেদ করে রোদের নম্র ঝিলিক ধীরে ধীরে সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। কি আশ্চর্য, রেবা বেঁচে আছে! আরও একটি দিন অতিরিক্ত পাবার আনন্দে রীতিমতো আত্মহারা প্রায়। ঘড়িতে সাড়ে সাতটার শুনানি চলছে। ফুরফুরে মেজাজে কিছুক্ষণ বারান্দায় পায়চারি শেষে জামানের ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে ডাক দেয়।
-এই ওঠো, আটটা বাজতে চললো।
জামান গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন—এটা ভেবে রেবা চুমু দিয়ে ঘুম ভাঙানোর পথ বেঁছে নেয়। কিন্তু কোন সাড়া নেই! শরীরটা কেমন যেন হিম!