রূপনগর পরগনার শাসনদণ্ড বিক্রমাদিত্য চৌধুরীর হাতে থাকলেও, এ রাজ্যের প্রকৃত চালক কে—সে তথ্য কারো অজানা ছিল না। রাজা বিক্রমাদিত্য ছিলেন মৃগয়া, মদিরা আর বাইজি নাচ নিয়ে মত্ত এক বিলাসী পুরুষ। তার পা হতে মস্তকে পর্যন্ত প্রবাহিত হয় কেবল অহমিকা আর ভোগের স্রোতস্বিনী ধারা। পরগনার প্রজারা জানত রাজার বিচিত্র মোহগ্রস্ততার আড়ালে রানির তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতেই টিকে আছে এই পরগনার রাজ্যপাট। রানি অত্যন্ত সুশ্রী, বুদ্ধিমতী এবং ছলাকলায় পারদর্শী। রাজ্যের ক্ষমতাদণ্ডের নিগূঢ় এই সত্যটি রাজা বিক্রমাদিত্য নিজেও যে জানতেন না তা নয়। তার পুরুষালি শরীরটায় এই সত্য হজম করা ছিল বিনা অপরাধে তপ্ত শেলের আঘাতে অস্থি-মাংস-হাঁড় গুঁড়ো হওয়ার মতো। সংগত কারণেই প্রায়শই খাসকামরায় নিভৃতে মুখোমুখি বসতে হতো দুজনকে; ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্বাক চেয়ে থাকা। রক্তপাতহীন স্নায়ু যুদ্ধ যাকে বলে। অদৃশ্য ছাই-ভস্মও দেখা যায় কোথাও এমন। কদাচিৎ হতো বিতণ্ডা।
এই নীরব যুদ্ধের নেপথ্য ইতিহাস মাত্র কুড়ি বছর আগের। সুলক্ষণা ছিলেন উত্তর ভারতের এক ক্ষয়িষ্ণু রাজপুত রাজার মেয়ে। কোম্পানি আর স্থানীয়দের নোংরা চক্রান্তে সুলক্ষণার পিতৃকূল যখন ধ্বংসের মুখে, তখন রূপনগরের তৎকালীন বুড়ো জমিদার নিজের সৈন্য পাঠিয়ে সেই রাজ্য রক্ষা করেন—তবে এক শর্তে; রূপনগরের অবাধ্য, মদ্যপ যুবরাজ বিক্রমাদিত্যের সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে তেজস্বী রাজপুত কন্যা সুলক্ষণার। রাজি হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না সুলক্ষণার পিতার। এদিকে বিক্রমাদিত্যও এই বিয়েকে মেনেছে যারপরনাই তুচ্ছতায়। যে মেয়েছেলের রাজ্য বাঁচিয়েছে তার পিতৃপুরুষ, তাকেই আবার সম্রাজ্ঞী করে রাখতে হবে? দাসী নয় কেন? তাছাড়া বিয়ের পর থেকেই বিক্রমাদিত্যের প্রতিটা ভুলের দণ্ড হিসেবে সুলক্ষণার ক্ষুরধার মগজ আর রাজপুত আভিজাত্য তাকে ছায়ার মতো তীক্ষ্ণ কটাক্ষে দেখিয়েছে তার অযোগ্যতা, বেমানান রাজ পরিচয়। বিক্রম সয়েছে সব। মদের পেয়ালা হাতে অবজ্ঞার হাসিতে সেও পাল্টা বলেছে, "সুলক্ষণা, তুমি যতই পর্দার আড়াল থেকে নায়েব-গোমস্তাদের নাচাও না কেন, মনে রেখো এই রূপনগরের অধিপতি আমিই। কোম্পানি থেকে শুরু করে প্রাসাদের খাস পরিচালকবৃন্দও আমার নামেই তোপ হাঁকায়, জয়ধ্বনি দেয়, কোনো মেয়েছেলের নামে নিশ্চয়ই নয়।"
"মেয়েছেলে" শব্দটায় সুলক্ষণা দেবীর সুপারি কাটায় গতি বাড়ে। যাঁতিটাও সমান তালে সাঙাত দেয় ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ। এবং বরফশীতল কণ্ঠ আপনা-আপনি বেজে ওঠে তেজে, "ঠিক বলেছেন মহারাজ, অবশ্যই কুর্নিশ করে, কারণ আপনার কোষাগার এখনো পূর্ণ। কিন্তু আফসোস, মেয়েছেলের চোখের ইশারা ছাড়া কখন তা অপূর্ণ হয় কে জানে! মন্ত্রী মশাই, বরকন্দাজ, নায়েবও কি বলেন না সে কথা আড়ে-ঠারে?"
বিক্রমাদিত্য ফুঁসে ওঠে রোষে, চেঁচায়, প্রত্যুত্তর করে, "বলবে নাই বা কেন? রমণীর ছিনালিপনা কে না ভূতলে লুটায়? এই যোগ্যতায় আপনি অসামান্য, অস্বীকার করার উপায় কী মহারানি!" বেশ একচোট বলতে পেরে বিক্রমাদিত্য গলায় তরল বিষ ঢালে. রানি হাসে। বলে, "আপনার মদিরা বড্ড কোমল, মগ্ন, তরল—আপনার নীরব অচল অঙ্গের লালিত্যের মতোই; কিন্তু রাজ্য শাসনে তো পুরুষাঙ্গের চেয়ে মগজের ধার বেশি প্রয়োজন মহারাজ।"
বিক্রমাদিত্য রাগে কাঁপতে কাঁপতে পেয়ালা ছুঁড়ে মারে দূরে। রানির গলা চেপে ধরতে গিয়েও ধরে না পরিবার থেকে শিখিয়ে দেওয়া রাজ-শিষ্টাচারে। তাছাড়া সুলক্ষণার গায়ে রাজপুত রক্ত, পাল্টা প্রতি-আক্রমণ জঘন্য হবে তা তো জানা-ই। বিক্রমাদিত্যের আর হজম হয় না সুলক্ষণাকে, একদম না। এত ধার কেন থাকবে এক নারীর। কূটনৈতিক বা বিনিময় মাহাত্মে এই যৌথ সম্পর্ক না হলে খুব কি ক্ষতি হতো রূপনগরের! যাক, নিয়তি মেনে কিংবা মানিয়ে নেওয়াটা ভবিতব্য ভেবে বিক্রম মনে করে প্রিয়তম সন্তানের মুখ। রুদ্র। সেকি ভালোবাসে জন্মদাতাকে? শ্রদ্ধায় দেখে পিতৃমুখ? বিক্রম মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করে সে জন্মেছে কার জন্য? ভেতর থেকে উত্তর আসে কেবল নিজের ভেতরের রুগ্ণ, অসহায় হীনম্মন্য পাপী আত্মাটার জন্য। পৃথিবীতে সে কারো নয়, এবং অন্য কেউও তার নয়।
যদিও পিতা-মাতাহীন সন্তানতুল্য অনুজ প্রতাপাদিত্যের সম্মুখ আনুগত্য সীমাহীন। একালের লক্ষণ হওয়ার অভিলাষ থাকলেও বর্তমানে সে রাবণ কিনা সন্দেহ গেঁথেই আছে বিক্রমের মনে। কারণ বিক্রম জানে প্রতাপ গোপনে আঁতাত রাখে তার ছোট-বড়ো সব ধরনের শত্রুপক্ষের সঙ্গেই। রাজত্ব কে না চায়। অন্যদিকে প্রতাপও নিশ্চিত সুলক্ষণা আছে বলেই বিক্রম টিকবে না রূপনগরের সিংহাসনে, এ রাজমনিহার তাকে নাহি সাজে। প্রতাপের সন্দেহও থাকে বড়দা না থাকলে পুরো প্রদেশ কি তার হতে দেবে সুলক্ষণা বা তার পুত্র রুদ্র? কে জানে। প্রতাপও চায় কণ্টক মুক্ত হোক সিংহাসন কিন্তু বিক্রম খেয়ালি হলেও অল্প বয়সেই রুদ্র পিতার চেয়েও কৌশলী; নিজেকে প্রস্তুত করতে এখনই সে বিভিন্ন তালুকে নিজের লোকবল শক্ত করে চলছে। ভালো লাঠিয়াল খুঁজে খুঁজে নিয়োগ দিচ্ছে নিজের সুরক্ষায়। এমন সব লোকের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব যারা বিচক্ষণ। এই বয়সে তার প্রতিরক্ষা ব্যূহ দেখলে বিক্রমাদিত্যের সন্তান হিসেবে সন্দেহই হয়। তবে রুদ্র সুলক্ষণার পুত্র—এ বিষয়ে প্রতাপ কেনো কারোরই কোনো মতদ্বৈততা থাকে না। কিন্তু এরপরও প্রতাপ বসে থাকে না। বিক্রমপুত্র দক্ষিণ মহালে কাঠ আর লবণের তদারকি করতে যাওয়ার সুযোগে, প্রতাপাদিত্য রুদ্রেরই লোকবল ব্যবহার করে সুন্দরবনের গহীন অরণ্য হতে শিকারিদের মাধ্যমে আনিয়েছিল এক গোপন মরণ-রসদ; পশুর গাছের বুনোফুল। ম্যানগ্রোভের নোনা জলের ধার ঘেঁষে জন্ম নেওয়া এই গন্ধ ও স্বাদবিহীন ফুলের রেণু এত ধীরে মানুষ মারে, সন্দেহ করার মতো কোনো অবকাশই থাকে না। প্রতিদিন রাতে বিক্রমের সুরাপাত্রে এই বিষ মেশাত তথাকথিত বিশ্বাসী সরাবরদার মঙ্গল সাধু। মঙ্গলকে প্রতাপই এনেছে ত্রিপুরা থেকে, কৌশলে গছিয়ে দিয়েছে বিক্রমের সরাবরদারদের দলে। মঙ্গলের হাতের চাল চমৎকার, তবে সুলক্ষণাও তা বুঝতে পারেন। স্বামীর অতি দ্রুত ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া চামড়া, গভীর রাতে তার খাসকামরা থেকে আসা অস্বাভাবিক কষ্টের গোঙানি এবং সুরাপাত্রের তলানিতে জমে থাকা এক অদ্ভুত হলদেটে আঠালো গাদ—কিছুই এড়ায় না সুলক্ষণার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে। সুলক্ষণা সন্দেহ করেছিলেন এবং খুব দ্রুতই মহালের এক বিশ্বস্ত শিকারির মাধ্যমে ধরে ফেলেছিলেন প্রতাপ আর মঙ্গলের চক্রান্ত।
চাইলে তিনি অনেক কিছু করতে পারতেন; রাজবৈদ্য বা চিকিৎসক ডেকে নিতে পারতেন দাওয়াই, কিংবা মঙ্গলকে চাবুক মেরে উদ্ঘাটন করতে পারতেন নেপথ্য ঘটনা। কিন্তু তিনি তার কোনোটিই করলেন না। যা করলেন, তা হচ্ছে দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ ঘটনাটা খুব দ্রুত ঘটতে দিলেন। ফলে রুদ্রপ্রতাপ দক্ষিণ তালুকে থাকাকালীন সময়ে, পুরো রাজ্যের সকলের অগোচরে রাজার খাসকামরায় জংলি মদের মাত্রাতিরিক্ত প্রবাহে রাত্রির শেষপ্রহরে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন রাজা বিক্রমাদিত্য। সুলক্ষণা তার বিশ্বস্ত প্রহরী দিয়ে প্রথমেই গুম করলেন মঙ্গলকে, এরপর সুরার সব উপকরণ ও পাত্রকে করলেন নিশ্চিহ্ন। সমস্ত রাত বিক্রমাদিত্যের নিথর দেহের সঙ্গে থেকে সুলক্ষণার সামনে প্রথম বাস্তব সংকট দেখা দিল তার নাম প্রতাপ এবং তার সিংহাসন লাভের লোভ। আপন সন্তানের ফিরে আসা অবধি লাশ সুরক্ষিত রাখতে না পারলে সেনা বিদ্রোহে ক্ষমতা হাতছাড়া হবেই। বিক্রমের মৃত্যু প্রত্যাশিত হলেও অনেকটাই তাৎক্ষণিক ক্ষোভে সংঘটিত হয়েছে। এ রাজ্যে পাহাড়ি বরফের প্রাচুর্য থাকলেও বদ্ধ ঘরের গুমোট হাওয়ায় লাশের পচন ধরা এবং গন্ধ ছড়ানো কেবল সময়ের ব্যাপার। সুলক্ষণা নায়েবকে আদেশ দিলেন, "লোকচক্ষুর আড়ালে হিমঘরে নিতে হবে লাশ। বরফের সঙ্গে সুন্দরবনের গোলপাতার ছাই, কর্পূর আর লবঙ্গ গুঁড়ো মহারাজের শয্যায় বিছিয়ে দিতে হবে।" তিনি কড়া নির্দেশ দেন "সুগন্ধি ধূপের ধোঁয়া যেন এই কক্ষের বাইরে এমনভাবে ছড়ায় যেন বাইরের পৃথিবী শুধু রাজবাড়ির আরোগ্য কামনার আয়োজনে শিহরিতো হয়, ভেতরের কোনো পচনের গন্ধে যেন আতঙ্ক না আসে কারো মনে।"
পরদিন ভোর হতেই সুলক্ষণা তিনটি ভিন্ন ফ্রন্টে তার দাবার ঘুঁটি চাললেন—প্রজা, ব্রিটিশ রাজ এবং প্রতাপাদিত্য।
রূপনগরে তখন টানা দু-বছর খরা। প্রজারা কর দিতে না পেরে ভিটেমাটি ছাড়ছিল। সুলক্ষণা জমিদারের জাল সিলমোহর ও সই ব্যবহার করে রাজকীয় ফরমান জারি করেন। কিন্তু প্রজাদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য তিনি নিজে রাজমহলের সিংহদুয়ারে এসে দাঁড়ান। মাথায় দীর্ঘ ঘোমটা, কণ্ঠে এক দৃঢ় অথচ আর্দ্র সুর:
"প্রজাগণ, মহারাজ এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। শয্যাশায়ী থেকেও তার একমাত্র চিন্তা—আপনাদের অন্নকষ্ট। তিনি রাজভাণ্ডার উন্মুক্ত করে আদেশ দিয়েছেন, আগামী এক বছর রূপনগরের কোনো প্রজাকে এক কড়া খাজনাও দিতে হবে না। উপরন্তু, আজ থেকে প্রতিদিন অন্ন বিতরণ করা হবে। আপনারা কেবল ঈশ্বরের কাছে মহারাজের দীর্ঘায়ু প্রার্থনা করুন।"
এই মধুবাক্য শ্রবণে ভুখা প্রজাদের চোখে জল নেমে এলো। পুরো পরগনায় রাজার নামে জয়জয়কার পড়ে যায়। প্রজারা যখন লাঠি হাতে রাজবাড়ির চারপাশ ঘিরে পাহারা দিতে লাগল প্রিয় রাজার আরোগ্যের জন্য, তখন সুলক্ষণা নিশ্চিত হন প্রতাপাদিত্য এখন লাঠিয়াল নামালেও সাধারণ প্রজারা তাকে ছিঁড়ে ফেলবে।
কিন্তু তার অন্য ভয়ও ছিল। জেলা কালেক্টর সাহেব খাজনা মওকুফের খবর পেলে জমিদারি বাজেয়াপ্ত করতে পারে। সুলক্ষণা অত্যন্ত চতুরতার সাথে কালেক্টর হ্যামিল্টন সাহেবকে এক গোপন চিঠি পাঠান, সঙ্গে নজরানা হিসেবে কোম্পানির এক থলি স্বর্ণমুদ্রা ও বহুমূল্যবান মসলিনও রাখেন। চিঠিতে বার্তা যায়:
"মহারাজ সাময়িকভাবে অসুস্থ। তবে কোম্পানির রাজস্বে রূপনগর কোনোদিন খেলাপি হবে না। প্রজাদের বিদ্রোহ দমনেই এই সাময়িক খাজনা মওকুফের কৌশল। রাজকোষ থেকে কোম্পানির সম্পূর্ণ হিস্যা নির্দিষ্ট দিনেই কলকাতার সদর দপ্তরে পৌঁছে যাবে। জামানত হিসেবে রানির পারস্য থেকে আনা চুনি পাথরের মহামূল্যবান রত্নরাজ অঙ্গুরিটি রইল।"
সাহেব শান্ত হলেন; ব্রিটিশ শক্তির হস্তক্ষেপের পথও বন্ধ হলো।
কিন্তু সবচেয়ে বড়ো বিপদ তো স্বয়ং প্রতাপাদিত্য। বড়দার হঠাৎ এই গুপ্ত রোগ আর রাতারাতি খাজনা মওকুফের দাক্ষিণ্য—তার মনে তীব্র সন্দেহের জন্ম দিল। অন্দরের খবর নিতে এবং সুলক্ষণাকে কোণঠাসা করতে পঞ্চম দিনের এক ঝড়ো রাতে সে সমস্ত প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সরাসরি সুলক্ষণার ব্যক্তিগত মহলে হানা দেয়। তার হাতে ছিল নগ্ন তলোয়ার, চোখে রক্তপিপাসা।
কক্ষে তখন জ্বলছিল আতরদানির মৃদু আলো। সুলক্ষণা সাদা থানের শোকের পোশাক সরিয়ে নিজেকে সাজিয়েছিলেন এক মায়াবী, উদাসী রূপসীর বেশে। চুলে হালকা জবাকুসুম তেল, চোখে কাজল। প্রতাপাদিত্যকে দেখে তিনি বিন্দুমাত্র চমকে উঠলেন না। ওষ্ঠাধরে ফুটে উঠল এক চিলতে রহস্যময় হাসি।
প্রতাপাদিত্য তলোয়ারের ডগা সুলক্ষণার চিবুকের কাছে ঠেকিয়ে হিসহিসিয়ে বলে, "বউঠান, ঢং বন্ধ করো। বড়দা কোথায়? আমি জানি সে বেঁচে নেই। তুমি জাল ফরমান জারি করেছ। এই মুহূর্তে যদি বড়দার ঘরে আমায় ঢুকতে না দাও, তবে এই তলোয়ার তোমার রক্ত দেখবে।"
সুলক্ষণা এক আঙুলে তলোয়ারের তীক্ষ্ণ ফলাটি নিজেই ছুঁয়ে দিয়ে রক্ত ঝরান। ঠোঁটে লাগান সে তরল। তার চোখে ভয়ের লেশমাত্র নেই, বরং সেখানে এক গভীর সম্মোহন। আহ্বান। এক কদম এগিয়ে প্রতাপাদিত্যের বুকের খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়ান। তার গায়ের তীব্র পারিজাত সুবাস প্রতাপাদিত্যের চতুর মগজকে মুহূর্তে করে দেয় অবশ।
সুলক্ষণা নিচু, ফিসফিসানি কণ্ঠে বললেন, "তলোয়ার নামাও; পুরুষমানুষের বীরত্ব তলোয়ারে নয়, প্রেমে। তুমি যা ভাবছ, তা যদি সত্যিও হয়... তবে তাতে তোমার ক্ষতি কী?"
প্রতাপাদিত্য থতোমতো খায়, "মানে কী বউঠান?"
"মানে বড্ড সহজ," সুলক্ষণা তার আরও কাছে যায়। কাঁধে রাখে হাত। "বিক্রমাদিত্য চৌধুরীর প্রেম মদিরায় আর বাইজিতে, এই রূপনগরের কর্তা তো তুমিই। লোকটা আর বড়জোর দু-চার দিনের অতিথি। কবিরাজ হাত ধুয়ে ফেলেছেন। এখন বলো, এই বিশাল সাম্রাজ্য, এই অতল রাজকোষ সামলানোর মতো পুরুষ কি তুমি? পারবে এই সাম্রাজ্যের রমণীরত্নটিকে সামলাতে? রুদ্র তো এখনো মায়ের আঁচল ধরা বালক। কাকে আর সাজে রাজবেশ?"
প্রতাপাদিত্য ঢোক গিলে। সুলক্ষণার রূপের মোহ আর ক্ষমতার এক তীব্র আদিম লোভ তার শিরায় আগুন ধরিয়ে দেয়। সে অস্ফুটে বলল, "কিন্তু রাজবিধান তো বলে রুদ্রপ্রতাপ ফিরলে সে-ই... যুবরাজ।"
"হোক, আমারই তো গর্ভজাত। রাজপাঠ সামলানোর যোগ্য হয়নি এখনো। এই রাজ্যে এখন রাজা নয়, প্রেমিক প্রয়োজন। এই সুলক্ষণাও তোমার চরণে সমর্পিত।"
প্রতাপাদিত্য স্তব্ধ হয়ে যায়। এ কী শুনছে সে! যে সুলক্ষণা দেবী হয়ে এতদিন পরগনার অঘোষিত সম্রাজ্ঞী ছিলেন, যাকে দূর থেকেও দুচোখ ভরে দেখার সাহস হতো না; সেই নারী আজ এতটাই কামনায় সমর্পিত? এও কি সম্ভব? সুলক্ষণার এই অমোঘ আহ্বান কি অগ্রাহ্য করা যায়? যায় না।
প্রতাপ তলোয়ার খাপে পুরে সুলক্ষণার দিকে হাত বাড়ায়—উষ্ণ, কামনার জ্বরে তপ্ত। হাত চেপে বলে, "তুমি আমায় ছলনা করছ না তো, দেবী?"
সুলক্ষণা তার চোখের দিকে চেয়ে এক মায়াবী হাসি ছড়ায়, "ছলনা কি না, তা সময় বলবে। আগে তো হাত ধরো। অস্ত্র দিয়ে বস্ত্রের আগল খুলে না। তোমার বাহিনীকে ব্যারাকে ফেরত পাঠাও। তোমার বড়দার শেষ সময়টুকু শান্তিতে কাটুক। তারপরের ইতিহাস প্রতাপ-লক্ষণার।"
মোহগ্রস্ত প্রতাপাদিত্য সেই রাতেই তার সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। এই ভেবে তৃপ্ত হয় যে, যুদ্ধ ছাড়াই সে একাধারে রূপনগর আর রূপনগরের রূপকুমারীকে পেয়ে গেল। এই মোহেই দারুণ দাপটে কেটে যায় আরও পাঁচটি মহামূল্যবান দিন। ষষ্ঠ রাতে সুলক্ষণা আবার প্রতাপাদিত্যকে তার গোপনকক্ষে আমন্ত্রণ জানান—রাত্রিউদযাপনের জন্য। প্রতাপাদিত্য ভাবে, এই তো আর কটা দিন, তারপরই সে রূপনগরের অঘোষিত সম্রাট হতে চলেছে। সুলক্ষণা হবে তার। উল্লাসে সে নিজের কণ্ঠে ঢালে মদিরা। সুলক্ষণার হাতে তৈরি কামনাসুধায় আকণ্ঠ ডুবে যায় সে। ভুলেও তার সন্দেহ হয় না, এখানেই মেশানো আছে তার নিজেরই সংগ্রহ করা পশুর গাছের বুনো ফুলের বিষ।
কিছু সময় শেষে কঠিন নেশার ঘোর কেটে বিষের প্রভাবে যখন প্রতাপাদিত্য ছটফট করতে থাকে, তখন সুলক্ষণার ডাকিনী রূপ প্রত্যক্ষ হয় তার সামনে। দণ্ডায়মান এই রমণীকে চিনতে কষ্ট হয় প্রতাপের। তীব্র অবিশ্বাস! হাসতে হাসতে প্রতাপের কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন সুলক্ষণা:
"ভেবেছিলে বড়োকে বিষ খাইয়ে তুমি পার পেয়ে যাবে? এই রূপনগরের সম্রাজ্ঞী সুলক্ষণা নিজের স্বামীকে যে বিষে হারিয়েছি, সেই বিষেই আজ তোর পাপের সমাপ্তি। চিতা একটা নয়, দুইটা জ্বলবে।"
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে প্রতাপাদিত্য।
প্রতাপাদিত্যের আকস্মিক মৃত্যুর পর রূপনগরের রাজপ্রাসাদ থমথমে শ্মশানে পরিণত হবে জেনেই রানি সতর্ক হন। বড়ো তরফ আর ছোট তরফ—দুই মহালই তখন অভিভাবকহীন। সুলক্ষণা দেবী আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলেন না। আবার নায়েব মশাইকে ডেকে পাঠালেন খাসকামরায়।
"নায়েব মশাই, প্রতাপাদিত্যও শেষ। কিন্তু দৃশ্যপট এখনই প্রকাশ করা যাবে না। দক্ষিণ মহাল থেকে রুদ্রপ্রতাপের ফিরতে এখনো অন্তত সাতটা দিন লাগবে। বর্ষা নেমেছে, পাহাড়ি নদীর স্রোত ঠেলে কাঠের বহর নিয়ে ওর ফিরতে সময় লাগবে। এই সাতটা দিন মহারাজের সঙ্গেই প্রতাপাদিত্যের এই দেহ সেই হিমঘরে গোপন থাকবে। কর্পূর, লবঙ্গ আর গোলপাতার ছাইয়ের প্রলেপ যেন প্রতিদিন দুবার করে পাল্টানো হয়। আর বাইরে প্রচার করে দিন, বড়ো মহারাজের শোকে ছোট মহারাজ তীব্র হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী।"
আগামী সাত দিন রূপনগরের বাতাস এক অদ্ভুত সুগন্ধি ধূপের ধোঁয়ায় ভারী হয়ে রইল। প্রজারা জানত রাজা ও ছোট রাজা দুজনেই অন্দরমহলে যমে-মানুষে লড়ছেন, অথচ মাটির নিচের হিমঘরে তখন পাশাপাশি শুয়ে আছে দুই ভাইয়ের নিথর দেহ। সুলক্ষণা এই সাতটি দিনও ব্যয় করলেন নিজের সুরক্ষায়—লাঠিয়ালদের পুরস্কৃত করলেন, নায়েব-গোমস্তাদের সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিলেন।
অবশেষে দশম দিনে, দক্ষিণ মহালের লবণ আর কাঠের হিসাব চুকিয়ে, নিজস্ব এক বিশাল লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে রূপনগরে পা রাখল রুদ্রপ্রতাপ চৌধুরী।
পরদিন সকালে রূপনগরে একসঙ্গে দুটি খবর রাষ্ট্র হলো। এক, দীর্ঘ রোগভোগের পর জমিদার বিক্রমাদিত্য মারা গেছেন। দুই, দাদার মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে ছোট ভাই প্রতাপাদিত্যও রাতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। প্রজারা ইতোমধ্যেই জমিদার পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল খাজনা মওকুফের কারণে, তাই তারা পরপর দুটি মৃত্যু সম্পর্কে কোনো গভীর তলানিতে গেল না। বরং সানন্দে রুদ্রপ্রতাপকে তাদের নতুন অধিপতি হিসেবে মেনে নিল।
কিন্তু ক্ষমতা আরোহণের চতুর্থ দিনে ঘটল আবার অঘটন। রূপনগরের জন্য এ যেন এক ধারাবাহিক অভিশাপ—পরপর তিন রাজপুরুষের আকস্মিক বিলোপ। রাজকীয় সাপের খামার পরিদর্শনের সময় রুদ্রকে দংশন করেছে সুন্দরবনের শুষ্ক ও ঝোপঝাড়ে বেড়ে ওঠা চন্দ্রবোড়া। সে একমুহূর্ত সময়ও পায়নি এই পরগনায় নিজের রাজত্ব ভোগ করার। কে কেন কোথা থেকে এনেছিল এই সাপ এ প্রশ্নও অবান্তর, কারণ এই পরগনার সবাই জানত জাতসাপ পোষা রুদ্রেরই শখ।
যদিও এর নেপথ্য ইতিহাস খুব সংক্ষিপ্ত। রাজ্যাভিষেকের জমকালো আলোতে সুলক্ষণার তীক্ষ্ণ চোখ আকস্মিক আবিষ্কার করেছিল রুদ্রের সদ্যই খোলস পাল্টানো নতুন রূপ। যে পুত্রকে সিংহাসনে বসাতে তিনি নিজের হাত রক্তে ও বিষে কলঙ্কিত করলেন, সেই পুত্রই ক্ষমতার মসনদে বসে কলকাতার কোম্পানির বড়ো বাবুর হাত থেকে খেলাত নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছে প্রভু-পালিত কুকুরের মতো। এমনকি অবজ্ঞার সুরে মাকেই শুনিয়েছে, "অন্তঃপুরের কূটচাল আর রাজ্য চালানো এক নয়। পরগনা চলবে কোম্পানির সাহেবানদের পরামর্শেই কোনো রাজমাতার আদেশে নয়।" রুদ্র যখনই রানি সুলক্ষণার জন্য খাসমহলই উপযুক্ত বিবেচনা করে বিধান দিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সুলক্ষণার মাতৃত্বের খোলসটা খসে পড়েছিল। এক অপমানিত, লাঞ্ছিত রাজপুত নারীর কাছে সন্তান কোনো আশ্রয় হতে পারে না এ সত্য অপরিপক্ব রুদ্রের ভাবনায়ই ছিল না। রানি বুঝলেন, বিক্রমাদিত্য বা প্রতাপাদিত্যের চেয়েও বড়ো শত্রু তিনি নিজের গর্ভেই পুষেছেন। এত বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা সুলক্ষণার সয়? তাই মাঝরাতে রুদ্রের প্রিয় চন্দ্রবোড়া সাপের খাঁচার আগল এমনি এমনিই তো খুলে যাওয়ার কথা। ঘটেছেও তাই। ঘটনার সংঘটন শেষে দরবারের মেঝেতে চন্দ্রবোড়ার নীল বিষে নিথর হয়ে যাওয়া সন্তানের শরীরে সুলক্ষণা আলতো করে রেখেছিলেন হাত। কপালে চুমো খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলেছিলেন, "ক্ষমা করিস পুত্র, তুই চৌধুরীদের রক্ত পেয়েছিস, কিন্তু মায়ের মগজের ধারটুকু চিনিসনি। এই রূপনগরের রাজ্যভার পৌরুষ দিয়ে নয়, মগজ দিয়েই চলবে—দেখে নিস।"
হতবাক হওয়া সকল শোক শেষে সুলক্ষণা একচ্ছত্র অধিকার করেন সিংহাসন। এরপর রূপনগরে আবার তোপধ্বনি হয়। নতুন সূর্যের দিকে তাকিয়ে সম্রাজ্ঞী নিজেকে বোঝান—ইতিহাস কেবল বিজয়ীর জন্য। প্রেম ও যুদ্ধে সবই বৈধ; আর অন্তিম বিচারে, অন্তঃপুরের মৃতের সংখ্যাই যদি মসনদের ভাগ্য নির্ধারণ করে, তবে তাতে সম্রাজ্ঞীর আর কীসের দায়!