বাদল নামার ক্ষণ
মানুষ মরার পর শিশু হয়ে যায়
একটা হাঁসের কাছে চলে যায়
ছড়ানো পায়ের পাতায় দাঁড়ায়
জবুথবু দাঁড়ায়
কাঁপে, গত জন্মের সন্তাপে
পালকের ভাঁজে মুখ ঘষে
তারপর হাঁসের ছানা হয়ে যায়
আর বাদল নামে
বাদল নামে ঝম ঝম, ঝম ঝম।
ছায়া
তোমাকে সমস্ত পড়ে ফেলেছি।
সমস্তই পড়া যায়।
কোনো বিকেলে সূর্যের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তোমাকে পড়ব বলে।
কী লিখেছ সব!
এইসব গান তো আমি সেই কবেই লিখে ফেলে দিয়েছি বোবাপাখির কণ্ঠের বিবরে।
সকলেই জানে। কেবল তুমিই জানো না বলে সন্ধ্যার ভেতরই ফুরিয়ে গেলে,
ফুরিয়ে গেলে আমার শরীরের একফোঁটা ঘ্রাণ নিয়ে।
কী অসহায়!
বনে গেলে
বনে গেলে জিরাফের সঙ্গে দেখা হয় আমার।
সবুজ ঘ্রাণে নাক ঘষে তার গ্রীবা ছুঁয়ে পেরিয়ে যাই
দিঘল নদীর পথ।
নিমফুলের শপথ!
আমি ভালোবাসি জিরাফের চির নীরবতার ভেতর লুকোনো
বনের ডানা ও বেদনা।
যদি পারো, তুমি আমাকে বনময় করে দাও।
অসততা
সে তো আর জানত না আমাকে তেমন
জানত না আমার স্মৃতি জন্মদাগ হয়ে যাবে
আমিও তাকে বলিনি কিছু
বলিনি আমিই সেই অবিস্মরণ
ভালোবেসে অসততা আমার এইটুকুই।
শিরার ভেতর
কুসুমের দেশে সন্ধ্যা চিরদিন,
এই জেনে ফুরিয়ে যাই কী এক অপরূপ বেদনায়!
আমার শিরার ভেতর রক্ত নেই, আছে শুধু প্রেম।
আমাকে ধারণ করবে কে আছে এমন, সেই দেশে?
নয়নতারার পাঁচ পাপড়িতে মৃত্যুলেখা শাদা,
কুসুমের দেশে বাকি ফুল সব ধূলি আর কাদা।
জোছনা ও রৌদ্র
দাদা: মনির উল্লাহ্ চৌধুরী
দাদি: সুফিয়া খাতুন
বাবা: দিলওয়ার হোসেন চৌধুরী
নানা: সিদ্দিক আহমদ
নানি: ফিরোজা খাতুন
মা: লায়লা বেগম আরজু
স্ত্রী: কুসুম
পুত্রী: তরঙ্গিণী
নশ্বর পৃথিবীতে কুসুমের কখনোই জন্ম হয় না
তার জন্ম হয় না বলে তরঙ্গিণীও অপার্থিব
আটজনের নাম লিখলাম
প্রথম ছয়জন স্মৃতি
শেষ দুইজন স্বপ্ন
মানুষ মূলত স্মৃতি ও স্বপ্নের মধ্যখানে থাকে
থাকে জোছনা ও রৌদ্রের মধ্যবর্তী রূপ নিয়ে
অনিরাময়ের গ্রাম
অনিরাময়ের গ্রামে প্রেম দ্বিখণ্ড হয়ে আছে।
মধ্যখানে একটা সবুজ আয়না,
দুপিঠেই দেখা যায়, এখনো দাঁড়িয়ে।
আর আমার আকার নেই,
কেবল দেখি
প্রেম বিচ্ছেদের ধারে খুলে রাখে প্রাকৃত দুপুর,
খুলে রাখে বটের ফল আর শূন্যতা।
পাতালেও পাখি থাকে জেনে
অচিন কাকলি শুনে ভুলে যায় পুষ্পকুসুম,
ভুলে যায় নাফোটা পাতার পরমায়ু।
লাল চোখ
লাল চোখ রেখে গেলাম, খুলে দেখে নিয়ো
নাঘুম রাত্রিরা হতে পারে রূপকথার দেশ।
কখনো মাতাল ছিলাম নরম ছায়ার কাছে,
চোখশূলে দৃশ্য গোধূলি এখনো মনে আছে।
দুহাতে চোখ ঘষে দেখি তুমিও রক্তজবা
আলগোছে ফুটে আছ জানালার ধারে,
ভাগাড়ে পড়েছিল প্রিয়তম কুকুরের শব
আধখোলা লাল চোখে বুঝি আকাশ মাপে!
পাঞ্চালির অন্তহীন শাড়ি যার একদা শৈশব।
বিড়ালের ছবি
আমি একটি বিড়ালের ছবি আঁকছি।
বিড়ালটি রোদ পোহাচ্ছে খড়ের গাদায় শুয়ে,
বিড়ালটির শাদা, কালো আর কমলা পশম।
বিড়ালটির আমার বয়স,
আমার বয়স দশ বছর তিন মাস।
বিড়ালটির চোখে পাশের বাড়ির বালিকার চোখ,
বিড়ালচোখের রাত্রি এলে আমি জেগে থাকি,
ক্ষেতের অন্ধকারে জ্বলে ওঠে আশ্চর্য চোখ।
আঁকছি মাছ চুরি করে পালিয়ে যাচ্ছে বিড়াল,
আমি শুয়ে আছি ঠান্ডা মেঝেতে, আষাঢ়ের গরমে,
আমার বুকের ওপর পা রেখে পার হচ্ছে বিড়াল,
পাশের বাড়ির বালিকার কোলে শুয়ে ওম নিচ্ছে,
তার কোলে ঘষে দিচ্ছে আমার বুকের স্পর্শ।
আঁকছি দিঘল একটা ব্রিজ পার হচ্ছে বিড়াল,
আমার মুঠোর ভেতর সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে লাল।
সন্ধ্যা ও রাত্রি
জলার ভেতর তাকিয়ে আছ
তুমি মাছ নাকি মাছরাঙা
দড়িতে ঝুলছে একফালি লাল
এখানে ওখানে নিষ্পলক কেউ
আগুনের গন্ধ ভুলে গেছ
একদিন সপ্তপদী ধাঁধা ছিল
সুখের মোহরগুলি ভুল হয়ে যায়
অথৈ চুলে ঢেকে গেছে চোখ
তুমি সন্ধ্যাকে ডেকে গেলে
সন্ধ্যা রাত্রি হলে আর নেভে না
নির্ঝর নৈঃশব্দ্য (জন্ম: ২৪ আগস্ট ১৯৮১, চকরিয়া, কক্সবাজার) কবি ও চিত্রশিল্পী।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
পড়া, লেখালেখি ও ছবি আঁকা তার নিরবচ্ছিন্ন সৃজনচর্চার ক্ষেত্র। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২৮টি।









